বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই, ২০২৬) বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশুটি। নিহত শিশুটির নাম রাফা মনি (৭), যা স্থানীয়ভাবে কবিতা নামেও পরিচিত ছিল। এর আগে গত বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যার দিকে কামারপাড়া ফুলবাড়িয়া বস্তিতে এই পাশবিক নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর পরই স্থানীয় জনতা ও পুলিশের সহায়তায় অভিযুক্ত ঘাতক পিতা কবির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৪৫ বছর পর জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তার
ঘটনার সূত্রপাত ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের করুণ চিত্র
নিহত শিশু রাফা মনির পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার মা লিমা আক্তার এবং বাবা কবির হোসেনের মূল বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সোনাইডাঙ্গা গ্রামে। অত্যন্ত দরিদ্র এই পরিবারটি জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে এবং তুরাগের কামারপাড়া ফুলবাড়িয়া বস্তির একটি ছোট্ট ঘরে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস শুরু করে। তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া একমাত্র সন্তান ছিল ফুটফুটে রাফা মনি।
পেশায় রিকশাচালক কবির হোসেন নিয়মিত রিকশা চালাতেন না। সংসারের অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি বিভিন্ন ধরণের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। মাদক সেবনের অর্থ জোগাড় করা এবং কাজ না করার কারণে প্রায় প্রতিদিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়াঝাঁটি লেগে থাকত। লিমা আক্তারের অভিযোগ, প্রায়শই নেশার টাকা না পেলে কবির হোসেন তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। সংসারের এই করুণ অশান্তিই যে একদিন তাদের একমাত্র সন্তানের জীবন কেড়ে নেবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি অসহায় এই মা।
যেভাবে কেড়ে নেওয়া হলো নিষ্পাপ প্রাণ
নিহত শিশুর মা লিমা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়ে বুধবার সন্ধ্যার সেই লোমহর্ষক ও নারকীয় ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি জানান:
বুধবার সন্ধ্যা: প্রতিদিনের মতো বুধবার সন্ধ্যায়ও স্বামী কবির হোসেনের সাথে সাংসারিক খরচ এবং কাজ না করা নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয় লিমার। এক পর্যায়ে কবির হোসেন প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ঘরের ভেতরে ভাঙচুর শুরু করেন।
মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়া: ঝগড়ার একপর্যায়ে লিমা আক্তারের কোলে থাকা সাত মাসের শিশু রাফা মনি ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করে। এই কান্নায় কবির হোসেন আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং কোনো কিছু না ভেবেই লিমার কোল থেকে শিশু রাফাকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেন।
নিষ্ঠুর আঘাত: লিমা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কবির হোসেন শিশুটিকে অত্যন্ত পাশবিকভাবে ঘরের শক্ত মেঝেতে সজোরে আছাড় মারেন। মাটিতে পড়ার সাথে সাথে মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত পেয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে শিশুটি।
স্থানীয়দের তৎপরতা: লিমার আকুল চিৎকার ও কান্নাকাটি শুনে প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে আসেন এবং রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় রাফা মনিকে উদ্ধার করেন। রাতেই প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে শেষ যুদ্ধ ও মৃত্যু
স্থানীয় হাসপাতালে শিশুটির অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে চিকিৎসকদের পরামর্শে বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে (রাত আনুমানিক ২টার দিকে) তাকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। ঢামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান।
মাথায় গুরুতর জখম ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে। অবশেষে সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে হাসপাতালের বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সাত মাসের রাফা মনি। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা লিমা আক্তারের আহাজারিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। হাসপাতালে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসকেরাও এই নিষ্ঠুর ঘটনায় চোখ ভেজাতে বাধ্য হন।
পুলিশি অ্যাকশন ও মামলা দায়ের
তুরাগ থানা পুলিশ এই বর্বরোচিত ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তুরাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান ফয়সাল গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার রাতে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে খবর পেয়েই পুলিশের একটি বিশেষ দল কামারপাড়া ফুলবাড়িয়া বস্তিতে অভিযান চালায়। অভিযানকালে ঘটনার স্থল থেকেই অভিযুক্ত রিকশাচালক কবির হোসেনকে আটক করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত কবির হোসেন পারিবারিক কলহের জেরে নিজের সন্তানকে আছাড় মারার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন এবং ঘটনার সময়ও তিনি অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন।
শিশুটির মৃত্যুর পর তুরাগ থানায় পূর্বের নির্যাতনের অভিযোগটিকে এখন একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে। পুলিশ এই দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দায়ের করা হত্যা মামলায় কবির হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ আদালতে প্রেরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিশুটির মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখছে তুরাগ থানা পুলিশ।
সংবাদ সূত্র: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্প ও তুরাগ থানা পুলিশ কার্যালয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।