আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পর্দার অন্তরালের সামরিক কৌশল নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময় আজারবাইজানের ভূখণ্ডে তেল আবিবের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গোপনে বিশেষ সামরিক ও গোয়েন্দা দল মোতায়েন করার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য এবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রকাশ পেয়েছে। তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে নিখুঁত এবং আরও বেশি বিধ্বংসী করতে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য ও তার আশেপাশের অঞ্চল জুড়ে যে এক বিশাল গোপন সামরিক স্থাপনা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, আজারবাইজানের এই গোপন মিশনটি ছিল মূলত তারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN) এই স্পর্শকাতর সামরিক অভিযানের বিষয়ে সরাসরি অবগত থাকা একাধিক নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তেহরানকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তাদের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং তাদের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্মতি কিংবা অসম্মতিকে কাজে লাগিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী ফাঁদ পেতেছিল।
ইরান সীমান্তে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি ও সামরিক অবস্থান
সিএনএনকে তথ্য দেওয়া অত্যন্ত উচ্চপদস্থ দুটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আজারবাইজানের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত কৌশলগত এবং স্পর্শকাতর পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছিল ইসরায়েলের বিশেষ টাস্কফোর্স। এই ভৌগোলিক অবস্থানগুলো সরাসরি ইরানের উত্তর সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি বা গা-ঘেঁষে অবস্থিত। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর সবচেয়ে কাছের অগ্রবর্তী অবস্থানটি ছিল ইরানের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও সামরিক শহর তাবরিজ থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে। উল্লেখ্য, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় এই তাবরিজ শহরটিকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী একাধিকবার ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
অন্য দুটি সূত্র আরও বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে যে, আজারবাইজানের ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে কেবল সাধারণ সেনাই নয়, বরং ইসরায়েলের অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত এবং এলিট কমান্ডো দলও মোতায়েন করা হয়েছিল। এই কমান্ডোদের মূল কাজ ছিল অত্যন্ত গোপনে ইরানের ভূখণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে কিংবা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিয়ে নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence Gathering) সংগ্রহ করা এবং অত্যাধুনিক ড্রোন পরিচালনা করা। যুদ্ধের সময় উত্তর ইরানের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর জন্য এই সীমান্তঘাঁটিটি তেল আবিবের জন্য এক স্বর্ণালী সুযোগ এনে দিয়েছিল, যা তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে পরিচালনা করা একেবারেই অসম্ভব ছিল।
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরায়েলের সামরিক নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি
আজারবাইজানে এই গোপন সেনা মোতায়েনের খবরটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম বারের মতো সিএনএন ব্যাপকভাবে প্রকাশ করলেও এটি আসলে একটি বিশাল পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। মধ্যপ্রাচ্য ও তার আশেপাশের অঞ্চলে ইরানকে কাউন্টার করার জন্য ইসরায়েল যেসব প্রক্সি বা অগ্রবর্তী সামরিক অবস্থান তৈরি করেছিল, এটি ছিল তার মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি। এর ফলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী এমন অনেক ভৌগোলিক সীমানায় নিজেদের কার্যক্ষমতা প্রসারিত করতে পেরেছিল, যা সামরিক ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। এটি স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, তেহরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলায় ইরানের প্রতিবেশীদের কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি বাহিনী এই দেশগুলোর মধ্যে কিছু দেশের প্রকাশ্য ও গোপন সম্মতি নিয়ে কাজ করেছে, আবার কিছু দেশের দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা অভ্যন্তরীণ সংকটের সুযোগ নিয়ে তাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে এই বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। আর এভাবেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও বা নিজেদের অজান্তেই ইরানের প্রতিবেশীরা এই ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে জড়িয়ে পড়েছিল।
আজারবাইজান ছাড়াও তালিকায় রয়েছে আরও তিন দেশ
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, কেবল আজারবাইজানের সীমান্ত এলাকাই নয়, ইরানের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব দিক থেকে একযোগে চাপ সৃষ্টি করতে আরও কয়েকটি দেশে ইসরায়েলের গোপন সামরিক স্থাপনা ও রসদ সরবরাহের কেন্দ্র ছিল। এই তালিকায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং হর্ন অব আফ্রিকার স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র সোমালিল্যান্ড।
প্রাথমিকভাবে এই দেশগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি কেবল জরুরি অবস্থায় যুদ্ধবিমান বা পাইলটদের জন্য ‘উদ্ধারকারী দল’ (Search and Rescue Teams) হিসেবে কাজ করার কথা বলে শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আঞ্চলিক পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে অতি দ্রুত এই বাহিনীর কাজের পরিধি ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়। উদ্ধারকাজের খোলস ছেড়ে তারা সরাসরি হাই-লেভেল সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ শুরু করে। এর ফলে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের চারপাশের সীমানার কাছে স্থায়ী অবস্থান নিতে পেরেছিল, যা তাদের সামরিক কার্যক্ষমতাকে কয়েক শ মাইল পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এই অগ্রবর্তী অবস্থানগুলোর কারণেই ইসরায়েল দূরপাল্লার হামলা সত্ত্বেও ইরানজুড়ে বারবার নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল।
এলিট ফোর্স ও মোসাদের যৌথ অপারেশনের ইনসাইড স্টোরি
মিশনের ভেতরের খবর জানা একটি সূত্র উল্লেখ করেছে যে, আজারবাইজানের এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ইসরায়েলের কয়েক ডজন বাছাইকৃত চৌকস সেনা অংশ নিয়েছিল। এই বিশেষ দলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ইসরায়েলের স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্যরা, হেলিকপ্টার থেকে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে আক্রমণ ও শত্রুপক্ষের বাঙ্কারে ঢুকে বন্দি বা পাইলট উদ্ধারে অভিজ্ঞ এলিট কমান্ডো বাহিনী এবং সরাসরি মোসাদের উচ্চপদস্থ তুখোড় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন: ৩৯-এও ফুরিয়ে যাননি মেসি: যে কারণে আবারও বাজি ধরেছেন সবকিছু
তবে এই বিস্ফোরক তথ্য ফাঁসের পর স্বাভাবিকভাবেই আজারবাইজানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত আজারবাইজান দূতাবাসের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন, "তৃতীয় কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে সামরিক বা গোয়েন্দা অভিযান চালানোর জন্য আজারবাইজানের পবিত্র ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে বলে যে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করা হচ্ছে, আমরা তা সম্পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করছি।" অন্যদিকে, এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান ও বারবেরা বন্দরের ভূমিকা
এদিকে একটি সামরিক সূত্র থেকে জানা গেছে, হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে অবস্থিত আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন কিন্তু স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলকে তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে আরও একটি দুর্দান্ত ভৌগোলিক ও সামরিক অবস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিল। এর ফলে ইরানে দূরপাল্লার বড় ধরনের বিমান হামলার সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো জ্বালানি নেওয়া বা যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের জন্য সম্ভবত সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত বিমানঘাঁটিগুলো ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসেই ইসরায়েল পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রদান করে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বিশাল চমক ছিল। এই স্বীকৃতির পেছনে যে সামরিক স্বার্থ ছিল, তা এই তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো। এ ছাড়া সোমালিল্যান্ডের অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী বারবেরায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের অত্যন্ত বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও সামরিক শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে, যা ইসরায়েলের এই মিশনকে আরও সহজ করে তুলেছিল বলে ধারণা করা হয়।
ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসরায়েলি তৎপরতা
ইরানের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইরাকের অভ্যন্তরেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অন্তত দুটি অত্যন্ত গোপন লজিস্টিক ও ইন্টেলিজেন্স স্থাপনা সক্রিয় ছিল। সেখান থেকে ইসরায়েল মূলত দ্রুত সামরিক রসদ সরবরাহ এবং আকাশপথে কোনো পাইলট বিপদে পড়লে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালানোর জন্য অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে কাজ করত। ইরাকে থাকা এই দুটি গোপন ঘাঁটির খবর সর্বপ্রথম মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ও ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ প্রকাশ করেছিল। তবে ইরাকের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, তাদের দেশে কোনো প্রকার ‘অননুমোদিত ঘাঁটি বা বিদেশি বাহিনী’র অস্তিত্ব ছিল না।
পাশাপাশি মার্কিন জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ প্রথম বারের মতো প্রকাশ করে যে, যুদ্ধের তীব্রতার সময় ইসরায়েল গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক সুরক্ষাব্যবস্থা বা রাডার সিস্টেম বসিয়েছিল। এগুলো সার্বক্ষণিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের প্রশিক্ষিত সেনাও পাঠানো হয়েছিল। সিএনএন তাদের আগের রিপোর্টেও জানিয়েছিল যে, যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণের জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদ প্রধান এবং ইসরায়েলি সেনাপ্রধান অত্যন্ত গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছিলেন, যদিও আমিরাত সরকার এই সফরের খবরকে শক্ত ভাষায় নাকচ করে দিয়েছে।
আজারবাইজান-ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদী সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট
আজারবাইজানে সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতির কারণে ইসরায়েল কেবল আক্রমণের সুবিধাই পায়নি, বরং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে পাইলটদের জীবন বাঁচানোর একটি নিরাপদ করিডোরও তৈরি করেছিল। দীর্ঘ দিন ধরেই তেল আবিব আজারবাইজানকে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় কৌশলগত মিত্র বা ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই মূলত এই সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলের গোপন প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে যখন ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী এক বিশাল ও ঐতিহাসিক গণবিক্ষোভ শুরু হয়, তখন তেহরান সরকার অত্যন্ত কঠোর হস্তে সেই আন্দোলন দমন করে। সেই সময় ইরানের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে এক সুদূরপ্রসারী গোপন অভিযানের মাঠ প্রস্তুত করেছিল ইসরায়েলের মোসাদ। সেখানে সর্বাধুনিক আড়িপাতার ডিজিটাল যন্ত্র এবং সীমান্ত পর্যবেক্ষণ রাডার বসানো হয়েছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ও ইসরায়েলের একক যাত্রা
ইসরায়েলের মূল পরিকল্পনা ছিল, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর সহায়তায় ইরানের ওপর প্রথম আঘাতটি হানবে এবং সেই হামলার আড়ালে এই গোপন সীমান্ত অভিযানটি সম্পন্ন করবে। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে সেই যুদ্ধংদেহী হামলা পরিকল্পনা বাতিল করে দেন, কারণ তেহরানের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা কমানোর এক কূটনৈতিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন পিছিয়ে গেলেও ইসরায়েল একাই নিজেদের মতো করে এই মিশনে এগিয়ে যায়।
এই আড়িপাতার অত্যাধুনিক ডিভাইসগুলো সীমান্ত পাহাড়ে বসানোর জন্য ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তাদের রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ‘স্টেলথ’ যুদ্ধবিমান এবং বিশেষ কমান্ডো বাহিনীকে কাজে লাগায়। ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভালো করেই জানত যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কোনো আলোচনা বা চুক্তি শেষ পর্যন্ত টিকবে না। ফলে এই অগ্রবর্তী তথ্য সংগ্রহের ঘাঁটিটি পরবর্তীতে ইসরায়েলের জন্য এক বিশাল ট্রাম্পকার্ড হয়ে দাঁড়ায়, যার মাধ্যমে তারা ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছড়ার পূর্ব সতর্কবার্তা কয়েক মিনিট আগেই পেয়ে যেত।
টার্গেট কিলিং ও ড্রোন হামলার নেপথ্য কাহিনী
এই সফল গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সুবাদেই আজারবাইজান থেকে পরিচালিত এক বড় ধরনের ক্ল্যান্ডেস্টাইন অপারেশনের মাধ্যমে গত ৪ মার্চ ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান রহমান মোগাদ্দামকে এক নিখুঁত হামলায় হত্যা করা হয়। ইসরায়েলের দাবি ছিল, রহমান মোগাদ্দাম স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন পশ্চিমা নেতাকে হত্যার গভীর ষড়যন্ত্রের মূল কারিগর ছিলেন।
ঠিক এর এক দিন পরই আজারবাইজানের ছিটমহল নাখচিভানের একটি স্পর্শকাতর বিমানবন্দরে রহস্যময় ড্রোন হামলা ঘটে। এতে একটি টার্মিনাল ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা আহত হন। আজারবাইজানের দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এর জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করে একে একটি ‘কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী কাজ’ বলে তীব্র নিন্দা জানান। এর ঠিক পরদিনই আজারবাইজানের স্টেট সিকিউরিটি সার্ভিস ঘোষণা দেয় যে, তারা আইআরজিসির একটি বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলার ছক নস্যাৎ করে দিয়েছে, যার মূল টার্গেট ছিল আজারবাইজানে থাকা ইসরায়েলি ও ইহুদি স্থাপনাগুলো। পরে ইসরায়েল প্রকাশ্যে স্বীকার করে যে, মোসাদ এবং শিন বেত যৌথভাবে আজারবাইজানকে এই কাউন্টার-টেররিজম অপারেশনে সরাসরি ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করেছিল।
তেল ও অস্ত্রের গোপন সমীকরণ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি
ব্যবসায়িক, জ্বালানি এবং সামরিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল এবং আজারবাইজানের মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বহু বছরের পুরনো এবং অত্যন্ত গভীর। আজারবাইজান মূলত ইসরায়েলের মোট আমদানিকৃত খনিজ তেলের এক বিশাল বড় অংশের জোগান দিয়ে থাকে। আর এর বিনিময়ে তেল আবিব আজারবাইজানের সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও ধ্বংসাত্মক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করে। ২০১৬ এবং ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে নাগোরনো-কারাবাখ যুদ্ধে আজারবাইজান এই ইসরায়েলি অস্ত্রের সাহায্যেই একচেটিয়া বিজয় অর্জন করেছিল। এমনকি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ২০১৬ সালে আজারবাইজানই ইসরায়েল থেকে বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কিনেছিল।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক আজারবাইজানকে বিশ্বমঞ্চে এক বিশাল কূটনৈতিক সুবিধাও এনে দিয়েছে, যার ফলে বাকু সরকার ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকা শক্তিশালী ইসরায়েলি লবিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। বর্তমান বিশ্বের এই জটিল সমীকরণে আজারবাইজান ক্রমশ নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যেখানে ইসরায়েলের এই গোপন অক্ষটি তাদের চিরশত্রু ইরানের হাত থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।