ঢাকায় এআই ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয় মামলা: সড়কে শৃঙ্খলার নতুন দিগন্ত

ঢাকায় এআই ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয় মামলা: সড়কে শৃঙ্খলার নতুন দিগন্ত

ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়: ঢাকায় এআই ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয় মামলা ও সড়কের বহুমুখী বাস্তবতার চুলচেরা বিশ্লেষণ

ট্রাফিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজধানী ঢাকার বুকে শুরু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল ই-প্রসিকিউশন বা মামলা ব্যবস্থা। ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আটক না করে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ শনাক্তের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। চলতি মে ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এরই মধ্যে হাজার হাজার আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়া হয়েছে।

​এই আধুনিক পদক্ষেপের ফলে ঢাকার মূল কোরিডোর বা ভিআইপি সড়কগুলোতে চালকদের মধ্যে সিগন্যাল ও আইন মানার ক্ষেত্রে একটি দৃশ্যমান ইতিবাচক প্রবণতা বা সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই ডিজিটাল রূপান্তরের চূড়ান্ত কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব এবং সার্বিক সাফল্য নিয়ে সাধারণ চালক, মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী থেকে লাইসেন্সবিহীন ও অনিবন্ধিত যানবাহন এবং বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা অপসারণ করা না গেলে কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারে ঢাকার সড়কে স্থায়ী বা টেকসই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।

​আশির দশক থেকে ২০২৬: ঢাকার ট্রাফিক মামলার বিবর্তন ও এনফোর্সমেন্ট ইতিহাস

​ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ধাপে বিবর্তিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

[আশির দশক: হাতে লেখা স্লিপ ও ম্যানুয়াল পদ্ধতি] 

                       │

                       ▼

[বিংশ শতক: ইলেকট্রনিক পজ (POS) মেশিনের ব্যবহার] 

                       │

                       ▼

[মে ২০২৬: এআই বেইজড স্বয়ংক্রিয় ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম]

  • হাতে লেখা স্লিপের যুগ (আশির দশক): বাংলাদেশে মূলত সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ১৯৮০-এর দশকে প্রথম হাতে লেখা কার্বন কপির স্লিপের মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশ আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া শুরু করে। এতে জটলা ও সময় নষ্ট হতো প্রচুর।
  • ​ইলেকট্রনিক পজ (POS) মেশিনের যুগ: পরবর্তীতে আধুনিকায়নের প্রথম ধাপে যুক্ত হয় পয়েন্ট অব সেলস বা পজ (POS) মেশিন। এর মাধ্যমে পুলিশ ডিজিটাল উপায়ে স্লিপ প্রিন্ট করে মামলা দেওয়া শুরু করে। তবে এই দুটি পদ্ধতিতেই ট্রাফিক পুলিশকে সরাসরি রোদে-বৃষ্টিতে পুড়ে সড়কের মোড়ে উপস্থিত থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে ম্যানুয়ালি মামলা দিতে হতো। এতে প্রায়শই মারাত্মক যানজট ও চালকদের সাথে বচসার সৃষ্টি হতো।
  • এআই বেইজড ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম (মে ২০২৬): এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে চালু করা হয় এআই ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম। এখন আর পুলিশকে লাঠি বা সিগন্যাল লাইট হাতে গাড়ির পেছনে দৌড়াতে হয় না; বরং সড়কের উপরে থাকা অদৃশ্য প্রযুক্তির চোখই অপরাধীর পরিচয় ও গাড়ির নম্বর প্লেট স্ক্যান করে মামলার খসড়া তৈরি করে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: পল্লবীতে রামিসা হত্যার ক্ষোভ: দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও রোববারে চার্জশিটের প্রস্তুতি

পল্লবীতে রামিসা হত্যার ক্ষোভ: দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও রোববারে চার্জশিটের প্রস্তুতি

​এআই ক্যামেরা যেভাবে কাজ করে: অপরাধ শনাক্তকরণ ও মামলার নিখুঁত প্রক্রিয়া

​বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার প্রধান প্রধান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি কৌশলগত পয়েন্টে এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়াল সড়কে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্ধারিত গতিসীমা (সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা) লঙ্ঘন বা ওভারস্পিড শনাক্ত করার জন্য প্রায় ৭-৮ মাস আগে থেকেই ক্যামেরা প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে ঢাকার অভ্যন্তরীণ সাধারণ রাস্তায় বহুমুখী অপরাধের গতিপ্রকৃতি বুঝতে চলতি মে মাস থেকে যুক্ত হয়েছে এআই সফটওয়্যার।

​ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীর শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভিআইপি সড়কটিতে ১০৫টি অত্যাধুনিক হাই-ডেফিনিশন এআই ক্যামেরা সচল রয়েছে। এই সিস্টেমটি মূলত নিচের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কাজ করে:

​১. অপরাধের লাইভ ফুটেজ ও ডাটা ক্যাপচার

​রাস্তায় চলাচলকারী কোনো গাড়ি ট্রাফিক আইন অমান্য করার সাথে সাথে ওপরের পোল বা পিলারে বসানো এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গাড়িটির উচ্চমানের ছবি এবং ২৫ সেকেন্ডের একটি সলিড ভিডিও ক্লিপ ধারণ করে।

​২. নম্বর প্লেট রিডিং ও কেন্দ্রীয় সার্ভারে প্রেরণ

​ক্যামেরার সাথে সংযুক্ত এআই সফটওয়্যারটি গাড়ির ডিজিটাল বা অ্যানালগ নম্বর প্লেটটি নিখুঁতভাবে রিড বা স্ক্যান করে। এরপর গাড়িটির মালিকের নাম, নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর এবং স্থায়ী ঠিকানা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থেকে খুঁজে বের করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের প্রধান সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়।

​৩. ভিডিও প্রমাণের ডিজিটাল নোটিশ ও এসএমএস

​অপরাধ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই গাড়ির মালিকের নিবন্ধিত মোবাইল ফোনে একটি তাৎক্ষণিক খুদে বার্তা বা এসএমএস চলে যায়। সেই এসএমএস-এ লেখা থাকে যে আপনার গাড়িটি অমুক তারিখে, ঠিক কতটার সময়, কোন এলাকায় এবং কী ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেছে। একই সাথে একটি অফিশিয়াল আইনি নোটিশ গাড়ির মালিকের কাগজের ঠিকানায় ডাকযোগে বা কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

​এআই ক্যামেরার নজরে থাকা প্রধান ৫টি অপরাধের তালিকা

​ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে এআই সফটওয়্যারটিকে সুনির্দিষ্ট পাঁচটি ট্রাফিক অপরাধ শনাক্ত করার জন্য কোডিং বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা এই পাঁচ অপরাধ হলো

ক্রমিক অপরাধের ধরন রাস্তায় এর ক্ষতিকর প্রভাব

১ রেড সিগন্যাল ভায়োলেশন ট্রাফিক লাইটের লাল বাতি জ্বলার পরেও গাড়ি না থামিয়ে চলে যাওয়া, যা মারাত্মক মোড় দুর্ঘটনা ঘটায়।

২ জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করা পথচারী পারাপারের জন্য নির্ধারিত জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি এনে দাঁড় করানো বা ট্রাফিক লাইটের আগে লাইন ক্রস করা।

৩ উল্টো পথে গাড়ি চালানো সড়কের শৃঙ্খলা ভঙ্গের সবচেয়ে মারাত্মক কারণ; শর্টকাট মারার জন্য উল্টো লেনে গাড়ি প্রবেশ করানো।

৪ অবৈধ স্টপেজ ও প্রতিবন্ধকতা নির্ধারিত বাস স্টপেজ ছাড়া যেখানে-সেখানে হঠাৎ গাড়ি থামানো বা অন্য যানবাহনের স্বাভাবিক গতি আটকে দেওয়া।

৫ বাম লেন ব্লক করে রাখা ঢাকার সড়কের বাম দিকের লেনটি সাধারণত ফ্রি বা সোজা চলে যাওয়ার জন্য বা বামে মোড় নেওয়ার জন্য রাখা হয়। এটি ব্লক করলে পুরো মোড় অচল হয়ে যায়।


ট্রাফিক বিভাগ আরও জানিয়েছে যে, এই পাইলট প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এআই-এর ঝুলিতে আরও কিছু আধুনিক ফিচার যুক্ত করা হবে। যার মধ্যে অন্যতম হলো—গাড়ি চালানো অবস্থায় চালক কানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন কিনা কিংবা চালক ও সামনের যাত্রী সিট বেল্ট (Seat Belt) বেঁধেছেন কিনা, তা দূর থেকেই ক্যামেরার লেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে ফেলবে।

​বর্তমান বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ: কেন সরাসরি হচ্ছে না শতভাগ স্বয়ংক্রিয় মামলা?

​উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে (যেমন- ইউকে, ইউএসএ বা দুবাই) এআই ক্যামেরা অপরাধের ছবি তোলার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে জরিমানা কেটে নেয় কিংবা সরাসরি ফাইন জেনারেট করে দেয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো পুরোপুরি ১০০০% স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা কার্যকর করা যাচ্ছে না। এর পেছনে বেশ কিছু বড় কারিগরি ও অবকাঠামোগত বাস্তব সমস্যা রয়েছে।

​ডিএমপি ট্রাফিক প্রধান আনিসুর রহমান এই জটিলতা প্রসঙ্গে বলেন,

​"আমরা বর্তমানে ক্যামেরা থেকে লাইভ ফুটেজ সংগ্রহ করছি ঠিকই, তবে ফাইনাল ই-প্রসিকিউশন বা মামলা ইস্যু করার আগে আমাদের প্রশিক্ষিত আইটি টিম কন্ট্রোল রুমে বসে সেই ফুটেজগুলো পুনরায় ম্যানুয়ালি বা মানবীয় দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে দেখছেন।"

​এই দ্বৈত চেকিং বা ম্যানুয়াল স্ক্রুটিনির প্রধান কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

  • ​অস্পষ্ট ও ভাঙা নম্বর প্লেট: ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী অনেক বাসের বা পুরোনো গাড়ির নম্বর প্লেটগুলো সঠিক বা মানসম্মত অবস্থায় নেই। কোনোটার রঙ চটে গেছে, কোনোটা ভাঙা, আবার কোনোটির ওপর কাদা বা ময়লা জমে অস্পষ্ট হয়ে আছে। ফলে এআই অনেক সময় ভুল নম্বর রিড করতে পারে।
  • ​ভুল এড়ানোর প্রচেষ্টা: সরাসরি এআই-এর ওপর ভরসা করে নোটিশ পাঠিয়ে দিলে অনেক সময় ভুল মানুষের কাছে মেসেজ চলে যেতে পারে, যা সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি বাড়াবে এবং বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করবে। তাই মানবিক রিভিউয়ের মাধ্যমে 'জিরো এরর' বা শতভাগ নির্ভুলতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
  • ​লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটার নতুন নিয়ম: নতুন ট্রাফিক আইন অনুযায়ী, অপরাধের তীব্রতা বিবেচনা করে চালকের ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কেটে নেওয়ার প্রক্রিয়াও সমান্তরালভাবে শুরু হয়েছে। ডিএমপির তথ্যমতে, ইতিমধ্যেই আইন ভাঙার অপরাধে এক হাজারের বেশি অসচেতন চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের মূল্যবান পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট পয়েন্ট শেষ হয়ে গেলে ওই চালকের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল হয়ে যাবে।

​ডিজিটাল মামলার আইনি নিষ্পত্তি ও আপিলের নিয়মাবলী

​যদি কোনো গাড়ির মালিক বা চালক তার মোবাইলে এআই ক্যামেরার মামলার নোটিশ পান, তবে আইন অনুযায়ী তা নিষ্পত্তির জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে:

​১. ১৫ দিনের সময়সীমা: নোটিশ বা এসএমএস পাওয়ার দিন থেকে পরবর্তী সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে গাড়ির মালিক বা চালককে সশরীরে ট্রাফিক বিভাগের নির্দিষ্ট দফতরে বা ডিসি ট্রাফিক অফিসে হাজিরা দিতে হবে।

২. প্রমাণ প্রদর্শন: অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি অপরাধের বিষয়টি অস্বীকার করতে চান, তবে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে সংরক্ষিত থাকা ওই অপরাধের ২৫ সেকেন্ডের হাই-কোয়ালিটি ভিডিও প্রমাণ বা ফুটেজ তাকে দেখানো হবে।

৩. জরিমানা প্রদান বা আপিল: ভিডিও দেখার পর চালক যদি নিজের অপরাধ ও দায় স্বীকার করে নেন, তবে নির্ধারিত ক্যাশলেস বা অনলাইন ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে জরিমানা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে পারবেন। আর চালক যদি মনে করেন তার সাথে অন্যায় হয়েছে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে তাকে ট্রাফিক আইন ভাঙতে হয়েছিল, তবে তার দেশের প্রচলিত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে গিয়ে এই জরিমানার বিরুদ্ধে আইনি আপিল করার পূর্ণ অধিকার থাকবে।

​সাফল্যের খতিয়ান: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বাস্তব উদাহরণ

​অনেকেই মনে করতে পারেন যে ক্যামেরার মাধ্যমে মামলা দিলে ঢাকার চালকদের আদৌ সোজা করা সম্ভব কিনা। তবে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কাছে এর একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সফল পরিসংখ্যান রয়েছে। ঢাকার বুক চিরে চলে যাওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়াল সড়কে যখন প্রথম স্পিড ক্যামেরা বসানো হয়েছিল, তখন প্রথম দিকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি গাড়ি নির্ধারিত ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাত।

​পরবর্তীতে ওই ক্যামেরার ফুটেজ দেখে নিয়মিত ডিজিটাল মামলা পাঠানো এবং জরিমানা আদায় শুরু করার পর চালকদের গতি সীমার মধ্যে থাকার প্রবণতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে এক্সপ্রেসওয়েতে ওভারস্পিডের ভায়োলেশন বা আইন ভাঙার সংখ্যা দৈনিক ২৫০-৩০০ থেকে নেমে মাত্র ২৫ থেকে ৩০টিতে এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ, কঠোর ডিজিটাল নজরদারি থাকলে চালকরা যে নিজেদের সুধরে নিতে বাধ্য হয়, এক্সপ্রেসওয়ে তার সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রমাণ।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হকের বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই মূল্যায়ন

​ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও ঢাকার সার্বিক যানজট ও সড়কের বিশৃঙ্খলা দূর করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের পরিধি ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় ও দ্বিমত প্রকাশ করেছেন দেশের প্রথিতযশা যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক। তাঁর মতে, ঢাকার মূল সমস্যা এআই প্রযুক্তির অভাব নয়, বরং সড়ক ব্যবস্থাপনার ভেতরে থাকা কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত বিশাল অনিয়ম।

┌────────────────────────────────────────────────────────┐

│             ড. এম শামসুল হকের টেকসই সমাধান             │

├────────────────────────────────────────────────────────┤

│ ১. অবৈধ ও অনিবন্ধিত যানবাহন সড়ক থেকে পুরোপুরি অপসারণ    │

│ ২. তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ধাপে ধাপে নিষিদ্ধকরণ │

│ ৩. বাস রুট রেশনালাইজেশন ও গণপরিবহনকে মেরুদণ্ড বানানো  │

└────────────────────────────────────────────────────────┘

ড. এম শামসুল হক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ঢাকার ট্রাফিক জটের নেপথ্য কারণগুলো ব্যবচ্ছেদ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন:

​১. ভিআইপি কোরিডোর বনাম বাস্তব ঢাকা

​বর্তমানে এআই ক্যামেরা দিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে, তা মূলত শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণির মতো সুনির্দিষ্ট কিছু ভিআইপি ও ভিভিআইপি সড়কে। এই সড়কগুলোতে হকার নেই, ফুটপাত দখলমুক্ত এবং তিন চাকার রিকশা ঢুকতে দেওয়া হয় না। কিন্তু এই চমৎকার কোরিডোরের বাইরের ঢাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত জটলা পাকানো।

​তাঁর ভাষায়,

​“বিজ্ঞান বলে, যদি কোনো জটিল বা কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারো, তবে সহজ জায়গায় অবশ্যই সফল হবে। আমাদের পুলিশ বা নীতিনির্ধারকরা উল্টো পথ অবলম্বন করেছেন। তাঁরা সহজ ও পরিচ্ছন্ন রাস্তায় পরীক্ষা করে সাময়িক কিছু উন্নতি দেখাচ্ছেন। কিন্তু আপনি যদি গুলিস্তান, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী বা গাবতলীর মতো ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোতে যান, তবে দেখবেন এই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাওয়াই সেখানে কাজ করবে না।”

​তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, যদি ট্রাফিক বিভাগ গুলিস্তান মোড় বা মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরকে এআই প্রযুক্তি দিয়ে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ ও যানজটমুক্ত করে দেখাতে পারে, তবেই এই বিশাল বাজেটের এআই প্রযুক্তির পেছনে সরকারি অর্থ বিনিয়োগ করা সার্থক হবে। তা না হলে পুলিশ ও সরকার উভয়েই বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে।

​২. অনিবন্ধিত গাড়ির দুষ্টচক্র ও ভুয়া লাইসেন্স

​ঢাকার রাস্তায় বর্তমানে হাজার হাজার এমন গাড়ি চলছে যার কোনো বৈধ বিআরটিএ (BRTA) নিবন্ধন বা নম্বর প্লেট নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটিমাত্র বৈধ নম্বর প্লেট নকল করে ১০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা লেগুনা ঢাকার রাস্তায় অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়া অসংখ্য গণপরিবহনের চালকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ড. শামসুল হক প্রশ্ন তোলেন, এআই ক্যামেরা কেবল সেই গাড়ির বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে পারবে যার ডিজিটাল ডাটা বিআরটিএ সার্ভারে আছে। কিন্তু যে গাড়ির কোনো অস্তিত্বই খাতাকলমে নেই, তার পেছনে ক্যামেরা ছুটে গিয়ে কীভাবে নোটিশ পাঠাবে? ফলে লাইসেন্সধারী বৈধ নাগরিকরা বারবার জরিমানার জালে আটকা পড়লেও আসল অপরাধী বা অবৈধ সিন্ডিকেট থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

​৩. বাস-কে মেরুদণ্ড বানানোর আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

​বিশ্বের উন্নত ও আধুনিক টেকসই নগরী (Sustainable Cities) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শত বছরের ট্রায়াল অ্যান্ড এররের ইতিহাস উল্লেখ করে এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, গণপরিবহন বা বড় বাস-কে শহরের যাতায়াত ব্যবস্থার মেরুদণ্ড বানাতে হবে। ঢাকার বর্তমান যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শত শত ছোট ছোট পরিবহন (যেমন- ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরবাইক, লেগুনা ও ইজিবাইক)-কে অবাধে চলতে দেওয়া।

​ছোট গাড়ি যখন রাস্তার সিংহভাগ জায়গা দখল করে নেয়, তখন বড় ও আধুনিক বাস সার্ভিসগুলো অজনপ্রিয় ও লোকসানমুখী হয়ে পড়ে। তাই ঢাকাকে বাঁচাতে হলে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বিজ্ঞানভিত্তিক নগর পরিকল্পনার পথে হাঁটতে হবে এবং বড় বাসের রুট রেশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

​মাঠপর্যায়ের চালকদের ক্ষোভ ও ফুটপাত দখলের নির্মম বাস্তবতা

​ক্যামেরায় মামলা দেওয়ার পর থেকে প্রধান সড়কগুলোতে সাধারণ চালকদের মধ্যে জরিমানা এড়ানোর তাগিদ দেখা গেলেও তাদের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২৫ বছর ধরে ঢাকার রাস্তায় পেশাদার গাড়ি চালক হিসেবে কর্মরত জুয়েল ও তাঁর সহকর্মীদের সাথে কথা বলে সড়কের কিছু বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে:

  • ​সব নিয়ম কি শুধু নিবন্ধিতদের জন্য?: চালকরা বলছেন, আমরা সরকারকে নিয়মিত রোড ট্যাক্স দিই, ফিটনেস ফি দিই, ভ্যাট দিই এবং হাজার হাজার টাকা খরচ করে লাইসেন্স নবায়ন করি। অথচ রাস্তায় আমাদের জন্য আইনের কঠোরতার কোনো শেষ নেই। একটু এদিক-ওদিক হলেই মোবাইলে হাজার টাকার জরিমানার মেসেজ চলে আসে। কিন্তু আমাদের পাশ দিয়েই যখন কোনো নম্বর প্লেট ছাড়া অবৈধ গাড়ি বা ফিটনেসবিহীন লোকাল বাস আইন ভেঙে চলে যায়, তাদের কিছু হয় না।
  • ​বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা ও রাস্তা ব্লক: ঢাকার মোড়গুলোতে যানজটের অন্যতম বড় কারণ হলো বাসগুলোর মধ্যকার ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। যাত্রী তোলার জন্য দুটি বাস আড়াআড়ি বা ত্যাড়া করে পুরো রাস্তার মুখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। চালকদের দাবি, এআই ক্যামেরা দিয়ে এই বাসগুলোর রুট পারমিট বাতিল বা স্পট ডাম্পিং না করলে জট কমবে না।
  • ​ফুটপাত ও রাস্তা দখল: ঢাকার অর্ধেকের বেশি রাস্তা হকার, অবৈধ পার্কিং এবং স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলে থাকে। কারওয়ান বাজার বা গুলিস্তানের মতো এলাকায় মূল সড়কের ওপর দোকানপাট বসে যাওয়ার কারণে চার লেনের রাস্তা সংকুচিত হয়ে এক লেনে রূপ নেয়। এই দখলদারিত্বের অবসান না ঘটিয়ে কেবল গাড়ির ওপর মামলা ঠুকে দিলে যানজট কোনোদিনই কমবে না।

​ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের প্লাবন: ট্রাফিক পুলিশের অন্তহীন চ্যালেঞ্জ

​বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ট্রাফিক বিভাগের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং অটোরিকশা বা ইজিবাইকের সীমাহীন আধিপত্য। এই যানবাহনগুলোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্রেকিং সিস্টেম বা বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য নেই, যার ফলে এগুলো প্রতিনিয়ত মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। একই সাথে অত্যন্ত ধীরগতির এই যানগুলো যখন দ্রুতগতির এক্সপ্রেসওয়ে বা প্রধান ভিআইপি সড়কে উঠে পড়ে, তখন পুরো ট্রাফিক চেইনটি ভেঙে পড়ে।

​মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মো: শওকত হোসেন এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন,

​“উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা প্রতিনিয়ত এই ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো ডাম্পিং করছি। কখনো রাস্তার মাঝেই এদের ব্যাটারির সংযোগকারী তার কেটে দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো চাকার হাওয়া ছেড়ে দিয়ে সাময়িক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এই আইনি ভাষা বা শাস্তির ধরন এই চালকদের বোধগম্য হয় বলে মনে হয় না। আমরা একদিক থেকে ধরলে তারা অন্য গলি দিয়ে আবার মূল রাস্তায় চলে আসে।”

​ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অফিসিয়াল পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত মাত্র চার মাসে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রায় ৩৫,০০০ (পঁয়ত্রিশ হাজার) ব্যাটারিচালিত রিকশা ডাম্পিং করা হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০টির মতো অটোরিকশা বা ইজিবাইক আটক করে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হচ্ছে। এত বিশাল সংখ্যার ডাম্পিংয়ের পরেও ঢাকার রাস্তা থেকে এদের সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না, যা এই দুষ্টচক্রের বিশালতারই প্রমাণ দেয়।

​রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও সুন্দর ঢাকার ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ

​ব্যাটারিচালিত এই ইজিবাইক বা অটোরিকশার পেছনে বিশাল একটি নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান ও ভোটার ব্যাংকের রাজনীতি জড়িয়ে থাকায় রাষ্ট্রকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো: আনিসুর রহমান আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, এই অটোরিকশার বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সক্রিয় ভাবনার মধ্যে রয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বড় প্রতিষ্ঠান, তাই কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব পক্ষকে সাথে নিয়ে খুব শীঘ্রই একটি সুনির্দিষ্ট, টেকসই ও বিকল্প কর্মসংস্থানমুখী বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

​পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরার সংযোজন নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত আধুনিক ও প্রশংসনীয় ডিজিটাল পদক্ষেপ। এটি ট্রাফিক পুলিশের ওপর থেকে কাজের মানসিক চাপ এবং সড়কে চাঁদাবাজির বা দুর্নীতির অভিযোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। তবে এই প্রযুক্তির শতভাগ সুফল ঘরে তুলতে হলে সবার আগে ঢাকার সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদ, ফুটপাত মুক্তকরণ, ফিটনেসবিহীন ও অনিবন্ধিত গাড়ি চিরতরে ডাম্পিং করা এবং ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের রুট গলি বা ফিডার রোডের মধ্যে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে যখন সঠিক ও পক্ষপাতহীন রাজনৈতিক সদিচ্ছার মিলন ঘটবে, তখনই আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকা একটি আন্তর্জাতিক মানের গতিশীল ও নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন