অল্প কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার, জল ঘোলা করার চেষ্টা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অল্প কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার, জল ঘোলা করার চেষ্টা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
 ঢাকা: চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল এবং অটোপাসের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ ও কর্মসূচি নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অল্প কিছু শিক্ষার্থীর এই আন্দোলনকে সরকার কোনোভাবেই পাত্তা বা গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশের পরিস্থিতি ও জল ঘোলা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

​আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই, ২০২৬) দুপুরে রাজধানী ঢাকার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন সমসাময়িক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের তালিকা সংশোধন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের সুদৃঢ় আইনি রূপরেখা তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন: ফুটবল বিশ্বকাপের মহোৎসব: ফাইনালের মহারণে মুখামুখি স্পেন ও আর্জেন্টিনা

​আন্দোলন করে পরীক্ষা বাতিল বা অটোপাসের সুযোগ নেই

​চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির অজুহাতে একদল এইচএসসি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা স্থগিত ও বাতিলের দাবির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তাঁর সরকারি অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মান ও মেরুদণ্ড রক্ষা করতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর। মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষার্থীর অযৌক্তিক দাবি বা আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করার কিংবা পূর্বের মতো অনৈতিকভাবে 'অটোপাস' দেওয়ার কোনো সুযোগ বর্তমান নিয়মে নেই।

​স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে অংশ নিতে পারে, তার সব ধরণের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এই সুকোমলমতি শিক্ষার্থীদের আবেগ ও আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল ও পরাজিত শক্তি জল ঘোলা করার এবং দেশে একধরণের কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সরকার এই ধরণের যেকোনো অপতৎপরতা রুখে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

​সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই ফাঁসি কার্যকর

​মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকেরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলাগুলোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতামত জানতে চান। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "বিগত গণ-অভ্যুত্থানে শত শত ছাত্র-জনতা হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন বা তাঁকে যদি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হবে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায় অনুযায়ী তাঁর ফাঁসির দণ্ড শতভাগ কার্যকর করতে সরকার বদ্ধপরিকর।"

​তবে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মন্ত্রী যোগ করেন যে, যদি দেশের প্রচলিত আইনে তাঁর কোনো আপিল করার আইনি সুযোগ অবশিষ্ট থাকে, তবে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। কিন্তু অপরাধের যে ভয়াবহতা, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

​বেনজীর আহমেদ ও ওসমান হাদিকে ফিরিয়ে আনার বিশেষ প্রক্রিয়া

​দেশের চাঞ্চল্যকর অর্থ পাচার ও হত্যাকাণ্ড মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান যে, বৈশ্বিক অপরাধ দমন শাখা ও আন্তর্জাতিক চেইনের মাধ্যমে পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে।

​সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক বিতর্কিত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ বা ডিপোর্ট করার জন্য কূটনৈতিক স্তরে জোর আলোচনা চলছে।

​ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া কুখ্যাত অপরাধী ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মূল আসামিদেরও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মুখোমুখি করার সব ধরণের আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

​ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে জুলাই শহীদদের তালিকা যাচাই

​বিগত জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক সংবেদনশীল ও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা বা বিতর্ক বরদাশত করা হবে না। সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাওয়া অজ্ঞাতনামা বা নতুন করে দাবি করা শহীদদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ (DNA) টেস্ট বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।

​যদি উন্নত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো মরদেহের পরিচয় ও জুলাইয়ের ঘটনার সত্যতা বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রমাণিত হয়, তবেই কেবল সরকারি তালিকায় শহীদদের মোট সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। পক্ষান্তরে, যদি কোনো নাম বা তথ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কিংবা সুযোগ নেওয়ার জন্য ভুয়া বা জাল প্রমাণিত হয়, তবে তাকে অনতিবিলম্বে সরকারি খসড়া তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হবে। সরকার একটি নিখুঁত ও নির্ভুল শহীদ তালিকা জাতিকে উপহার দিতে চায়।

আরও পড়ুন: অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস

​আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন

​দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি কর্তৃক প্রশাসনিক আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করার যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারও কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বা নির্বাহী আদেশে তড়িঘড়ি করে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা সংঘটনের সুনির্দিষ্ট দায়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তদন্ত কার্যক্রম সমান গতিতে চলমান রয়েছে।

​তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, এই পৈশাচিক গণহত্যার তদন্ত কাজ প্রায় শেষের দিকে এবং খুব দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ আইনি তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। এরপর আদালতই নির্ধারণ করবেন দল হিসেবে তাদের আইনি ভবিষ্যৎ কী হবে।

​সংবাদ সূত্র: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেস উইং ও সচিবালয় বিট সাংবাদিক ফোরাম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন