প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ও ঘোষিত রায়ের আইনি প্রক্রিয়ায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত যেসব আসামি সুনির্দিষ্ট আইনি সময়সীমা অর্থাৎ রায়ের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন দায়ের করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের আপিল করার আইনগত সমস্ত সুযোগ স্থায়ীভাবে সমাপ্ত হয়ে গেছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। সোমবার সাতই সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে গুম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বাস্তবায়ন সম্পর্কিত এক জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের শীর্ষ আইনি অবস্থানের কথা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের নাসির-টিক্কা হত্যা নিয়ে চ্যানেল এসের সংবাদের বিরুদ্ধে স্বজনদের সংবাদ সম্মেলন
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ধারা উল্লেখ করে বিশদ বিবরণ প্রদান করেন। তিনি জানান যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কিংবা সংক্ষুব্ধ পক্ষ যদি ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই রায় ঘোষণার দিন থেকে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবস বা পঞ্জিকা দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন সম্পন্ন করতে হয়। এই নির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ সময়সীমা অতিবাহিত হয়ে গেলে আইনত সেই রায়ের বিরুদ্ধে নতুন করে আর কোনো আপিল বিবেচনা করার বা বিচারিক এখতিয়ার চর্চা করার সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে যারা আপিল করেননি, তাদের ক্ষেত্রে আদালতের রায় চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানসহ অন্যান্য দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক বা অনুপস্থিত আসামিদের বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রসিকিউশন টিমের প্রধান স্পষ্ট করেন যে, আইন সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। রায় প্রকাশের পর সংবিধিবদ্ধ সময়সীমার মধ্যে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ না হওয়া আসামিদের ক্ষেত্রে আইনের সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডাদেশ এবং তার কার্যকারিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই আইনি মেয়াদের ভূমিকা অত্যন্ত চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আদালতের এখতিয়ার এবং রায়ের চূড়ান্ততা রক্ষা করা বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ফলে ৩০ দিনের সময়সীমা অতিক্রমকারী সকল আসামির আপিল দায়েরের দরজা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: দিনাজপুর সীমান্তে বিজিবি ও জনতার তীব্র প্রতিরোধে ভেস্তে গেল বিএসএফের পুশইন চেষ্টা
সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত নতুন আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বিচার প্রক্রিয়ায় দুটি পৃথক আইনের সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের নিরসন ঘটিয়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আশ্বাস দেন যে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের সাথে ট্রাইব্যুনাল আইনের কোনো ধরণের বৈপরীত্য, অসঙ্গতি বা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হবে না। দুটি আইনি কাঠামোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই কাজ করবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধগুলোর সঠিক বিচারে এরা যৌথভাবে গতিশীলতা আনবে।
বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া গুমের সার্বিক অভিযোগ তদন্ত ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পদ্ধতিগত কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন যে, দেশে গুমের যতগুলো ভুক্তভোগী পরিবার বা ব্যক্তি অভিযোগ এবং প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট পেশ করেছেন, তার প্রতিটি অভিযোগই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা বা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্য প্রমাণের সততা, সাক্ষ্য প্রমাণ এবং তদন্ত রিপোর্টের বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করার পরেই কেবল ট্রাইব্যুনাল বা সংশ্লিষ্ট আইনি সংস্থা পরবর্তী প্রশাসনিক ও বিচারিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যেন ন্যায়বিচার পান, সেটি নিশ্চিত করাই মূল অগ্রাধিকার।
মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শক্ত অবস্থানের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তি টানা হয়। চিফ প্রসিকিউটর আশা প্রকাশ করেন যে, সঠিক তদন্ত এবং আইনানুগ বিচারিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশে বিদ্যমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে দূর হবে। গুম, মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত যেকোনো ব্যক্তি, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাকে দেশের প্রচলিত আইনের মুখোমুখি হতে হবে। একই সাথে স্বচ্ছ ও নিখুঁত আইনি পর্যালোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে প্রতিটি মামলার নিষ্পত্তি ঘটানো হবে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
নিউজ এর সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও চিফ প্রসিকিউটরের সংবাদ সম্মেলন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।