শাহজাদপুরের স্কুলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: প্রধান শিক্ষককে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন

শাহজাদপুরের স্কুলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: প্রধান শিক্ষককে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সুফিয়ান নোমান / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রতনকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন, বিদ্যালয়ের তহবিল তছরুপ ও ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের জমাকৃত অর্থের হিসাব-নিকাশে অসঙ্গতি এবং নানা স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বিদ্যালয়ের জমিদাতা পরিবারের সদস্যরা সহ স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা বজায় রাখা ও তহবিলের সুরক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে অনুসন্ধানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে শাহজাদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে। একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের অবসর গ্রহণের ঠিক পূর্বমুহূর্তে এমন সংবেদনশীল অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবক সমাজে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের নাসির-টিক্কা হত্যা নিয়ে চ্যানেল এসের সংবাদের বিরুদ্ধে স্বজনদের সংবাদ সম্মেলন

প্রাথমিক অনুসন্ধান ও প্রশাসনিক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে মাঠে নেমেছে তদন্তকারী দল। গত ৩১শে আগস্ট সোমবার তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শাহজাদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিনে রতনকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি প্রতিষ্ঠানের বিগত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, ক্যাশ বই, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও আনুসঙ্গিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন। কাকতালীয়ভাবে ওই দিনটিই ছিল অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম কিবরিয়ার চাকরিজীবনের একেবারে শেষ কর্মদিবস। তদন্ত চলাকালে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও ক্যাশ মেমো উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়ে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব গুছিয়ে জমা দেওয়ার স্বার্থে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে ১০ দিনের অতিরিক্ত সময় প্রার্থনার আবেদন জানান।

এদিকে লিখিত অভিযোগ উপস্থাপনকারী জমিদাতা পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নানা ধরণের অস্পষ্টতা ও চরম বিশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছিল। উন্নয়ন তহবিল, শিক্ষার্থী ভর্তি ফি, উপবৃত্তি ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থের সঠিক কোনো হিসাব ভাউচারে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগটি উঠেছে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথি ও গোপন রেকর্ডপত্র গায়েব বা গোপনে সরিয়ে ফেলা নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, অবসর গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিংবা তার পরপরই প্রধান শিক্ষক নিজের অপকর্ম ঢাকতে বিদ্যালয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ফাইল ও কাগজপত্র নিজের হেফাজতে নিয়ে গেছেন। ওইসব গোপন নথির বর্তমান অবস্থান কোথায় এবং কোন উদ্দেশ্যে সেগুলো সরানো হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশাসন এখনো কোনো স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি।

আরও পড়ুন: দেশে স্থায়ীভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হচ্ছে: জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

নথি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তথ্য প্রদান করেছেন বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সাদিকুল ইসলাম। তিনি বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠে জানান, তদন্তের দিন যখন আমরা অন্যান্য শিক্ষকদের নিয়ে একটি জরুরি প্রশাসনিক সভায় ব্যস্ত সময় পার করছিলাম, ঠিক সেই সুযোগটিতেই বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম কিবরিয়া তার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে এবং অপরিচিত এক ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে মাদ্রাসার কাগজপত্র ও নথি বলে দাবি করে বিদ্যালয়ের বেশ কিছু গোপনীয় ও প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র তড়িঘড়ি করে সাথে নিয়ে সটে পড়েন তারা। এ ঘটনা শিক্ষক মণ্ডলী ও স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সন্দেহের সৃষ্টি করেছে এবং অনতিবিলম্বে ওই সমস্ত নথি উদ্ধার করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আর্থিক দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ বেআইনি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে এক বিবৃতিতে অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম কিবরিয়া। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিদ্যালয় থেকে কোনো প্রকার অফিশিয়াল কাগজপত্র বা সরকারি নথি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা পুরোপুরি অসত্য। আর্থিক হিসাব-নিকাশের ধোঁয়াশা কাটাতে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মানুযায়ী সময় চেয়েছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ও ভাউচার সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দাখিল করবেন বলে দাবি করেন। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

সার্বিক বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম জানান, রতনকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। বিদায়ী শিক্ষক হিসাব দাখিলের জন্য ১০ কার্যদিবসের আইনি সময় চেয়েছেন। সম্পূর্ণ আর্থিক হিসাব-নিকাশ সঠিকভাবে বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এবং তদন্ত কার্যক্রমের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষক গোলাম কিবরিয়াকে কোনো প্রকার ছাড়পত্র বা অবহতিপত্র দেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, মো. গোলাম কিবরিয়া ২০১৩ সালে এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেছিলেন এবং দীর্ঘ ১৩ বছর দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ৩১শে আগস্ট তার চাকরি জীবন শেষ হয়। বর্তমানে এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনরা শিক্ষকের নৈতিকতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন তুলছেন।

নিউজ এর সূত্র: উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন