৩৯-এও ফুরিয়ে যাননি মেসি: যে কারণে আবারও বাজি ধরেছেন সবকিছু

৩৯-এও ফুরিয়ে যাননি মেসি: যে কারণে আবারও বাজি ধরেছেন সবকিছু

খেলাধুলা ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল দুনিয়ায় এমন কোনো ট্রফি বা স্বীকৃতি কি বাকি আছে যা তাঁর শোকেসে স্থান পায়নি? আটটি মহিমান্বিত ব্যালন ডি’অর, ক্লাব ফুটবলের সমস্ত শিরোপা, মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের কোপা আমেরিকা আর সবশেষে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেই বহু আরাধ্য সোনালী ট্রফি—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ফুটবল নামক খেলাটাকে নিজের পায়ের জাদুতে মুঠোয় পুরেছেন অনেক আগেই। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে যখন তিনি বিশ্বমঞ্চের ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তখন কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত ভেবেছিলেন, এবার হয়তো এই গ্রহের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের মহাকাব্যের শেষ পাতাটি লেখা হয়ে গেছে। ফুটবল থেকে তাঁর আর পাওয়ার কিছুই বাকি ছিল না। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে, ৩৯ ছুঁই ছুঁই বয়সে দাঁড়িয়েও বুট জোড়া তুলে রাখেননি এলএমটেন (LM10)। তাঁর ভেতরের ক্ষুধা কমেনি বিন্দুমাত্র; বরং আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে আরও একবার বিশ্বজয়ের এক অদম্য বাসনা নিয়ে তিনি নিজের সবকিছু বাজি ধরেছেন।

আগামী ১৬ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান। আর এই নতুন বিশ্বমঞ্চে নামার আগে মেসিকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কোনো নতুন রেকর্ড গড়ার মোহ নয়, বরং দেশের হয়ে আবারও শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছানোর এক আদিম জেদ।

রেকর্ডের ফ্রেমে মাপা যায় না যাকে: ম্যাক্সি রদ্রিগেজের জবানবন্দি

ইতিহাসের সেরা এই ফুটবলারের বর্তমান মানসিকতা এবং ফুটবল মাঠে তাঁর টিকে থাকার মূল রহস্যটি উন্মোচন করেছেন তাঁর সাবেক সতীর্থ ও আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ম্যাক্সি রদ্রিগেজ। যাকে কোনো ব্যক্তিগত মাইলফলক বা গোল সংখ্যার ফ্রেমে আর বন্দি করা যায় না, তিনি কেন এই বয়সেও প্রতিটি ম্যাচে নিজের সেরাটা উজাড় করে দিচ্ছেন?

সম্প্রতি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) ওয়েবসাইটের এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে রদ্রিগেজ মেসির এই অবিশ্বাস্য পুনরুত্থান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। ম্যাক্সি রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে বলেন, "লিওনেল মেসি এখন স্রেফ একটা জিনিস দিয়েই চালিত হচ্ছেন, আর তা হলো—সাফল্যের অবিরাম ক্ষুধা এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে আবারও নতুন এক গৌরবগাথা লেখার অদম্য ইচ্ছা। নিজের প্রিয় দেশের প্রতিনিধিত্ব করার যে গর্ব ও আবেগ, তা ছাড়া বর্তমানে তাঁর মাথায় আর অন্য কোনো চিন্তা বা সমীকরণ কাজ করে না। এমনকি দুনিয়ার কোনো নতুন রেকর্ড ভাঙার বা গড়ার ন্যূনতম তাড়নাও তাঁর ভেতর নেই।"

রদ্রিগেজ আরও মনে করেন, এই অতিমানবীয় মানসিকতা এবং প্রতিটি দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়না যদি মেসির মাঝে না থাকত, তবে তিনি আজকের এই অনন্য সাধারণ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারতেন না। আর ঠিক এই কারণেই আর্জেন্টিনার সেই আইকনিক ১০ নম্বর জার্সিতে আমরা ফুটবলপ্রেমীরা আরও একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকাপে তাঁকে দেখার এক অবিস্মরণীয় সুযোগ পেতে যাচ্ছি।

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ সমীকরণ এবং আর্জেন্টিনার মিশন

বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা এবারও টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট। আগামী ১৬ জুন থেকে উত্তর আমেরিকায় শুরু হতে যাওয়া এই মহাযজ্ঞে গ্রুপ ‘জে’ (Group J)-তে খেলবে আলবিসেলেস্তেরা। গ্রুপ পর্বে মেসিদের প্রথম প্রতিপক্ষ লড়াকু আফ্রিকান দল আলজেরিয়া। কানসাস সিটির হাইভোল্টেজ এই ম্যাচের টিকিট পেতে ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে হাহাকার শুরু হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: সচিবালয়ে লাল টেলিফোনের তার চুরি: দুই আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে

সচিবালয়ে লাল টেলিফোনের তার চুরি: দুই আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে

গ্রুপ 'জে'-তে আর্জেন্টিনার অন্য দুই প্রতিপক্ষ হচ্ছে ইউরোপের শক্তিশালী দল অস্ট্রিয়া এবং এশিয়ার উদীয়মান ফুটবল শক্তি জর্ডান। আপাতদৃষ্টিতে গ্রুপটি আর্জেন্টিনার জন্য সহজ মনে হলেও, আধুনিক ফুটবলে কোনো দলকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই—বিশেষ করে যখন বিশ্বজয়ের মুকুটটি ধরে রাখার প্রশ্ন আসে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা ইতিমধ্যে নিজেদের ট্যাকটিক্যাল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। দলের তরুণ তুর্কি থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়েরা সবাই চাইছেন তাঁদের প্রিয় ‘এল ক্যাপিতান’কে আরও একটি বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার দিতে।

ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ

মাঠের এই বিশ্বজয়ের লড়াইয়ের আবহের মাঝেই লিওনেল মেসির ব্যক্তিগত অর্জনের মহিমান্বিত ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এক আন্তর্জাতিক পালক। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে অসামান্য ও অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ সপ্তাহেই মেসিকে ভূষিত করা হয়েছে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘২০২৬ প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড’ (Princess of Asturias Award)-এ।

স্পেনের রাজপরিবার কর্তৃক প্রবর্তিত এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারটি অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। সাধারণত বিশ্বজুড়ে শিল্প, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান, মানবিকতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি খেলাধুলায় অনন্য কীর্তি ও মানবীয় মূল্যবোধের বিকাশের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। ক্রীড়া দুনিয়ার অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব অতীতে এই পুরস্কার পেলেও, লিওনেল মেসিই ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে এই অনন্যসাধারণ খেতাব অর্জন করার গৌরব অর্জন করলেন। এই পুরস্কার প্রমাণ করে যে, মেসি কেবল মাঠের একজন ফুটবলার নন, বরং তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত উৎস, যা ফুটবল মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক ও মানবিক স্তরে বিস্তৃত।

৩৯ বছর বয়সে বিশ্বজয়ের চ্যালেঞ্জ: শারীরিক ও মানসিক লড়াই

একজন ফুটবলারের জন্য ৩৯ বছর বয়স মানে ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্ন, যেখানে অনেকেই বুট জোড়া তুলে রেখে ধারাভাষ্য কক্ষ কিংবা কোচিং লাইনে নিজেদের ক্যারিয়ার খোঁজেন। সেখানে লিওনেল মেসি উত্তর আমেরিকার তীব্র গরম এবং আধুনিক ফুটবলের গতিময় শারীরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মেসি এখন আর আগের মতো ৯০ মিনিট জুড়ে মাঠ জুড়ে দৌড়ান না, কিন্তু তাঁর ‘ফুটবল আইকিউ’ এবং মাঠের ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণ ধারালো হয়েছে। দলের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যেমন হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টাররা মাঠের সিংহভাগ রানিংয়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন, যা মেসিকে তাঁর জাদুকরী পাসিং এবং ফিনিশিং ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য মুক্ত রাখছে। স্কালোনির এই বিশেষ রণকৌশলই মেসিকে ৩৯ বছর বয়সেও সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবলে টিকিয়ে রেখেছে এবং আবারও এক কাপ জয়ের বাজি ধরার সাহস জোগাচ্ছে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন