আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:
কূটনৈতিক ইতিহাসের সমস্ত প্রচলিত প্রটোকল ভেঙে বেইজিংয়ের মাটিতে এক নজিরবিহীন, নাটকীয় এবং চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চীন সফর শেষ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধিদল। দুই পরাশক্তির শীর্ষ সম্মেলন শেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার সফরসঙ্গীরা যখন ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে উড়োজাহাজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিমানবন্দরের রানওয়েতে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কঠোরতম নির্দেশনার পর, চীন সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া সমস্ত সাময়িক ব্যবহারের মোবাইল ফোন (বার্নার ফোন), প্রেস পাস, মেমেন্টো এবং বিশেষ পিন কেড়ে নিয়ে বিমানের সিঁড়ির গোড়ায় রাখা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে) বেইজিং ছাড়ার শেষ মুহূর্তে আমেরিকার রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রটোকল এবং ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি রোধের অংশ হিসেবেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ওয়াশিংটন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
রানওয়েতে নজিরবিহীন দৃশ্য ও এমিলি গুডিনের এক্স বার্তা:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল বিমান 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'-এ ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তের এই নাটকীয় ঘটনাটি প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসেন নিউইয়র্ক পোস্টের অত্যন্ত জনপ্রিয় হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি এমিলি গুডিন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সরাসরি বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যটির বিশদ বর্ণনা দিয়ে একটি পোস্ট করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বেইজিংয়ে অবস্থানকালে চীনা কর্মকর্তারা মার্কিন প্রতিনিধি, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের যা কিছু দিয়েছিলেন—তা সে সাধারণ প্লাস্টিকের পরিচয়পত্র হোক, কিংবা কর্মীদের যোগাযোগের জন্য দেওয়া অস্থায়ী ‘বার্নার ফোন’ বা বিশেষ স্মারক পিন—তার কোনো কিছুই আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানে তুলতে দেওয়া হয়নি। সমস্ত সামগ্রী উড়োজাহাজের সিঁড়ির নিচে একটি বড় ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করা হয়।
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল প্রেস পুলও এই খবরের সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা দলগুলোর গভীর সন্দেহ ছিল যে, বেইজিংয়ের মাটিতে দেওয়া যেকোনো ডিজিটাল ডিভাইস, মেটাল পিন বা উপহার সামগ্রীর ভেতরে অত্যন্ত সুক্ষ্ম ট্র্যাকিং চিপ বা আড়িপাতার যন্ত্র (Spyware) লুকানো থাকতে পারে। এর মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর দূরনিয়ন্ত্রিত নজরদারি বা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য চুরির মতো ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি করা হতে পারে, এমন আশঙ্কাজনক নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই মূলত এই নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পর্দার আড়ালের তীব্র উত্তেজনা ও সিক্রেট সার্ভিসের সাথে বাদানুবাদ:
যদিও ক্যামেরার সামনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অত্যন্ত হাসিখুশি ও আন্তরিক মেজাজে দ্বিপাক্ষিক করমর্দন করতে দেখা গেছে, তবে পর্দার আড়ালের বাস্তব চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী এবং গণমাধ্যম দলগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক ছিল চরম বৈরি ও উত্তেজনাপূর্ণ।
জানা গেছে, বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘টেম্পল অব হ্যাভেন’-এ দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের একপর্যায়ে মার্কিন সাংবাদিকদের সুরক্ষায় নিয়োজিত সিক্রেট সার্ভিসের একজন সশস্ত্র এজেন্টকে মূল সভাকক্ষে প্রবেশ করতে বাধা দেয় চীনা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মীরা। এজেন্টের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার অজুহাতে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুযায়ী সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের অস্ত্র বহন করা একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং অত্যন্ত সাধারণ নিয়ম। এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রেট হলের ভেতরেই দুই দেশের উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র বাদানুবাদ ও বাগ্বিতণ্ডা ঘটে।
মার্কিন সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করার চেষ্টা:
সফর শেষে মার্কিন প্রতিনিধিদল যখন বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন, তখনো দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন ও বৈরিতা চরম আকার ধারণ করে। চীনা কর্মকর্তারা প্রথম দিকে মার্কিন সাংবাদিকদের মূল প্রেস বহরটিকে প্রেসিডেন্টের মূল গাড়িবহরের (Motorcade) সাথে যোগ দিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন।
মার্কিন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘দ্য হিল’ (The Hill) সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সরাসরি বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, চীনাদের তৈরি করা কঠোর ও অভেদ্য নিরাপত্তা বলয় এবং বাধা ভেদ করে মার্কিন সহকারীরা সাংবাদিকদের জোরপূর্বক গাড়িবহরের ভেতরে নিয়ে যান। চীনের মাটিতে মার্কিন গণমাধ্যমকে এভাবে অবরুদ্ধ বা তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার এই অপচেষ্টা মূলত দুই দেশের মধ্যকার তীব্র অনাস্থা এবং শীতল যুদ্ধের বাস্তব রূপকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও একবার পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ওবামা সফরের স্মৃতি:
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের সময় এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক জটিলতা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৬ সালে জি-২০ (G20) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন চীনের হাংঝৌ সফরে গিয়েছিলেন, তখন শি জিনপিংয়ের কর্মকর্তাদের সাথে বিমানবন্দরের রানওয়েতেই মার্কিন কর্মকর্তাদের তুমুল বাদানুবাদ হয়েছিল। ওবামার বৈঠকে ঠিক কতজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক অংশ নিতে পারবেন, তা নিয়ে দুই দেশের প্রটোকল অফিসারদের মধ্যে প্রকাশ্যেই বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল, যা সে সময় বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (দিগন্ত বাংলা নিউজ এক্সক্লুসিভ):
একজন প্রফেশনাল ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং মার্কেটার হিসেবে এই ধরণের হাই-ভোল্টেজ নিউজের বৈশ্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। বেইজিংয়ের মাটিতে চীনের দেওয়া সামগ্রী ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ ঘটনা নয়; এটি মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত আধিপত্য ও সাইবার সক্ষমতার প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ও গভীর অবিশ্বাসেরই একটি প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বাণিজ্য বা কূটনীতিতে দুই দেশ সাময়িক সমঝোতা করলেও, পর্দার আড়ালে সাইবার যুদ্ধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
আরও পড়ুন: শি জিনপিংয়ের কড়া বার্তা নিয়ে বেইজিং ছাড়লেন ট্রাম্প: তাইওয়ান ইস্যুতে চরম উত্তেজনা
উপসংহার:
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চীন সফরের শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা বিশ্ববাসীকে এটিই স্মরণ করিয়ে দিল যে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ সহজে গলার নয়। চীনের প্রযুক্তি বর্জনের এই মার্কিন নীতি আগামী দিনে দুই দেশের প্রযুক্তি ও বাণিজ্য যুদ্ধকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এমন সব রোমাঞ্চকর কূটনৈতিক খবর এবং পর্দার আড়ালের এক্সক্লুসিভ তথ্য সবার আগে নির্ভুলভাবে জানতে সর্বদা দিগন্ত বাংলা নিউজ-এর সাথেই থাকুন।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা দ্য ইকোনমিক টাইমস (The Economic Times), নিউইয়র্ক পোস্ট এবং দ্য হিল।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।