নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলায় রেললাইনে অসতর্কভাবে চলাচলের সময় এক হৃদয়বিদারক ও রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনায় ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির করুণ মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা উত্তরবঙ্গগামী আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আনুমানিক পঞ্চাশ বছর বয়সী ওই প্রৌঢ় ব্যক্তি। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বেলা আড়াইটার দিকে কামারখন্দ উপজেলার অন্তর্গত জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে অবস্থিত আলোকদিয়ার রেলসেতুর ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও মারাত্মক দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়। চলন্ত ট্রেনের প্রচণ্ড ধাক্কায় দেহাবশেষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ার মতো লোমহর্ষক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, কৃষক ও পথচারীদের মাঝে তীব্র ভীতি ও গভীর শোকের সঞ্চার হয়েছে। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। তবে দুর্ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেলেও দুর্ভাগা ওই ব্যক্তির নাম বা সুনির্দিষ্ট কোনো পারিবারিক পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গাঁজা ও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ২, পলাতক ১
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় অধিবাসী এবং জামতৈল রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে পাওয়া তথ্যের বিবরণে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্ধারিত দ্রুতগতিতে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ অঞ্চল অতিক্রম করছিল। বেলা আনুমানিক দুইটা ত্রিশ মিনিটের দিকে যাত্রীবাহী ট্রেনটি জামতৈল রেলস্টেশনে প্রবেশের ঠিক পূর্বমুহূর্তে আলোকদিয়ার এলাকায় অবস্থিত রেলসেতুর ওপর এসে পৌঁছায়। ঠিক সেই সময়ে আনুমানিক পঞ্চাশ বছর বয়সী ওই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে জামতৈল স্টেশনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সংকীর্ণ রেলসেতুর ওপর দিয়ে পথ চলার সময় তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা ট্রেনের উপস্থিতি হয়তো তিনি সঠিক সময়ে অনুধাবন করতে পারেননি অথবা দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় স্থান বা সময় কোনোটিই তিনি পাননি। মুহূর্তের মধ্যে দ্রুতগতির ট্রেনটি তাঁকে সজোরে আঘাত করে এবং তিনি ট্রেনের চাকার নিচে পড়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন।
আরও পড়ুন: বেলকুচিতে জমি বিরোধে বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর: উভয় পক্ষের আহত ১০, আশঙ্কাজনক ১
দুর্ঘটনার অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে ঘটনাস্থলেই ওই ব্যক্তির মাথা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন হওয়া মাথাটি রেলসেতুর লোহার স্লিপারের ফাঁক গলে নিচের গভীর অংশে পড়ে যায় এবং মরদেহের মূল ধড়টি রেললাইনের ওপর রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় পড়ে থাকে। ট্রেনের তীব্র শব্দ ও লোকজনের চিৎকারে আশপাশের ফসলি জমিতে কর্মরত কৃষক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এমন রক্তক্ষয়ী ও বিভৎস দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত জনতা হতবাক হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বিষয়টি জামতৈল রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন এবং সেখান থেকে সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশে জরুরি বার্তা পাঠানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আশপাশের জনপদ থেকে শত শত উৎসুক নারী-পুরুষ রেলসেতুর দুই পাশে এসে ভিড় জমাতে শুরু করেন এবং সর্বত্র শোকের আবহ তৈরি হয়।
খবর পেয়ে সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) একটি দল দ্রুত কামারখন্দের আলোকদিয়ার রেলব্রিজে পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় সেতুর নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা এবং ওপর থেকে মূল দেহাবশেষ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহটি ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নিহতের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ ও আশেপাশের থানাগুলোতে সম্প্রতি কোনো নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি রয়েছে কি না তাও গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরনে থাকা পোশাকের ধরন ও শারীরিক অবয়বের ওপর ভিত্তি করে তাঁর পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সন্ধান পাওয়ার জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে।
এদিকে রেললাইনে ঝুঁকি নিয়ে চলাচলের কারণে এমন মর্মান্তিক প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সুধীসমাজ। সংশ্লিষ্টদের মতে, অরক্ষিত রেলসেতু বা রেললাইনের ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও চরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকার মানুষজন নিয়মিত এই বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে পথচারীরা রেললাইনের ওপর হাঁটার সময় সতর্ক থাকেন না এবং ট্রেনের উচ্চগতির তীব্রতা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারেন না, যার ফলে প্রায়শই এমন মর্মান্তিক জীবনাবসান ঘটে। সিরাজগঞ্জ ও ঈশ্বরদী রেলপথে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দুর্ঘটনা রোধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। অজ্ঞাতপরিচয় এই ব্যক্তির কোনো সন্ধান বা তথ্য কারও জানা থাকলে তা নিকটস্থ রেলওয়ে থানায় জানানোর জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সূত্র: সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশ ও জামতৈল স্টেশন কর্তৃপক্ষ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।