ফরেনসিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য: শেখ হাসিনা, তাপস ও হাবিবুরের কণ্ঠস্বর শনাক্ত, জুলাই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নির্দেশের প্রমাণ!

ফরেনসিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য: শেখ হাসিনা, তাপস ও হাবিবুরের কণ্ঠস্বর শনাক্ত, জুলাই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নির্দেশের প্রমাণ!

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফরেনসিক সাক্ষ্য: শেখ হাসিনা ও তাপসের কণ্ঠস্বরের মিল শনাক্ত, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক | দিগন্ত বাংলা নিউজ, ঢাকা, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

​বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। সেই সময়কার বিভিন্ন অডিও ক্লিপ এবং ভাইরাল হওয়া কথোপকথন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে নানা প্রশ্ন ছিল। অবশেষে সেই সব অডিও ক্লিপের সত্যতা নিয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে।

​গতকাল বুধবার (২৯ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় একজন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এই সাক্ষ্য প্রদানটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফরেনসিক বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

​ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া বিশেষজ্ঞটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে কর্মরত। নিরাপত্তার স্বার্থে আদালত ও প্রসিকিউশন তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। তিনি আদালতকে জানান, প্রসিকিউশন থেকে পাঠানো অডিও ফাইলগুলো অত্যন্ত আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

​ফরেনসিক বিজ্ঞানে 'ভয়েস স্পেকট্রোগ্রাফি' বা 'অ্যাকুস্টিক অ্যানালাইসিস' পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শনাক্ত করা হয়। বিশেষজ্ঞ জানান, শেখ হাসিনা এবং তাপসের আগে থেকে সংরক্ষিত পরিচিত কণ্ঠের রেকর্ডের (নমুনা) সাথে বিতর্কিত অডিও ক্লিপের কণ্ঠের ফ্রিকোয়েন্সি, পিচ এবং বাচনভঙ্গি তুলনা করা হয়েছে। দীর্ঘ বিশ্লেষণের পর উভয় কণ্ঠের মধ্যে ‘উল্লেখযোগ্য মিল’ পাওয়া গেছে, যা আইনগতভাবে প্রমাণ করে যে ওই কণ্ঠগুলো আসলে তাদেরই ছিল।

কি ছিল সেই ভয়ংকর কথোপকথনে?

​২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার কঠোর অবস্থান নেয়, তখন একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নির্দেশ দিতে শোনা যায়। তিনি বলেছিলেন, “আমি নির্দেশ দিয়েছি, এখন সরাসরি নির্দেশ দিয়েছি। তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে। যেখানে তাদের পাবে, সেখানেই সরাসরি গুলি করবে।”

​এই নির্দেশের বিপরীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপসকে “জি, জি” বলে সম্মতি জানাতে শোনা যায়। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই নির্দেশের পরেই রাজধানীসহ সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চড়াও হওয়ার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। এই অডিও ক্লিপটি এখন ট্রাইব্যুনালে অন্যতম প্রধান ডিজিটাল আলামত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের কণ্ঠ শনাক্ত

​একই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর নিয়েও জবানবন্দি দিয়েছেন। আন্দোলনের সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে মাঠ পর্যায়ের সমন্বয় এবং দমন-পীড়নের কৌশল নিয়ে হাবিবুর রহমানের একাধিক কথোপকথন তদন্তকারীদের হাতে আসে। ফরেনসিক ল্যাবে কণ্ঠস্বর পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আলামত হিসেবে জমা দেওয়া অডিও ক্লিপের কণ্ঠটি সাবেক এই পুলিশ কমিশনারেরই। এটি প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশনার পেছনে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদেরও সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল।


আরও পড়ুন: ফের বাড়ল সয়াবিন তেলের দাম, লিটারে গুনতে হবে আরও ৪ টাকা।  


যাত্রাবাড়ীর ইমাম হাসান তাইম হত্যা মামলা

​এই ফরেনসিক সাক্ষ্যটি মূলত যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইম হত্যা মামলার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তাইম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ১০ নম্বর সাক্ষী হিসেবে এই বিশেষজ্ঞ তার মতামত প্রদান করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্দেশে পুলিশ নিরীহ ছাত্রদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যার ফলে তাইমের মতো শত শত তরুণ প্রাণ হারায়।

আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও পলাতক তালিকা

​এই মামলায় মোট ১১ জন আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুইজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন— যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান এবং সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।

​বাকি আসামিরা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন:

১. ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান।

২. যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।

৩. ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন।

৪. এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম।

৫. ডেমরা জোনের সাবেক এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির।

৬. তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস।

৭. যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন।

৮. পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন।

৯. এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।

​আদালত এই পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে রেড নোটিশ জারির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

আইনি গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবস্থান

​প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ট্রাইব্যুনালে বলেন, ফরেনসিক রিপোর্টটি এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ডিজিটাল আলামত যখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, তখন আসামিদের পক্ষে তা অস্বীকার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, এই ফরেনসিক প্রতিবেদনটি এখন মামলার আনুষ্ঠানিক নথি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

​বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদনটি কেবল এই একটি মামলার জন্য নয়, বরং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্যান্য হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতেও শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই জবানবন্দি রেকর্ডের মাধ্যমে বিচারের স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক নির্ভরতা নিশ্চিত করতে চাইছে।

গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও জনমনে প্রতিক্রিয়া

​২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন ছিল— কেন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হয়েছিল? ফরেনসিক রিপোর্টের মাধ্যমে এখন পরিষ্কার হচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্তগুলো কোনো তাৎক্ষণিক আবেগ ছিল না, বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুপরিকল্পিতভাবে দেওয়া নির্দেশ ছিল।

​সাধারণ নাগরিক ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এই অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ফরেনসিক প্রমাণ যেহেতু মিলেছে, এখন দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই খবরটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

উপসংহার

​শেখ হাসিনা, তাপস এবং হাবিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধীদের শনাক্ত করার এই প্রচেষ্টা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এখন এই প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বিশ্ববাসী ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই বিচারের চূড়ান্ত রায়ের দিকে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র: সিআইডি ফরেনসিক শাখা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এর প্রেস ব্রিফিং এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন