মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের জন্য স্থলপথ খুলে দিল পাকিস্তান: বদলে যাচ্ছে এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের জন্য স্থলপথ খুলে দিল পাকিস্তান: বদলে যাচ্ছে এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ইরানের জন্য পাকিস্তানের 'লাইফলাইন': এশীয় বাণিজ্যে নতুন মেরুকরণ

​নিজস্ব প্রতিবেদক, দিগন্ত বাংলা নিউজ

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অভাবনীয় ও সাহসী সিদ্ধান্তের কথা জানালো পাকিস্তান। সমুদ্রপথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে থাকা বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ইরানের জন্য নিজেদের স্থল বাণিজ্য পথ (Land Transit) উন্মুক্ত করে দিয়েছে ইসলামাবাদ। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে ইরানের পণ্যবাহী যানবাহনগুলো পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সরাসরি অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে। রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনের প্রতি ইসলামাবাদের একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।


​অবরুদ্ধ অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার

​বিগত কয়েক বছর ধরে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে ইরানের জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য রপ্তানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। সমুদ্রপথে বাধার সম্মুখীন হওয়া ইরানের জন্য এই মুহূর্তে স্থলপথই ছিল একমাত্র বিকল্প। পাকিস্তানের এই ট্রানজিট সুবিধা তেহরানের জন্য কেবল একটি বাণিজ্যিক পথ নয়, বরং এটি তাদের ভেঙে পড়া অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল 'লাইফলাইন' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আরও পড়ুন: এশিয়ার ৮ দেশে ১৬ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস: ৪০ বিলিয়ন ডলারের লোকসানে পেন্টাগন, নাজেহাল আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

এশিয়ার ৮ দেশে ১৬ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস: ৪০ বিলিয়ন ডলারের লোকসানে পেন্টাগন, নাজেহাল আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।


​ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা

​আলজাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান প্রক্সি যুদ্ধের কারণে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। লোহিত সাগরে হুতিদের তৎপরতা এবং পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এমন এক কঠিন সময়ে পাকিস্তান ও ইরানের এই বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটি নতুন জোট গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক উন্নয়নের পর পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ এশিয়ায় মার্কিন প্রভাবকে আরও কমিয়ে দিতে পারে।


​ওয়াশিংটনের চাপ ও ইসলামাবাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত

​পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার একটি কৌশলগত অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই চেয়েছে পাকিস্তান যেন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই ট্রানজিট সুবিধার বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত এবং এর সাথে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক সংঘাতের সম্পর্ক নেই।


বাণিজ্যের নতুন রুট: সিপেক ও ইরানের সম্পৃক্ততা

​অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, পাকিস্তানের এই স্থলপথ উন্মুক্ত করার বিষয়টি পরোক্ষভাবে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক (CPEC) প্রকল্পের সাথে যুক্ত হতে পারে। ইরান যদি এই রুটে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু করে, তবে তা মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত এক বিশাল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক তৈরি করবে। এর ফলে লজিস্টিক খরচ যেমন কমবে, তেমনি মার্কিন ডলারের পরিবর্তে আঞ্চলিক মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে।


শান্তি আলোচনা ও মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকা

​পাকিস্তান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং সৌদি-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তেহরানকে এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান প্রমাণ করল যে, তারা কেবল মৌখিক শান্তি নয়, বরং সরাসরি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক ভ্রাতৃত্ব জোরদার করতে চায়। এতে করে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছে।


​উপসংহার

​সব সাম্রাজ্যের একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে এবং সময়ের প্রয়োজনে নতুন জোটের জন্ম হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাকিস্তানের এই সাহসী পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, এশীয় দেশগুলো এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়। ইরানের জন্য এই স্থলপথ কেবল পণ্য পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি পশ্চিমের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী জয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন এবং ইসলামাবাদের সম্পর্কের রসায়ন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির মূল আকর্ষণ।

​সূত্র: আলজাজিরা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিশ্লেষণ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন