প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত কুখ্যাত আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিতে এক ভয়াল অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে। ৭ই সেপ্টেম্বর সোমবার প্রাতঃকালে আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে তীব্র শব্দে লাভা ও সুবিশাল ছাইয়ের মেঘ বায়ুমণ্ডলে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে ছড়িয়ে পড়ে। এই দুর্যোগের ফলে দেশটির আকাশপথ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। আগ্নেয়পাত থেকে নিঃসৃত ঘন ছাইয়ের মেঘ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার কারণে জাকার্তার সর্বপ্রধান বিমান চলাচলের কেন্দ্র সুকর্ণো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সহ মোট আটটি কৌশলগত বিমানবন্দরের সকল প্রকার ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: দেশে স্থায়ীভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হচ্ছে: জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
আকস্মিকভাবে বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫৫৮টি ফ্লাইট বাতিল কিংবা স্থগিত করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে দেশটিতে অবস্থানরত ও ট্রানজিটে থাকা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়ে চরম উৎকণ্ঠা ও মানবিক ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। টার্মিনালে অপেক্ষা করা এসব অগণিত যাত্রীদের জন্য জরুরি খাবার, আবাসন ও বিকল্প রুট নিশ্চিত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আগ্নেয়গিরি থেকে অনবরত নির্গত হওয়া বিষাক্ত ছাই ও ধোঁয়া সুন্দা প্রণালী অতিক্রম করে রাজধানী জাকার্তা এবং সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর ওপর এক ধূসর আস্তরণ তৈরি করেছে। বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। জাকার্তার সার্বিক বায়ুমান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাজধানীর সকল স্কুল-কলেজ সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদান স্থগিত রেখে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পড়াশোনা সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা বিভাগ।
আরও পড়ুন: পঞ্চগড়ে রক্ষাবাঁধ গিলে খাচ্ছে অবৈধ স্থাপনা, বিলুপ্তির মুখে করতোয়া নদী
সামুদ্রিক পথ ও আশপাশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার স্বার্থে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির মূল জ্বালামুখকে কেন্দ্র করে চারপাশের ৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের অঞ্চলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংবেদনশীল সীমানার ভেতর মাছ ধরার ট্রলার, পর্যটকবাহী নৌযান এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সাথে সুন্দা প্রণালী অতিক্রমকারী সব ধরণের নৌযানকে বিকল্প ও নিরাপদ পথ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে যেকোনো সামুদ্রিক বিপদ বা জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
উৎপন্ন সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়। ছাইয়ের প্রভাবমুক্ত অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকার বিকল্প বিমানবন্দরগুলোকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হচ্ছে, যাতে স্থগিত থাকা ফ্লাইটগুলোর জরুরি ট্রানজিট পরিচালনা করা সম্ভব হয়। দেশটির ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরে এখনও ভূ-কম্পনীয় তরঙ্গ অব্যাহত রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রধান বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালু করার কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার' এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে প্রায়শই আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা দেখা যায়। ২০১৮ সালের ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের পর আনাক ক্রাকাতোয়া একাধিকবার উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও সোমবারের এই অগ্ন্যুৎপাত সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা। বর্তমানে আটকে পড়া যাত্রীদের আপদকালীন সহায়তা প্রদান এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা।
নিউজ এর সূত্র: ইন্দোনেশিয়া জাতীয় ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (BNPB)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।