ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়লো: ওয়াশিংটন সংলাপে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়লো: ওয়াশিংটন সংলাপে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:

​দীর্ঘদিন ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝে কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলো নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। অবশেষে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল এবং লেবানন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে দুই দেশের শীর্ষ সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে টানা দুই দিনব্যাপী চলা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিবিড় সংলাপের পর এই যৌথ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরণের সামরিক সংঘাতের শঙ্কা আপাতত কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

​ওয়াশিংটন সংলাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা:

আমেরিকার মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই বিশেষ দ্বিপাক্ষিক সংলাপের সফল সমাপ্তির পর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা শেয়ার করেন। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, “ওয়াশিংটনে ইসরায়েল এবং লেবানেনের মধ্যকার দুই দিনের সংলাপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ইতিবাচকভাবে শেষ হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, এই সংলাপের সাফল্যের ফলশ্রুতিতে তার মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।”

​টমি পিগোট আরও জানান যে, এই সংলাপে কেবল দুই দেশের বেসামরিক প্রতিনিধিরাই উপস্থিত ছিলেন না, বরং এর সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন মার্কিন সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বিষয়ক সর্বোচ্চ কর্মকর্তারাও।

​সংঘাতের পটভূমি ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ:

এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শুরুটা হয়েছিল বেশ নাটকীয়ভাবে। গত ২৮ মার্চ ইরানে মার্কিন বাহিনী এক আকস্মিক বিমান অভিযান শুরু করার ঠিক তিন দিন পর, অর্থাৎ ২ মার্চ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। লেবাননভিত্তিক শিয়াপন্থি সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নির্মূল এবং সীমান্ত অঞ্চলকে ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য নিরাপদ করাই ছিল আইডিএফের এই অভিযানের প্রধান ও ঘোষিত উদ্দেশ্য।

​টানা প্রায় দেড় মাস ধরে চলা এই ভয়াবহ যুদ্ধ-সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র হস্তক্ষেপে গত ১৬ এপ্রিল প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় ইসরায়েল ও লেবানন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী রোববার এই বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে যুদ্ধাবস্থা পুনরায় শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ওয়াশিংটনে এই সফল সংলাপের মাধ্যমে তার মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হলো।

​২ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত চলা আইডিএফের সেই নৃশংস অভিযানে দক্ষিণ লেবাননে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দেড় মাসের হামলায় দক্ষিণ লেবাননে নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৮১৪ জন নিরীহ মানুষ এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজারেরো অধিক নাগরিক। এছাড়াও যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি লেবানিজ নাগরিক, যা অঞ্চলটিতে এক বিশাল শরণার্থী সংকটের জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন: হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলি সেনা নিহত: যুদ্ধবিরতি কি ভেস্তে যাচ্ছে?

হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলি সেনা নিহত: যুদ্ধবিরতি কি ভেস্তে যাচ্ছে?

বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও বর্তমান উদ্বেগ:

যদিও খাতা-কলমে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল, তবে এর মধ্যেও গত এক মাসে দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে কয়েক দফা চোরাগোপ্তা হামলা ও গোলাগুলি চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দুর্ভাগ্যবশত, এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাও রয়েছেন। তারা মূলত পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনাটি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাঝে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

​নতুন ‘নিরাপত্তা লাইন’ ও ভবিষ্যতের রোডম্যাপ:

চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হওয়া এই সংলাপের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত এই আলোচনার মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের বৈরি এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘ কয়েক দশক পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

​মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৯ এপ্রিলের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদরদপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দুই দেশের সীমানা নির্ধারণ ও শান্তি বজায় রাখার জন্য নতুন একটি ‘নিরাপত্তা লাইন’ (Security Line) প্রস্তাব করবেন। এই প্রস্তাবিত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আগামী ২ থেকে ৩ জুন পর্যন্ত ওয়াশিংটনেই পুনরায় দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসবেন ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা।

​যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগোট আশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে এই ধারাবাহিক সংলাপ দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তির ভিত্তিকে মজবুত করবে। পরস্পরের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগলিক অখণ্ডতাকে পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান এবং সীমান্ত এলাকার দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”

​উপসংহার:

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার এই ৪৫ দিনের বর্ধিত যুদ্ধবিরতিকে বিশ্ববাসী ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো অনেক দূরের পথ। পেন্টাগনের নতুন নিরাপত্তা লাইনের প্রস্তাব দুই দেশ কতটা মেনে নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী জুনের সংলাপের ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এই স্পর্শকাতর ভূ-রাজনীতি এবং আমাদের প্রবাসী ভাইদের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে সর্বদা দিগন্ত বাংলা নিউজ-এর সাথেই থাকুন।

​তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স (Reuters) এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন