রাস্তায় ফেলে স্ত্রীর গলা কাটার চেষ্টা: সাহসী পথচারীদের গণধোলাইয়ের মুখে মদ্যপ স্বামী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ
ভারতের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে পরিচিত বেঙ্গালুরু শহরে এক রোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনার সাক্ষী হলো সাধারণ মানুষ। প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত সড়কের ওপর এক ব্যক্তি তার নিজ স্ত্রীর পথরোধ করে ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ পথচারীদের অসীম সাহসিকতা এবং সময়োচিত হস্তক্ষেপে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন ওই ভুক্তভোগী নারী। গত বুধবার (৬ মে, ২০২৬) দুপুরে বেঙ্গালুরুর নেলামানগালা এলাকার দাসানাপুরায় এই ঘটনাটি ঘটে, যা পুরো শহরে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
যেভাবে শুরু হলো সেই নারকীয় তান্ডব
হামলাকারী ব্যক্তির নাম সঞ্জয় বলে শনাক্ত করেছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি মূলত ভারতের বিহার রাজ্যের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে তিনি এবং তার স্ত্রী সোনালী উভয়েই বেঙ্গালুরু শহরে এসে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেছিলেন।
ঘটনার দিন দুপুরে সোনালী যখন জরুরি কাজে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে প্রধান রাস্তায় আসেন, ঠিক তখনই মাথায় হেলমেট পরা অবস্থায় একটি মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন সঞ্জয়। সোনালীর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সঞ্জয় অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে মোটরবাইক দিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়ান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সঞ্জয় অত্যন্ত হিংস্রভাবে সোনালীকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তার মাঝখানে নিয়ে যান। এরপর পকেট থেকে একটি ধারালো ছুরি বের করে সোনালীর গলায় ধরেন এবং তাকে জবাই করার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলকে হুমকি দিলে জীবন ঝুঁকিতে পড়বে: কঠোর হুশিয়ারি নেতানিয়াহুর।
পথচারীদের বীরত্ব ও ঘাতক স্বামীকে গণধোলাই
ব্যস্ত সড়কের ওপর এমন আকস্মিক ও ভয়াবহ দৃশ্য দেখে প্রথমে চারপাশের মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেও, পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে রাস্তার পাশে থাকা একদল সাহসী পুরুষ তাৎক্ষণিকভাবে সোনালীর সাহায্যে এগিয়ে আসেন।
তারা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে সরাসরি অস্ত্রধারী সঞ্জয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। কয়েক জন মিলে সঞ্জয়কে জাপটে ধরে কাবু করে ফেলেন এবং তার হাত থেকে ধারালো ছুরিটি কেড়ে নেন। এ সময় উত্তেজিত জনতা ঘাতক সঞ্জয়কে গণধোলাই দেয়। জনতার এই প্রতিরোধ চলাকালীন সোনালী দ্রুত নিজেকে স্বামীর খপ্পর থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হন এবং নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। উপস্থিত মানুষের এই বীরত্ব না থাকলে হয়তো মুহূর্তের মধ্যেই একটি তাজা প্রাণ ঝরে যেত।
পারিবারিক কলহ ও মদ্যপানের ভয়াবহ পরিণতি
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই দম্পতির মধ্যে গত বেশ কয়েক মাস ধরে তীব্র পারিবারিক অশান্তি চলছিল। অবাক করার মতো তথ্য হলো, সঞ্জয় এবং সোনালী উভয়েরই এটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। অতীতের দুঃখ ভুলে নিজেদের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার আশায় তারা বিহার থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে বেঙ্গালুরুতে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
তবে সেই সুখের সংসার বেশি দিন টেকেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্জয় অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন। এই চরম মদ্যপানের অভ্যাসকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া ও তীব্র বাদানুবাদ লেগেই থাকত। সোনালীর অভিযোগ ছিল, সঞ্জয় নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সংসারের অশান্তি বাড়িয়ে তুলছিলেন। ক্রমাগত এই বিবাদের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে সোনালী সম্প্রতি সঞ্জয়ের সাথে আর ঘর না করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আলাদা থাকার ঘোষণা দিলে সঞ্জয় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং এর প্রতিশোধ নিতেই স্ত্রীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই নৃশংস পরিকল্পনা করেন।
আইনি ব্যবস্থা ও পুলিশের বক্তব্য
এই রোমহর্ষক ঘটনার পর স্থানীয় নেলামানগালা থানায় একটি আনুষ্ঠানিক পুলিশি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ অভিযুক্ত সঞ্জয়কে আটক করেছে এবং ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও ছুরিটি জব্দ করেছে। পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, "পারিবারিক কলহ যে এমন নৃশংস রূপ নিতে পারে তা ভাবাই যায় না। আমরা ঘটনার সব সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নিচ্ছি। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
আরও পড়ুন: ‘কামব্যাক কমরেড’: মির্জা আব্বাসের সুস্থতায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বার্তা।
বর্তমান সমাজে পারিবারিক সহিংসতা এবং মাদকের প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনাটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। একটি নিউজ পোর্টাল হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কেবল খবর পৌঁছানো নয়, বরং এর পেছনের সামাজিক ব্যাধিগুলো তুলে ধরা।
কেন এই সংবাদটি সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে?
১. পথচারীদের সচেতনতা: সচরাচর এমন ঘটনায় মানুষ ভিডিও করতে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু এখানে সাধারণ মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ একটি জীবন বাঁচিয়েছে। এটি সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ।
২. মাদকের করাল গ্রাস: মদ্যপান বা মাদকাসক্তি কীভাবে একটি সুন্দর পরিবারকে ধ্বংস করে দেয় এবং মানুষকে খুনিতে রূপান্তরিত করে, তা এখানে স্পষ্ট।
৩. নারীর নিরাপত্তা: দ্বিতীয় বিয়ে বা নতুন করে জীবন শুরুর ক্ষেত্রেও নারীরা যে কতটা অনিরাপদ থাকতে পারেন, তা এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
উপসংহার
বেঙ্গালুরুর এই ঘটনাটি যেমন শিউরে ওঠার মতো, তেমনি এটি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ যেকোনো বড় অপরাধ ঠেকাতে সক্ষম। সঞ্জয়ের মতো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ প্রকাশ্য রাস্তায় এমন সাহস না দেখায়।
'দিগন্ত বাংলা নিউজ' সর্বদা অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই ঘটনার পরবর্তী আইনি আপডেট এবং সোনালীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে আমাদের পোর্টালটি নিয়মিত ভিজিট করুন। সামাজিক যেকোনো অনিয়ম বা অপরাধের খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
তথ্যসূত্র: বেঙ্গালুরু সিটি পুলিশ এবং স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।