চীনের অনন্য উদ্ভাবন: সমুদ্রের তলদেশে বিশ্বের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎচালিত ডেটাসেন্টার

চীনের অনন্য উদ্ভাবন: সমুদ্রের তলদেশে বিশ্বের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎচালিত ডেটাসেন্টার
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: সমুদ্রের তলদেশে চীনের অত্যাধুনিক বায়ুবিদ্যুৎচালিত ডেটাসেন্টারের শুভ সূচনা

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তির যে অভাবনীয় জোয়ার চলছে, তার পেছনে রয়েছে প্রসেসিং পাওয়ারের আকাশচুম্বী চাহিদা। আর এই প্রসেসিং পাওয়ার জোগান দিতে প্রয়োজন হচ্ছে বিশাল সব ডেটাসেন্টার। এই ডেটাসেন্টারগুলো পরিচালনার জন্য একদিকে যেমন বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্য বিশাল ব্যবস্থার। এই ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন এক অভাবনীয় এবং বৈপ্লবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সাংহাই উপকূলের কাছে সমুদ্রের তলদেশে বিশ্বের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎচালিত ও পরিবেশবান্ধব ডেটাসেন্টার চালু করেছে দেশটি। প্রযুক্তির ইতিহাসে এটি কেবল একটি মাইলফলক নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত।

‘সাংহাই লিংগাং আন্ডারসি ডেটাসেন্টার’—নতুন এক যুগের শুরু

চলতি বছরের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাংহাই লিংগাং আন্ডারসি ডেটাসেন্টার ডেমোনস্ট্রেশন প্রজেক্ট’। এটি বর্তমানে ২৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করছে হাইক্লাউড টেকনোলজি এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। সাংহাই উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার নিচে অবস্থিত এই ডেটাসেন্টারটি আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন।

কেন এই আন্ডারসি ডেটাসেন্টার প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?

সাধারণত ডেটাসেন্টারগুলো স্থলভাগে নির্মিত হয়। এগুলোর সার্ভার থেকে যে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়, তা ঠান্ডা রাখার জন্য প্রথাগত কুলিং সিস্টেমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করতে হয়। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আধুনিক ডেটাসেন্টারগুলোতে মোট বিদ্যুৎ খরচের ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয় কেবল সার্ভার কুলিং বা শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায়। এই খরচ এবং পরিবেশগত প্রভাব কমিয়ে আনতেই চীন বেছে নিয়েছে সমুদ্রের তলদেশকে।

বিদ্যুৎ ও জল সাশ্রয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী

সমুদ্রের পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রা খুবই কম এবং এর তাপ পরিবাহিতা ক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে সার্ভারগুলো ঠান্ডা রাখতে কোনো ধরনের যান্ত্রিক এসি বা কৃত্রিম কুলিং সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে আসে। চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি, এই আন্ডারসি প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থলভাগের ডেটাসেন্টারের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। এছাড়া, স্থলভাগের ডেটাসেন্টারে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে যে পরিমাণ সুপেয় পানির অপচয় হয়, এখানে তার কোনো প্রয়োজনই নেই। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ডেটাসেন্টারগুলোতে পানির ব্যবহার যখন চরম সংকট তৈরি করতে পারে, তখন এই প্রযুক্তি এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

বায়ুবিদ্যুতের ব্যবহার: ১০০% পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো

এই ডেটাসেন্টারটি শুধুমাত্র সমুদ্রের নিচে অবস্থিত বলেই নয়, এর শক্তির উৎসও অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর কাছাকাছিই রয়েছে বিশাল উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরাসরি ডেটাসেন্টারে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে, এটি একটি শতভাগ কার্বন-নিঃসরণমুক্ত বা গ্রিন এনার্জি-চালিত অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন দেখিয়েছে যে, এআই বিপ্লবকে পরিবেশবান্ধব রাখা সম্ভব।

উদ্ভাবন বনাম বাস্তবতা: মাইক্রোসফট থেকে চীন

পানির নিচে ডেটাসেন্টার স্থাপনের ধারণাটি কিন্তু একদম নতুন নয়। এর আগে ২০১৮ সালে মাইক্রোসফট স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের কাছে ‘প্রজেক্ট ন্যাটক’ (Project Natick) নামে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালিয়েছিল। সেই প্রজেক্টে পানির নিচে সার্ভার স্টোরেজ সফলভাবে কাজ করেছিল। তবে মাইক্রোসফট সেই ধারণাটিকে বাণিজ্যিক রূপ না দিয়ে পরীক্ষামূলক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রেখেছিল।

আরও পড়ুন: ১৫% কর দিয়ে সাদা করা যাবে কালো টাকা: জমি ও ফ্ল্যাটে নতুন সুযোগ

১৫% কর দিয়ে সাদা করা যাবে কালো টাকা: জমি ও ফ্ল্যাটে নতুন সুযোগ

চীন এবার সেই ধারণাকেই কেবল গ্রহণ করেনি, বরং একে বিশাল বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। চীনের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের বিশাল বাজারের চাহিদা, দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সরকারের ব্যাপক নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা। তারা এআই খাতকে তাদের আগামী দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

চ্যালেঞ্জ ও পরিবেশগত সতর্কতা

যেকোনো বড় উদ্ভাবনের মতো, এই প্রজেক্টটিরও কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, সমুদ্রের তলদেশে বিশাল এই স্থাপনা নির্মাণের ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র (Marine Ecosystem) বিঘ্নিত হতে পারে। সার্ভার থেকে যে তাপ সমুদ্রের পানিতে মিশবে, তা ওই নির্দিষ্ট এলাকার পানির তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা সামুদ্রিক প্রাণীদের আবাসস্থলে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া তলদেশের পলিমাটি স্থানান্তর এবং স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের সময় সামুদ্রিক শব্দদূষণ একটি উদ্বেগের কারণ।

তবে চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, স্থাপনাগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সমুদ্রের স্বাভাবিক স্রোতের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে এবং তাপীয় প্রভাব যেন ন্যূনতম হয়। নিয়মিত নজরদারি এবং আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক প্রভাব

চীন ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের এআই অবকাঠামোকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব বা কার্বন-নিউট্রাল করার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সাংহাইয়ের এই প্রকল্পটি সেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই একটি ধাপ মাত্র। বিশ্বজুড়ে যেখানে ডেটাসেন্টারগুলোর জ্বালানি খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে, সেখানে চীনের এই মডেলটি অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একটি রোল মডেল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো চীনের এই প্রযুক্তি অনুসরণ করে ভবিষ্যতে তাদের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। যদি সাগরের তলদেশের এই ডেটাসেন্টার প্রযুক্তি সফল হয়, তবে এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ভবিষ্যতের বিশ্ব অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব হবে।

উপসংহার: প্রযুক্তির নতুন যুগের পথে চীন

প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে চীন আবারও বিশ্বকে চমকে দিল। সমুদ্রের তলদেশে বায়ুবিদ্যুৎচালিত এই ডেটাসেন্টার কেবল একটি ইঞ্জিনিয়ারিং সাফল্য নয়, বরং পরিবেশ রক্ষায় আধুনিক বিজ্ঞানের এক সাহসী পদযাত্রা। এই প্রজেক্টটি প্রমাণ করে যে, টেকসই উন্নয়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তির এই রোমাঞ্চকর পথচলা, মহাকাশ গবেষণার আপডেট এবং বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ঘটে যাওয়া চমকপ্রদ সব সংবাদ পেতে চোখ রাখুন আপনাদের প্রিয় নিউজ পোর্টাল দিগন্ত বাংলা নিউজ-এ। আমরা আপনাদের সব সময় সঠিক ও ইউনিক তথ্য সরবরাহ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন