সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কড়া পুলিশি পাহারায় হাজির করা হয় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে।
ইলিয়াস আলী গুমের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জিয়াউল: ট্রাইব্যুনালে বডিগার্ডের বিস্ফোরক জবানবন্দি
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার এবং লোমহর্ষক অধ্যায়ের খতিয়ান উন্মোচিত হতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গুম, খুন, নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক এবং র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এবার আদালতে সরাসরি সাক্ষ্য দিয়েছেন তাঁরই একসময়ের সার্বক্ষণিক বিশ্বস্ত দেহরক্ষী ও রানার সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস।
গত রোববার ট্রাইব্যুনাল-১-এ কড়া নিরাপত্তা ও পুলিশি প্রহরায় কারাগার থেকে বিতর্কিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর প্রাক্তন বডিগার্ড ইমরুল কায়েস। তিনি ট্রাইব্যুনালের বিচারকের সামনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সাবেক বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুম ও হত্যাসহ বিগত ১৫ মাসে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষকে সুপরিকল্পিত উপায়ে হত্যা, গুম ও বুড়িগঙ্গা-বলেশ্বর নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার লোমহর্ষক ও গা শিউরে ওঠা প্রত্যক্ষ বিবরণ প্রদান করেন।
## ২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল: মহাখালী ফ্লাইওভার ও ইলিয়াস আলী গুমের সেই রাত
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে সাক্ষী ইমরুল কায়েস ২০১২ সালের ১৩ এপ্রিলের সেই অভিশপ্ত রাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেন, যেদিন ঢাকার বুকে সংঘটিত হয়েছিল বিএনপির তৎকালীন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা এম ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়িচালক আনসার আলীর চাঞ্চল্যকর অপহরণ ও গুমের ঘটনা। ওই সময় জিয়াউল আহসান র্যাবের ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা উইংয়ের অত্যন্ত ক্ষমতাধর প্রধান ছিলেন।
আরও পড়ুন: একটাও সামনে আইবি না, একদম মাই"রা ফেলামু’: গাজীপুরে তোলপাড়
বডিগার্ড ইমরুল কায়েস আদালতে জানান:
"২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল রাত আনুমানিক সময়ে র্যাব হেডকোয়ার্টার্স থেকে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাসে করে তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফসহ আমি নিজে মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে যাই। ওই মুহূর্তে আমি একজন সাধারণ সৈনিক ও বডিগার্ড হিসেবে জানতাম না যে আমাদের মূল টার্গেট কে বা কাকে আজ রাতে তুলে নেওয়া হবে (পিকআপ করা হবে)। গাড়ি পার্ক করে রাখার পর জিয়াউল স্যার অত্যন্ত অস্থির চিত্তে ফোনে বারবার কথা বলছিলেন এবং টার্গেট কখন আসবে তা জানার জন্য تদারকি করছিলেন। তবে এক পর্যায়ে কোনো কারণে জানা যায় যে টার্গেট আজ রাতে ওই পথ দিয়ে আসবে না। এরপর আমরা সেখান থেকে ফিরে আসি এবং ওই রাতেই আমি ৯ দিনের সাধারণ ছুটিতে নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে যাই।"
ছুটিতে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমের স্ক্রলে ইমরুল জানতে পারেন যে, মহাখালী ফ্লাইওভার এলাকা থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিনের ছুটি শেষে ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল যখন ইমরুল পুনরায় র্যাব হেডকোয়ার্টার্সে তাঁর কর্মস্থলে যোগ দেন, তখন পুরো অফিসের পরিবেশ অত্যন্ত থমথমে ও ভীতিকর দেখতে পান। তিনি অন্যান্য সহকর্মীদের মাধ্যমে বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারেন যে, ওই রাতের সমস্ত অপারেশনাল প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার খাতা এবং ভেতরের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ স্বয়ং জিয়াউল আহসান নিজের হাতে নষ্ট করে ফেলেছেন। শুধু তাই নয়, ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল থেকে নিয়মিত সকাল ৯টার ‘রোল কল’ বা হাজিরা পরিবর্তন করে ভোর ৭টায় করা হয়, যাতে সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার সুযোগ না পান।
## ‘ইলিয়াসকে গুম করলাম, এখন আপনারা এমন করলে কীভাবে হবে!’
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস আরও একটি চাঞ্চল্যকর ফোনালাপের তথ্য ফাঁস করেন, যা প্রমাণ করে ইলিয়াস আলী গুমের পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত ছিল।
ইমরুল জানান, কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর একদিন জিয়াউল আহসান তাঁর কার্যালয়ে বসে ফোনে তীব্র ক্ষোভের সাথে কথা বলছিলেন। ওই সময় তাঁর ফোনে অন্য একটি ভিআইপি কল এলে তিনি অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বলেন, "তুই এখন রাখ; শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকী স্যার ফোন দিয়েছেন।" এরপর জিয়াউল আহসান ফোনটি রিসিভ করে তৎকালীন বিতর্কিত নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলা শুরু করেন।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের মুখোমুখি নেতানিয়াহু: ওয়াশিংটন-তেল আবিব চরম সংঘাতের পথে
ওপার থেকে কী বলা হচ্ছিল তা শোনা না গেলেও, জিয়াউল আহসান অত্যন্ত ওজর ও অভিযোগের সুরে ফোনে বলছিলেন:
"স্যার, আপনাদের সুনির্দিষ্ট কথামতো ও পরিকল্পনা অনুযায়ীই তো আমি ইলিয়াসকে গুম (সাংকেতিক শব্দ: গলফ) করলাম! এখন আপনারা যদি আমাদের সাথে এমন আচরণ করেন বা পেছনে হটে যান, তাহলে আমরা কীভাবে কাজ করব? এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে সুন্দরবনের কোনো জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে বদলি করে পাঠিয়ে দিন, সেটাই আমার জন্য অনেক ভালো হবে।"
## রেললাইনে ও বুড়িগঙ্গায় লাশ ফেলার লোমহর্ষক পদ্ধতি
সাক্ষী ইমরুল কায়েস ট্রাইব্যুনালকে জানান, জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড হিসেবে যোগদানের মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মাথায় তিনি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের প্রথম বাস্তব ও নৃশংস অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একদিন গভীর রাতে (১২টা থেকে ১২:৩০ টার মধ্যে) জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে র্যাব-১-এর কার্যালয়ের সামনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে ইমরুল দুটি কালো মাইক্রোবাস দেখতে পান, যার ভেতরে বসা ছিলেন র্যাব-১-এর সিও রাশেদ এবং分 ক্যাপ্টেন কাউসারসহ কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি।
গাড়িটি রাত পৌনে ১টার দিকে টঙ্গীর আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজ পার হয়ে একটি নির্জন রেলক্রসিংয়ের পাশে গিয়ে থামে। চারপাশ ছিল গাছগাছালিতে ঘেরা ও অন্ধকার। তখন জিয়াউল আহসান ইমরুলকে আদেশ দেন, "ইমরুল, গাড়ির পেছনের সিঁড়িটা খুলে ভেতরে রাখা বস্তাটা বাইরে বের কর।" ইমরুল যখন বস্তাটি নামানোর জন্য হাত দেন, তখন তিনি ভয়ে শিউরে ওঠেন। কারণ সেটি কোনো সাধারণ বস্তা ছিল না, সেটি ছিল একটি সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মানুষের মৃতদেহ! জিয়াউলের নির্দেশে অন্য সহযোগীদের সহায়তায় সেই ডেডবডিটি রেললাইনের ওপর রেখে তারা গাড়িতে এসে বসেন। এর কিছুক্ষণ পরই ওই লাইন দিয়ে একটি দ্রুতগামী ট্রেন চলে যায়, যাতে মনে হয় এটি একটি সাধারণ রেল দুর্ঘটনা।
অনুরূপভাবে, ২০১২ সালের প্রথম দিকে ঢাকার পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে ১১ জন আসামিকে বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাতের অন্ধকারে ওই ১১ জন জীবিত মানুষের বুকে ও পিঠে ভারী সিমেন্টের বস্তা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় প্রত্যেকের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে লাশগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়, যা আর কোনোদিন ভেসে ওঠেনি।
## সুন্দরবনের সাজানো নাটক, ক্রসফায়ার এবং চুলে আগুন লাগার নৃশংসতা
ইমরুলের জবানবন্দিতে র্যাবের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর সাজানো নাটকের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, সুন্দরবনে জলদস্যু দমনের নামে র্যাব-৮ এবং র্যাব ইন্টেলিজেন্সের তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুজিব স্যার ও কমান্ডার সোহায়েল স্যারকে সাথে নিয়ে জিয়াউল আহসান একটি ভিউয়া অপারেশনের নাটক সাজিয়েছিলেন। যেখানে আগে থেকে ধরে রাখা ৩-৪ জন মানুষকে বনের ভেতরে গুলি করে হত্যা করে দস্যু দমনের মেডেল নেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালের রমজান মাসের শেষ দিকে উত্তরার নর্থ টাওয়ারের সামনে কোনো প্রকার ডাকাতির প্রস্তুতি ছাড়াই ৪ জন নিরীহ মানুষকে ধরে এনে সাজানো ক্রসফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল।
সবচেয়ে বীভৎস ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমরুল বলেন, একবার র্যাব-৪-এর সেফ হাউস থেকে হাত ও চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা দুই ব্যক্তিকে মাইক্রোবাসে করে একটি নির্জন তিন রাস্তার মোড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিয়াউল আহসান এক ব্যক্তির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সরাসরি গুলি করেন। ওই ব্যক্তির মাথায় অতিরিক্ত চুল থাকায় গুলির স্ফুলিঙ্গে তাঁর চুলে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। এই চরম অমানবিক ও বীভৎস দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত জিয়াউল আহসানসহ অন্য কর্মকর্তারা অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করে হাসাহাসি করতে থাকেন। অন্য আরেকজন ব্যক্তিকে নিয়ে জিয়াউল আহসান চলে যান, যাকে পরবর্তীতে আর জীবিত দেখা যায়নি।
## বলেশ্বর নদীতে সাগরের মোহনায় পেট ফেঁড়ে লাশ গুমের খতিয়ান
জিয়াউল আহসান তাঁর হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ চিরতরে মুছে ফেলার জন্য অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও নিষ্ঠুর পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। ইমরুল কায়েস ট্রাইব্যুনালকে জানান, তিনি স্বয়ং জিয়াউল আহসানের সাথে বেশ কয়েকবার বরিশালের পাথরঘাটার চরদুয়ানি বাজার সংলগ্ন বলেশ্বর নদীতে সাগরের মোহনায় বিশেষ অভিযানে গিয়েছিলেন।
সেখানে কখনো ২ জন, কখনো ৩ জন আবার কখনো ৪ জন টার্গেটকে একই কায়দায় ভারী সিমেন্টের বস্তা বেঁধে সাগরে ফেলার পূর্বে—জিয়াউল আহসানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে তাঁর ব্যবহৃত বিশেষ ‘কমান্ডো নাইফ’ বা ছুরি দিয়ে ওই লাশগুলোর পেট মাঝখান থেকে চিরে বা ফেঁড়ে ফেলা হতো। পেট ফেঁড়ে ফেলার মূল কারণ ছিল, যাতে নদীর পানির নিচে বা সাগরের লোনা পানিতে ব্যাকটেরিয়ার কারণে লাশের ভেতরে কোনো গ্যাস জমতে না পারে এবং লাশটি যেন ভারী বস্তা থাকা সত্ত্বেও ভুলেও কখনো ফুলে ওপরে ভেসে উঠতে না পারে।
## ১৫ মাসে ১৫০ থেকে ২০০ হত্যাকাণ্ড: ট্রাইব্যুনালে কান্নার রোল
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে এসে তৎকালীন এই ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে এবং নিজের বিবেকের দংশনে আদালতের কাঠগড়াতেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবেক রানার ইমরুল কায়েস। তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে বিজ্ঞ বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেন:
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা বিশ্বমঞ্চে ছড়াতে চায় আর্জেন্টিনা: রাষ্ট্রদূতের ঘোষণা
"আমি এই স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পবিত্র কোরআন ও বুক ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করেছিলাম, দেশের সামরিক বাহিনী থেকে কঠিন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সেই পবিত্র প্রশিক্ষণ কখনই দেশের সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে এভাবে নির্মমভাবে গুম, খুন কিংবা ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করার জন্য ছিল না। আমি মাত্র ১ বছর ৩ থেকে ৪ মাস তাঁর বডিগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই দেখেছি, তিনি বিভিন্ন পন্থায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষকে ধরে এনে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছেন। আমি আজ বিবেকের তাড়নায় এবং সমাজ ও দেশের বুকে এই সমস্ত মজলুম মানুষের আত্মচিৎকারের সুষ্ঠু ও সঠিক বিচারের স্বার্থে আদালতে এই জবানবন্দি দিতে এসেছি। আমি ট্রাইব্যুনালের কাছে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। ভবিষ্যতে দেশের আর কোনো সাধারণ সৈনিককে যেন আমার মতো এমন ভয়ংকর ও মানসিক ট্রমার পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।"
## একনজরে ট্রাইব্যুনালে উন্মোচিত জিয়াউল আহসানের অপরাধের খতিয়ান
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত লোমহর্ষক অভিযোগসমূহ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| অপকর্মের প্রধান খাতসমূহ | বডিগার্ড ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি ও সুনির্দিষ্ট বিবরণ |
| ইলিয়াস আলী গুম (২০১২) | সরাসরি স্পট পর্যবেক্ষণ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তারিক সিদ্দিকীর সাথে গুমের চুক্তি বাস্তবায়ন। |
| বিডিআর হত্যাকাণ্ডোত্তর খুন | ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-এর নামে ১০ জন জওয়ানকে ইনজেকশন ও নদীতে ডুবিয়ে হত্যা। |
| লাশ গুমের প্রধান স্থানসমূহ | টঙ্গীর রেললাইন, বুড়িগঙ্গা নদীর বুক এবং বরিশালের বলেশ্বর নদীর সাগরের মোহনা। |
| লাশ চিরে ফেলার নৃশংস পদ্ধতি | লাশ যেন কখনো ভেসে না ওঠে, সেজন্য পানিতে ফেলার আগে কমান্ডো নাইফ দিয়ে পেট চিরে ফেলা। |
| সীমান্তে মানব পাচার ও হত্যা | জাফলং সীমান্তে ভারত থেকে ২ জন গ্রহণ করে পুনরায় সীমান্তেই গুলি করে হত্যা। |
| মোট আনুমানিক নিহতের সংখ্যা | মাত্র ১৫ মাসের বডিগার্ডের ডিউটি থাকাকালীন আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষ হত্যা। |
## মামলার বর্তমান অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পদক্ষেপ
সাক্ষীর এই ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি রেকর্ড করার পর ট্রাইব্যুনালের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত বড় এবং টার্নিং পয়েন্ট বা মাইলফলক দলিল হিসেবে গণ্য হবে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আয়নাঘর ও বিভিন্ন সেফ হাউসে টর্চার সেল গঠন করে হাজার হাজার পরিবারকে পঙ্গু ও এতিম করেছে, তাদের বিচার এবার বাংলার মাটিতে নিশ্চিত হবেই।
ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর পক্ষ থেকে বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, এই সমস্ত রোমহর্ষক সত্য প্রকাশের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভুক্তگونه পরিবারগুলো দীর্ঘ এক যুগ পর হলেও তাদের প্রিয়জন হারানোর প্রকৃত বিচার পাবে। জাতীয় রাজনীতি, ট্রাইব্যুনালের বিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন প্রতিটি বিশেষ অনুসন্ধানী এবং চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে আমরা সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।