দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা ইরানের: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সমীকরণ

দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা ইরানের: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সমীকরণ
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা ইরানের: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, দিগন্ত বাংলা নিউজ | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা ইরানের: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সমীকরণ

​তেহরান, ইরান: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইরান। দেশটির জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের দাবি অনুযায়ী, তেহরানের হাতে বর্তমানে এমন পরিমাণ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা বছরের পর বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। বুধবার (২৯ এপ্রিল) ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন দেশটির প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরুজের্দি।


​সামরিক সক্ষমতার নতুন বার্তা

​ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিশনের উপ-প্রধান আলাউদ্দিন বোরুজের্দি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তেহরান তার সামরিক শক্তির সবটুকু এখনও বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেনি। তিনি বলেন, "আমরা কৌশলগতভাবে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আধুনিক সমরাস্ত্রগুলো গোপন রেখেছি। আমরা এখনও আমাদের ‘ট্রাম্প কার্ড’ বা নতুন সক্ষমতাগুলো দেখাইনি।"

​সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই দাবি কেবল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা প্রোপাগান্ডা নয়। গত কয়েক দশকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান তার অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং কামিকাজে ড্রোনের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। বোরুজের্দির এই বক্তব্য সেই সামরিক স্বয়ংসম্পূর্ণতারই ইঙ্গিত দেয়।


​হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন অবরোধ

​সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রচেষ্টাকে সরাসরি ‘অকার্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রায় ১২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালির কাছে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে এবং বহু ইরানি জাহাজ মার্কিন বাহিনীর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

​আলাউদ্দিন বোরুজের্দি কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, "হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকারের প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। যেকোনো আন্তর্জাতিক আলোচনায় এই বিষয়টি তেহরানের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা হবে।" কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী এই পথটিও হরমুজ প্রণালির মতোই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে যেকোনো অস্থিতিশীলতা বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।


​আইআরজিসি-র হুঁশিয়ারি: নতুন সক্ষমতার প্রয়োগ

​এদিকে, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কমান্ডারের রাজনৈতিক সহকারী হামাদ আকবরজাদেহ এক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। মঙ্গলবার মিনাব শহরে আয়োজিত এক গণসমাবেশে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়, তবে আইআরজিসি তাদের এমন সব উন্নত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

​আকবরজাদেহ জানান, বড় ধরনের নৌজাহাজ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার মতো উন্নত পরিচালন সক্ষমতা এখন ইরানের নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে। এই সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


​যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন

​প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। তবে ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পরবর্তী আলোচনা কোনো প্রকার চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে।

​মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবগুলো মেনে নেওয়া তাদের জন্য অসম্ভব। তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার প্রস্তাব দিলেও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার জন্য তুলে রেখেছে, যা ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পথ প্রশস্ত করছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।


​দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব

​ইরান যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পথে হাঁটে, তবে তার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বোরুজের্দির বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ভরসা করছে না, তারা বিশ্ব অর্থনীতি ও সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকেও যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


উপসংহার

​ইরানের এই নতুন রণকৌশল এবং সমরাস্ত্র মজুতের ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। একদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ, অন্যদিকে ইরানের সামরিক জেদ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তেহরানের হাতে থাকা সেই ‘লুকানো কার্ডগুলো’ আসলে কী, তা দেখার জন্য বিশ্ববাসীকে হয়তো আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। তবে আলাউদ্দিন বোরুজের্দির এই সাক্ষাৎকার বিশ্বশক্তিগুলোর জন্য যে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন