দেশে স্থায়ীভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হচ্ছে: জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

দেশে স্থায়ীভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হচ্ছে: জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন মাননীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা প্রদান করেছেন যে, খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে স্থায়ী ও টেকসই অবকাঠামোর মাধ্যমে জটিল অঙ্গসংস্থাপন তথা লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম পরিচালনা শুরু হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অর্জিত সাফল্য, আধুনিকায়ন এবং ভাবি কর্মপরিকল্পনা পেশ করার সময় তিনি এই বিশেষ রূপরেখা দেশের সামনে উন্মোচন করেন। নিজ দেশেই এই অতিপ্রয়োজনীয় জটিল চিকিৎসার স্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়ায় একদিকে যেমন প্রতি বছর দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটবে, অন্যদিকে গুরুতর রোগীদের আর চিকিৎসার তাগিদে বিদেশ যাওয়ার অনিশ্চয়তায় ভুগতে হবে না।

আরও পড়ুন: দিনাজপুর সীমান্তে বিজিবি ও জনতার তীব্র প্রতিরোধে ভেস্তে গেল বিএসএফের পুশইন চেষ্টা

অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে বক্তব্য প্রদানকালে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ইতিপূর্বে দেশে বারডেম কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন বা পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি লিভার প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হলেও তা টেকসই রূপ ধারণ করতে পারেনি। পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা ও স্থায়ী রূপরেখার অভাবে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত এই চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। তবে এবার সম্পূর্ণ নতুন ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে শেখ রাসেল ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে একটি স্থায়ী ও আন্তর্জাতিক মানের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিট প্রতিষ্ঠা করার পূর্ণাঙ্গ কর্মযজ্ঞ এগিয়ে চলছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে।

এই বিশাল ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্য প্রকল্পকে শতভাগ কার্যকর ও আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন করতে সরকার ইতোমধ্যে বিপুল অংকের অর্থ সংস্থান করেছে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার লক্ষ্যে মোট ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই বিপুল পরিমাণ আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচ ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসা যন্ত্র দেশে এসে পৌঁছেছে এবং হাসপাতালের নির্দিষ্ট ইউনিটে তা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া এই বিশেষ চিকিৎসাসেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবশিষ্টাংশ আরও ১০ ধরনের জটিল ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই দেশে এসে পৌঁছাবে বলে প্রতিমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট করেছেন।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে চরাঞ্চলে গৃহবধূর নিথর দেহ উদ্ধার, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ

প্রয়োজনীয় সকল অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থাপন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জন, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ মেডিকেল টিমকে দেওয়া হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ। এই টেকনিক্যাল প্রস্তুতি পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর পরই মূলত নিয়মিত অস্ত্রোপচার ও মূল চিকিৎসা সেবা শুরু হবে। সামগ্রিক প্রস্তুতি এবং সময়সূচি পর্যালোচনা করে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে যে, চলতি ২০২৬ সালের শেষের দিকে অথবা আগামী ২০২৭ সালের প্রথম ভাগে ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসা সেবা চালু করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জটিল রোগীদের জন্য এক অভূতপূর্ব সুযোগের দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে।

চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতায় সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করে ড. এম এ মুহিত বলেন, লিভার কিংবা কিডনি অকার্যকর হওয়ার মতো বড় ধরনের ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। জীবন রক্ষাকারী এসব জটিল রোগের পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের অর্জিত সহায়-সম্পদ হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের মুখে পতিত হয়। বর্তমান সরকারের রূপকল্প এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রধান লক্ষ্যই হলো সাধারণ মানুষের এই অনাকাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা ব্যয় বা ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ এক্সপেন্ডিচার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা।

বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার আকাশছোঁয়া ব্যয় হ্রাস করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এই সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলকে আরও জোরদার করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে পড়ে থাকা অব্যবহৃত চিকিৎসা সুবিধা ও আধুনিক অবকাঠামোগত সুবিধাগুলো সুনির্দিষ্ট কৌশলে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় কাজে লাগানো হবে। দীর্ঘমেয়াদী জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় পিপিপি এবং স্ট্র্যাটেজিক পারচেজের মতো যুগোপযোগী নীতি অনুসরণের ফলে চিকিৎসা সেবা যেমন সাশ্রয়ী ও মানসম্মত হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের ভেতরে চলে আসবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতিগত পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশের অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জরুরি স্বাস্থ্যাবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরাসরি আর্থিক সহায়তার ব্যাপ্তি দ্বিগুণ করা হয়েছে বলে সংসদে উল্লেখ করা হয়। অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভোগা দুঃস্থ রোগীদের জন্য পূর্বে নির্ধারিত ৫০ হাজার টাকার সরকারি অনুদান বাড়িয়ে এক লাখ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষভাগে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে জানান, কেবল অর্থাভাবের দরুন যেন দেশের কোনো অসহায় নাগরিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বিন্দুমাত্র বঞ্চিত না হন, সেই আদর্শকে সামনে রেখেই বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে এই অভাবনীয় পরিবর্তন বাস্তবায়ন করে চলেছে।

নিউজ এর সূত্র: জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন