জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: দেশের প্রধান আকাশপথের প্রবেশদ্বার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকা ‘কার্গো ভিলেজ’ কমপ্লেক্সে আবারও এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৫ জুন) গভীর রাতে এই আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। রাতে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের ভেতরে হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখে সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং নিরাপত্তা কর্মীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অত্যন্ত তৎপরতার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে বিমানবন্দর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কার্গো ভিলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ জোনে বারবার অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ড ও ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত তৎপরতা
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং বিমানবন্দর এপিবিএন (APBN) সূত্র থেকে জানা যায়, শুক্রবার রাতে আনুমানিক ১১টা ২৪ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের ৯ নম্বর ফটকের (গেট) ঠিক পাশে অবস্থিত খোলা মালামাল রাখার স্থানে (কার্গো হোল্ডিং এরিয়া) প্রথম আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মালামালের স্তূপ থেকে দ্রুত ধোঁয়া বের হতে দেখে সেখানে দায়িত্বরত কর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করেন।
গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা (KPI) হওয়ায় খবর পাওয়ার সাথে সাথেই কুর্মিটোলা ও উত্তরা ফায়ার স্টেশন থেকে ফায়ার সার্ভিসের ৪টি সুপ্রশিক্ষিত ইউনিট সাইরেন বাজিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরে প্রবেশ করে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার ফাইটাররা দেখতে পান যে, কার্গো কমপ্লেক্সের একটি বড় অংশ ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢেকে গেছে এবং মালামালের ভেতর আগুন জ্বলছে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা চারদিক থেকে একযোগে পানি ও বিশেষ ফোম স্প্রে করে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করে তারা মাত্র ১৪ মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে (আন্ডার কন্ট্রোল) আনতে সক্ষম হন। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসায় এটি কার্গো ভিলেজের মূল ভবনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি, যার ফলে এক বিশাল বড় ধরনের জাতীয় ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে তদন্তের প্রস্তুতি
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর গভীর রাতে ফায়ার সার্ভিসের গণমাধ্যম ও বিপণন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলেন। তিনি জানান, "কার্গো ভিলেজের খোলা স্থানে মালামাল রাখার জায়গায় আগুন লেগেছিল। আমাদের কর্মীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। তবে এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত উৎস বা কারণ এবং এতে কী পরিমাণ মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।"
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে আজারবাইজানে ইসরায়েলের গোপন সেনা মোতায়েন: চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস
বিমানবন্দর নিরাপত্তা সূত্রগুলো ধারণা করছে, আমদানিকৃত বা রপ্তানির জন্য রাখা কোনো কার্গো চালানের রাসায়নিক উপাদান, ব্যাটারি কিংবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে এবং এর পেছনে কোনো মানুষের অবহেলা বা নাশকতা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
অতীতের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুঃসহ স্মৃতি
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুরে এই কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সেই এক স্মরণকালের ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্কারী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন সময়ে কার্গো ভিলেজের আগুন এতোটাই নিয়ন্ত্রহীন রূপ ধারণ করেছিল যে, ঢাকা ও আশেপাশের অন্তত ১৩টি ফায়ার স্টেশনের সর্বমোট ৩৭টি ইউনিটকে একযোগে টানা প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছিল।
গত বছরের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং রানওয়ের কাছাকাছি ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা দীর্ঘ সময়ের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এর ফলে শত শত বিমানযাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছিলেন এবং আন্তর্জাতিক সিডিউলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছিল। সেই আগুন নেভানোর বিপজ্জনক কাজে যুক্ত থাকতে গিয়ে বিমানবন্দরে দায়িত্বরত ২৫ জন আনসার সদস্যসহ মোট ৩৫ জন গুরুতর আহত ও দগ্ধ হয়েছিলেন। অতীতের সেই দুঃসহ ও ভয়াবহ স্মৃতির কারণে গতকাল রাতের আগুন লাগার সাথে সাথেই পুরো বিমানবন্দর এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি ও তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
কার্গো ভিলেজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ মূলত বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড। প্রতিদিন এই কার্গো কমপ্লেক্সের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস পণ্য), ওষুধ, কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এবং বিভিন্ন পচনশীল পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয় এবং বিদেশ থেকে জরুরি মালামাল আমদানি করা হয়। এই কার্গো ভিলেজে সামান্যতম অগ্নিকাণ্ড বা আন্তর্জাতিক মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা র্যাংকিং এবং লজিস্টিক ম্যানেজমেন্টের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্গো ভিলেজে বারবার আগুন লাগার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সেখানে মালামাল মজুত এবং অগ্নি-প্রতিরোধ ব্যবস্থার (Fire Safety System) মধ্যে বড় ধরনের কোনো ত্রুটি বা গাফিলতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে খোলা জায়গায় মালামাল স্তূপ করে রাখার কারণে অনেক সময় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে কিংবা ধূমপানের অসচেতনতা থেকেও আগুন লাগতে পারে। এই ঘটনার পর বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ফায়ার সেফটি অডিট করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।