ফরিদপুর মেডিকেলে ট্রলি না পেয়ে কোলে অক্সিজেন নিয়ে ছোটাছুটি, পথেই শিশুর মৃত্যু

ফরিদপুর মেডিকেলে ট্রলি না পেয়ে কোলে অক্সিজেন নিয়ে ছোটাছুটি, পথেই শিশুর মৃত্যু

ফরিদপুর প্রতিনিধি / ফরিদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে প্রায়শই নানা ধরনের চরম দুর্ভোগ ও অবহলার শিকার হতে হয়। তেমনি এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন একটি মুমূর্ষু শিশুকে অন্যত্র নেওয়ার জন্য সময়মতো কোনো ট্রলি বা হুইলচেয়ার সংগ্রহ করতে না পেরে স্বজনদের চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। ট্রলি না পেয়ে উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে এবং হাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও স্যালাইনের বোতল ঝুলিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দৌড়াতে হয়েছে অসহায় পরিবারের সদস্যদের। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে সড়ক পথেই তিন বছর বয়সী ওই অবুঝ শিশুর চিরবিদায় ঘটে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে ৯২টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত

হাসপাতাল ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, মর্মান্তিক এই ঘটনার শিকার শিশুটির নাম সাফা মারওয়া। সে ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের হোগলাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রবিন শেখের কন্যা। সম্প্রতি বাড়ির সামনের সড়কে একটি দ্রুতগামী অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতরভাবে আহত হয় শিশু সাফা। পরিবারের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে তাকে অক্সিজেন ও স্যালাইন প্রদান করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ট্রমা সেন্টারে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, ট্রমা সেন্টারে নেওয়ার জন্য একটি ট্রলির প্রয়োজন হলে তা সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্বজনরা। হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীদের কাছে ট্রলি চাইলে তারা এর বিনিময়ে অবৈধভাবে টাকা দাবি করেন। তাৎক্ষণিকভাবে সেই আর্থিক দাবি মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় কোনো ট্রলি প্রদান করা হয়নি বলে দাবি করেছে শিশুর পরিবার। উপায়ন্তর না পেয়ে নিরুপায় হয়ে এক স্বজন মুমূর্ষু শিশুকে কোলে তুলে নেন, অন্যজন ভারী অক্সিজেন সিলিন্ডার বহন করেন এবং অপরজন স্যালাইনের বোতল হাতে নিয়ে জরুরি বিভাগ থেকে ট্রমা সেন্টারের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপে এই মর্মান্তিক দৃশ্যটি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন: তাড়াশে ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য ও হয়রানি: চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

ক্ষোভ প্রকাশ করে শিশুটির পিতা রবিন শেখ সংবাদমাধ্যমকে জানান, “আমার বাচ্চাটা এমন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে কিন্তু নার্সরা স্বাভাবিক গল্পগুজবে মশগুল। আমাদের চিল্লাচিল্লিতে তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।” তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এমন মুমূর্ষু রোগীকে ডাক্তাররা তেমন কোনো চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা রেফার করে দিলেন। এত অসুস্থ মানুষ নিয়ে ঢাকায় যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার তিন বছরের মেয়েটি পথেই গাড়ির মধ্যে মারা গেলেন। এই কষ্টের কথা আমি কাকে বলব।” পরিবারের এমন মারাত্মক অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এর সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

এদিকে পুরো ঘটনার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মানষ কৃষ্ণ কুন্ডু সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন যে, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং রোগীর স্বজনদের তোলা অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় ট্রলিতে করে স্থানান্তর করা হলে তার ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারত—এ কারণেই মূলত নার্সরা শিশুটিকে কোলে বা নিরাপদে নিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা অনিয়ম ছিল না বলে দাবি করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এস.এইচ

আরও পড়ুন: দিনমজুরের অভাবের সংসার জয় করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার হলেন সিরাজগঞ্জের রনি

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন