পল্লবীর রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীতে ফের বর্বরতা: ভাষানটেকে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে লম্পট হোসেন গ্রেফতার, আদালতে সোপর্দ
জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিশাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ক্ষত ও দেশজুড়ে চলা তীব্র আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকার বুকে আবারও ঘটেছে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বর্বরোচিত শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এবার রাজধানীর ভাষানটেক এলাকায় মাত্র ৮ বছর বয়সী এক অবুজ শিশুকে ধর্ষণের নিকৃষ্ট অভিযোগ উঠেছে মো. হোসেন (৩২) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। এই পৈশাচিক ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিশুর বাবার দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ঘাতককে গ্রেফতার করেছে ভাষানটেক থানা পুলিশ।
আজ রবিবার (২৪ মে) সকালে গ্রেফতারকৃত আসামিকে কড়া পুলিশি পাহারায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ প্রশাসন। এর আগে শনিবার (২৩ মে) দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বাদী হয়ে ভাষানটেক থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতারকৃত লম্পট হোসেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ডুমুরিয়া এলাকার মৃত সাহেব আলী ফকিরের ছেলে। সে দীর্ঘদিন ধরে ভাষানটেক এলাকায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিল।
ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ ও মামলার সময়রেখা
মামলার এজাহার এবং পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরেই শিশুটি এক প্রকার মানসিক ট্রমা ও তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অবুজ শিশুটি লোকলজ্জা এবং আসামির হুমকির ভয়ে প্রথমে বিষয়টি কাউকে বলতে সাহস পায়নি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, তীব্র শারীরিক যন্ত্রণাই একপর্যায়ে অপরাধের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়।
আপনার ওয়েবসাইটে সহজে কপি-পেস্ট করার জন্য পুরো ঘটনার ধারাবাহিক সময়রেখা (Timeline) নিচে সাধারণ টেক্সট আকারে দেওয়া হলো:
- মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যা ৭টা: শিশুটি তার ঘরের সামনে খেলছিল। এই সুযোগে লম্পট হোসেন তাকে ফুসলিয়ে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে এবং মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
- বুধবার থেকে শুক্রবার: শিশুটি প্রচণ্ড ভয়ে ঘটনাটি চেপে রাখে, তবে অনবরত যৌনাঙ্গে তীব্র ব্যথার কারণে কান্নাকাটি করতে থাকে।
- শনিবার (২৩ মে) রাত ৮টা: মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণ ও কান্না দেখে মা-বাবা বারবার জিজ্ঞাসা করলে একপর্যায়ে শিশুটি মঙ্গলবার সন্ধ্যার সেই লোমহর্ষক নির্যাতনের কথা খুলে বলে।
- শনিবার রাত ১২টা: ভুক্তভোগী শিশুর বাবা সরাসরি ভাষানটেক থানায় গিয়ে লিখিত এজাহার জমা দেন এবং পুলিশ সেটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে।
- শনিবার দিবাগত গভীর রাত: ভাষানটেক থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে এলাকা থেকেই অভিযুক্ত মো. হোসেনকে গ্রেফতার করে।
- আজ রবিবার (২৪ মে) সকাল: আইনি প্রক্রিয়া শেষে গ্রেফতারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ এবং ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ।
বাদীর বয়ান ও এজাহারের বিস্তারিত তথ্য
মামলার এজাহারে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা উল্লেখ করেন, "আমার মেয়েটি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের। গত ২ থেকে ৩ দিন ধরে সে হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে যায় এবং প্রায়ই যৌনাঙ্গে তীব্র ব্যথার কথা বলে কান্নাকাটি করতে থাকে। আমরা প্রথমে সাধারণ রোগ মনে করলেও শনিবার রাতে তার কান্নার বেগ দেখে সন্দেহ হয়। অনেক আশ্বস্ত করার পর সে জানায় যে, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যখন সে ঘরের সামনে খেলছিল, তখন প্রতিবেশী হোসেন তাকে একা পেয়ে রুমে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর রুমের দরজা বন্ধ করে তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরে জোরপূর্বক এই জঘন্য কাজ করে এবং কাউকে বললে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।"
তিনি আরও বলেন, "পল্লবীর রামিশা হত্যার ঘটনার পর আমরা এমনিতেই আতঙ্কে ছিলাম। এখন আমার নিজের সন্তানের সাথে এমন ঘটল। আমি এই লম্পট হোসেনের এমন শাস্তি চাই যেন আর কোনো বাবা-মায়ের বুক এভাবে খালি বা রক্তাক্ত না হয়।"
আইনি পদক্ষেপ ও আদালতের প্রক্রিয়া: পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার সত্যতা এবং আইনি অগ্রগতির বিষয়ে ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম গণমাধ্যমকে জানান, শনিবার রাতে শিশু ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত মামলা (এফআইআর) হিসেবে গ্রহণ করি। মামলার পর রাতেই পুলিশের একটি চৌকস দল অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত হোসেনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
ওসি আসলাম আরও জানান:
১. আজ রবিবার সকালে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধের গভীরতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে।
২. ভুক্তভোগী শিশুটিকে উদ্ধার করে আইনি প্রমাণের স্বার্থে ফরেনসিক ও ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (OCC) পাঠানো হয়েছে।
৩. ঢাকা মেডিকেল থেকে ফরেনসিক রিপোর্ট আসার পর সেটি আদালতে আসামির বিরুদ্ধে প্রধান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
পল্লবী হত্যাকাণ্ডের ছায়া ও বিচারহীনতার সংকট
এই ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিশাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো দেশ এখনো উত্তাল। সেখানেও মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আজই মেগা চার্জশিট দাখিল করার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ভাষানটেকে ৮ বছরের শিশুর ওপর এই হামলা প্রমাণ করে যে, সমাজে অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি কোনো সমীহ বা ভয় তৈরি হচ্ছে না। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, একটি অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুততম সময়ে শাস্তি না হওয়ার কারণেই একের পর এক এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
উপসংহার
রাজধানীর বুকে একের পর এক শিশু ধর্ষণের ঘটনা আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ৮ বছরের একটি শিশু ঘরের সামনে খেলার সময়ও নিরাপদ নয়—এই বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ। ভাষানটেকে ঘটে যাওয়া এই জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ যেভাবে দ্রুততার সাথে আসামিকে গ্রেফতার করেছে, ঠিক একইভাবে যেন দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আজই ঘোষণা করেছেন যে সরকার শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে চায়। ভাষানটেকের এই মামলাটিও যেন সেই বিশেষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে নিয়ে লম্পট হোসেনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।