নিজস্ব প্রতিবেদক, দিগন্ত বাংলা নিউজ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মেঘ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সাথে কোনো ধরনের পারমাণবিক চুক্তি যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায়, ওয়াশিংটন কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করবে না। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাবনা এখন সুদূরপরাহত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
ক্লাব ফ্লোরিডা ফোরাম ও ট্রাম্পের রণকৌশল
সম্প্রতি ফ্লোরিডায় আয়োজিত ‘ক্লাব ফ্লোরিডা ফোরাম’-এ এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য রাখার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে তার প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, “আমরা জানি ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি কঠিন সময় পার করছে। তাদের বিভিন্ন পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য এবং নতুন চুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। তবে আমেরিকা কোনো তাড়াহুড়ো করবে না। আমরা এমন কারো সাথে আলোচনায় বসব না যারা আমাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থকে খাটো করে দেখে।”
ট্রাম্পের এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে 'ম্যাক্সিমাম প্রেশার' বা সর্বোচ্চ চাপের কৌশলটি আবারও প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন।
ইরানি নেতৃত্বে বিভক্তির দাবি: সত্য নাকি রাজনৈতিক চাল?
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তিনি বলেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সফল অভিযানে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক প্রভাবশালী নেতা ও সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন। যদিও তিনি এই দাবির সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ ওই সভায় উপস্থাপন করেননি, তবে তার এই মন্তব্য তেহরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থা কমানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাদের দুর্বল প্রমাণ করাই ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য।
পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে জিরো টলারেন্স
ট্রাম্প তার বক্তব্যে পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তার শাসনামলে ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক বোমার মালিক হতে দেওয়া হবে না। তিনি মনে করেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে সক্ষম হয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের এবং বিশেষ করে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র গড়তে দেওয়া হবে না—এটি কেবল একটি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।”
আরও পড়ুন: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর: ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে নবম পে-স্কেল।
প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাব ও আলোচনার অচলাবস্থা
গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় ইরান একটি সংশোধিত চুক্তির প্রস্তাব আমেরিকার কাছে পাঠিয়েছিল। সেখানে ইরান তাদের ওপর আরোপিত কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউস সেই প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, ইরানের শর্তগুলো অস্পষ্ট এবং এতে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে আবারও বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও বিশ্ববাজারের ওপর প্রভাব
ইরান ও আমেরিকার এই টানাপড়েন কেবল সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে। যেহেতু ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ, তাই তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ট্রাম্পের এই নতুন হুঁশিয়ারির পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, যদি আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে পারস্য উপসাগরে আবারও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মিত্রদের দ্বিধা
ট্রাম্প যখন ইরানকে 'ছাড় দেওয়ার' শর্ত দিচ্ছেন, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সদস্য দেশগুলো কিছুটা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি চায় আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে। তবে ট্রাম্পের এই কঠোর মনোভাব ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলছে। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকা যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে ইউরোপ কি একাই ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, নাকি মার্কিন চাপের মুখে তারাও পিছু হটবে?
ইরানের পাল্টা হুমকি ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের পক্ষ থেকে এখনও কড়া কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না এলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, ইরান তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বর্তমানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে অর্থনৈতিক মন্দা আর অন্যদিকে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। তবে পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইরান তাদের জাতীয় গৌরব হিসেবে দেখে, তাই ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী 'বড় ছাড়' দেওয়া তেহরানের জন্য একটি রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আগামী দিনের সম্ভাবনা: যুদ্ধ নাকি সমঝোতা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি সম্ভাবনা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রথমত, আমেরিকা ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে এতটাই কোণঠাসা করবে যে তেহরান শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সব শর্ত মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। দ্বিতীয়ত, ইরান যদি তাদের অবস্থান থেকে এক চুলও না নড়ে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরণের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য যুদ্ধের দামামাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
উপসংহার
ট্রাম্পের এই 'ক্লাব ফ্লোরিডা ফোরাম'-এর বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতির আগামী দিনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে। পারমাণবিক চুক্তি কেবল একটি কাগজপত্রের দলিল নয়, এটি এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান কি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার শর্ত মেনে নিয়ে ছাড় দেবে, নাকি নতুন কোনো সামরিক জোট গঠনের পথে হাঁটবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কের শীতলতা আরও বহুগুণ বেড়ে গেল।
তথ্যসূত্র: শাফাক নিউজ, আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সংস্থা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।