ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর অবশেষে ধরা পড়লেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম হত্যাকারী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন।
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই, ২০২৬) ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে সুকৌশলে বিভিন্ন ছদ্মবেশে আত্মগোপনে থাকা এই সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজই তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে চূড়ান্তভাবে হস্তান্তর করেছে পুলিশ প্রশাসন। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও বিতর্কিত সেনা অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকরের পথ আরও এক ধাপ উন্মোচিত হলো।
যেভাবে জালে জড়ালেন দীর্ঘদিনের পলাতক মেজর মোজাফফর
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল জানায়, ১৯৮১ সালের মে মাসে সংঘটিত এই বর্বরোচিত ঘটনার পর থেকেই সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে সাবেক মেজর মোজাফফর হোসেন সম্পূর্ণ আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি শুধু দেশেই নয়, বিভিন্ন সময়ে দেশের বাইরে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় নিজের আসল নাম-পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে ছদ্মবেশে বসবাস করে আসছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও প্রতিবারই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি চৌকস দল বিশ্বস্ত ও গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, মোজাফফর হোসেন ছদ্মনামে রাজধানী ঢাকার বনানী ডিওএইচএস (DOHS) এলাকায় গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পর ডিবি পুলিশের বিশেষ দল গত রাতে বনানী ডিওএইচএস এলাকায় একটি ঝটিকা ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে চালানো এই সফল অভিযানে অবশেষে দীর্ঘ ৪৫ বছরের পলাতক আসামি মোজাফফর হোসেনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি পুলিশের বক্তব্য ও সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর
এই চাঞ্চল্যকর ও ঐতিহাসিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান সাজাপ্রাপ্ত আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে গত রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মামলার নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়।
যেহেতু তিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সামরিক আদালতের রায়ে দণ্ডিত আসামি, তাই আজ বৃহস্পতিবার প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁকে পরবর্তী আইনি দণ্ড কার্যকরের সুবিধার্থে সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের দেওয়া চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রপক্ষ পরবর্তী যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে: চট্টগ্রামে ঠিক কী ঘটেছিল?
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সেই রক্তক্ষয়ী দিনটির স্মৃতি আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম বিভীষিকাময় এক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দুই দিনের এক সাংগঠনিক সফরে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হন। তাঁর এই চট্টগ্রাম সফরের মূল লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ মারাত্মক রূপ নিয়েছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সুপ্রিম লিডার হিসেবে সেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অমিল নিরসন করতেই তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন।
চট্টগ্রামে পৌঁছে সফরের প্রথম দিন অর্থাৎ ২৯ মে পুরো বিকেল এবং সন্ধ্যা জুড়ে স্থানীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে একের পর এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক শেষে ক্লান্ত শরীরে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে ঘুমাতে যান। কিন্তু তাঁর সেই ঘুম আর ভাঙেনি।
৩০ মে ভোররাতে বা আনুমানিক শেষ রাতের দিকে সেনাবাহিনীর একটি নির্দিষ্ট অংশের কতিপয় বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সশস্ত্র দল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আকস্মিকভাবে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস চত্বর অবরুদ্ধ করে ফেলে। তারা অতর্কিতে সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে নারকীয় তাণ্ডব চালায় এবং ঘুমন্ত রাষ্ট্রপতির কক্ষ লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি নিহত হন। ৩০ মে সকালে যখন দেশের রাষ্ট্রীয় বেতার বা রেডিওতে প্রথমবারের মতো জিয়াউর রহমানকে হত্যার খবরটি ভেসে আসে, তখন পুরো দেশ স্তম্ভিত ও স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।
আরও পড়ুন: রেমিট্যান্সে অবিশ্বাস্য গতি: মাত্র ৬ দিনেই এলো ৭০ কোটি ডলার
বিচারের দীর্ঘ ইতিহাস ও মোজাফফরের ভূমিকা
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সামরিক আইন ও প্রচলিত দণ্ডবিধির আওতায় গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। সেই বিচারে যে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা এবং ষড়যন্ত্র করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই মেজর মোজাফফর হোসেন। তবে রায়ের পর থেকেই তিনি দেশের বাইরে ও ভেতরে অত্যন্ত সুকৌশলে আত্মগোপন করে পালিয়ে বেড়াতে সক্ষম হন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর এই সাজাপ্রাপ্ত আসামির ধরা পড়া আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সাফল্য। এর মাধ্যমে পলাতক আসামিদের মনে এই বার্তা পৌঁছাবে যে, যত দীর্ঘ সময়ই পার হোক না কেন, অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ আইনের শাসনে নেই।
সংবাদ সূত্র: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনসংযোগ বিভাগ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।