কামারখন্দে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগর, নিরাপত্তায় হটলাইন চালু পুলিশের

কামারখন্দে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগর, নিরাপত্তায় হটলাইন চালু পুলিশের
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় মহোৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবকে আনন্দঘন, শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপনের লক্ষ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার মৃৎশিল্পীদের পাড়াগুলোতে এখন বিরাজ করছে গভীর কর্মব্যস্ততা। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কামারখন্দ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভদ্রঘাট বাজারের পালপাড়ায় প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। সকালের প্রথম আলো ফোটা থেকে শুরু করে গভীর রাত অবধি কাদা-মাটি, খড়, বাঁশ ও সুতলি নিয়ে একনাগাড়ে কাজ করে চলেছেন প্রতিমাশিল্পীরা। দিন-রাত এক করে প্রতিমার খড় ও মাটির কাঠামো তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন কারিগরেরা। দেবীর আগমনী বার্তাকে সামনে রেখে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে মৃৎশিল্পীদের ঘরে ঘরে সৃষ্টি হয় এক অনন্য নান্দনিক শিল্পের সমাহার। দীর্ঘদিনের পারিবারিক পেশাগত ঐতিহ্যকে ধারণ করে কারিগরেরা পরম ভক্তি ও মমতায় একের পর এক দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা গড়ে তুলছেন।

আরও পড়ুন: তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে কৃষকের ৮ লাখ টাকার ৮টি গরু চুরি

সরেজমিনে কামারখন্দের ভদ্রঘাট পালপাড়া ঘুরে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের ঘরে ঘরে চলছে প্রতিমা তৈরির মহোৎসব। কর্মশালাগুলোতে একপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মাটির প্রলেপ দেওয়া দেবী দুর্গার বিভিন্ন আকারের প্রতিমা। স্থানীয় কারিগরদের পাশাপাশি কাজের চাপ সামাল দিতে বগুড়া, পাবনা, রংপুর ও নাটোর জেলা থেকেও দক্ষ কারিগরেরা এখানে এসে দিন রাত কাজ করছেন। দূরদূরান্ত থেকে আসা এসব অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী স্থানীয়দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান তালে কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের অবয়ব। কাদামাটির মূল অবয়ব নির্মাণ ও রোদে শুকানোর পর্ব শেষ হলেই শুরু হবে বর্ণিল রূপায়নের কাজ। মৃৎশিল্পীরা জানান, পূজার প্রায় ২০ দিন আগে থেকেই শুরু হবে রং-তুলির সুক্ষ্ম কারুকাজ। বিভিন্ন রং ও তুলির নিখুঁত আঁচড়ে দেবীর অবয়বকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলতে কারিগরেরা এখন থেকেই যাবতীয় প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছেন।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জ ডিসি অফিসে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকা লোপাট, কর্মচারীর শাস্তিমূলক বদলি

পালপাড়ার কারিগরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২১৬টি প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি প্রতিমার আকার, শৈল্পিক কারুকার্য ও গঠনের ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে এর আর্থিক মূল্য নির্ধারিত হয়। সেই অনুসারে আকার, গঠনশৈলী ও কারুকার্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি প্রতিমার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব প্রতিমা সরবরাহ করা হবে টাঙ্গাইল, নাটোর, বগুড়া ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে। বিভিন্ন জেলার পূজা আয়োজক কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যেই ভদ্রঘাটে এসে প্রতিমার আগাম বায়না সম্পন্ন করছেন। তবে প্রতিমার ভালো চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রতিমা তৈরির কাঁচামাল ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কারিগরেরা। তাঁদের দাবি, বিগত বছরগুলোর তুলনায় উৎপাদন খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা জানান, ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া একটি প্রতিমা তৈরিতেই বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। ফলে কঠোর পরিশ্রমের পরও লাভের অঙ্ক নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে। মাটি, সুতলি ও রঙের চড়া দামের কারণে এবার লাভের হার কমে যাওয়ার কথা জানান কারিগরেরা। কারিগর বলরাম পাল বলেন, “একেকটি প্রতিমার নকশা ও দাম একেক রকম। আমাদের এলাকায় এবার ২১৬টি প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। প্রতিমার দামের ভিন্নতা থাকায় বিক্রি পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মোট কত টাকার ব্যবসা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে উপকরণের দাম বাড়ায় এবার লাভের মার্জিন অনেকটাই কম।”

এদিকে আসন্ন দুর্গোৎসব ঘিরে যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ এবং কারিগরদের কর্মপরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিমা তৈরির স্থান ও কারিগরদের সার্বিক নিরাপত্তা তদারকি করতে রবিবার সন্ধ্যায় ভদ্রঘাটের পালপাড়া পরিদর্শন করেন সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু। পরিদর্শনকালে তিনি কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের কাজের অগ্রগতি ও স্থানীয় পরিবেশের খোঁজখবর নেন। পূজাকে কেন্দ্র করে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে একটি জরুরি হটলাইন নম্বর চালুর নির্দেশ দেন পুলিশ সুপার। একই সঙ্গে কামারখন্দ থানা-পুলিশকে প্রতিমা তৈরির স্থানসহ আশপাশের এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার কঠোর নির্দেশনা দেন। পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন কামারখন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাশমত আলী, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শম্ভু নাথ দাশ,বিএনপির নেতা আব্দুল আলিম খান, মির্জা আব্দুস সামাদ এবং জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বিক নজরদারির বিষয়ে কামারখন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাশমত আলী জানান, “ভদ্রঘাটের পালপাড়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য পুলিশের বিশেষ টহল দল নিয়োজিত থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় গ্রাম পুলিশও পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবে। উৎসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারিগর ও সংশ্লিষ্ট এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সজাগ থাকবে।” পুলিশ প্রশাসনের এমন তৎপরতা ও নজরদারির কারণে কারিগরেরা নির্বিঘ্নে তাঁদের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন। সম্প্রীতির আবহে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ ও পালপাড়া মৃৎশিল্পী সমাজ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন