ফসল হারানোর শোকে কৃষকের মৃত্যু: হাওরাঞ্চলে শোকের ছায়া

ফসল হারানোর শোকে কৃষকের মৃত্যু: হাওরাঞ্চলে শোকের ছায়া

হাওরে শোকের মাতম: স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় স্তব্ধ অষ্টগ্রাম, সোনালী ধানের মৃত্যুতে কৃষকের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ

​নিজস্ব প্রতিবেদক, দিগন্ত বাংলা নিউজ

​কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সোনালী স্বপ্নের ওপর এখন কেবলই হাহাকার আর কান্নার রোল। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে যে ধানের হাসি দেখে কৃষকের বুক ভরে উঠত, আজ সেই ধানই হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের আজীবনের শোকের কারণ। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। পৈতৃক ভিটেমাটি আর ঋণের টাকায় ফলানো বোরো ধান চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে সেই শোক সইতে না পেরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন কৃষক আক্তার হোসেন (৬০)।


ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আকস্মিক মৃত্যু

স্থানীয় সূত্র এবং জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার বিকেলে উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর কালনি হাওরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত আক্তার হোসেন আলীনগর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত দুধা মিয়ার ছেলে। তিনি চার সন্তানের জনক ছিলেন। ৩ মে (রবিবার) সকালে দেওঘর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য মোছা. নাছিমা আক্তার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আক্তার হোসেন বিকেলে তার জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে গিয়েছিলেন। পানির নিচে নিজের স্বপ্ন ডুবে থাকতে দেখে তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

আরও পড়ুন: পারমাণবিক চুক্তিতে ইরানকে ছাড় দিতে হবে: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।

পারমাণবিক চুক্তিতে ইরানকে ছাড় দিতে হবে: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।

​দেড় লাখ টাকার ঋণের বোঝা ও স্বপ্নভঙ্গ

নিহত কৃষকের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আক্তার হোসেন এ বছর প্রায় ৩ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। চড়া সুদে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি এই আবাদ করেছিলেন। তার আশা ছিল, ধান ঘরে তুলে ঋণ পরিশোধ করবেন এবং সারা বছরের খোরাকি জোগাবেন। কিন্তু টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে কালনি হাওরের পানির স্তর আকস্মিকভাবে বেড়ে যায়। এতে তার জমির সিংহভাগ ধানই পানির নিচে চলে যায়। কিছু ধান তিনি কাটতে পারলেও শ্রমিক ও পরিবহন সংকটের কারণে সেগুলো সময়মতো বাড়িতে আনতে পারেননি। শনিবার বিকেলে যখন তিনি শেষবারের মতো জমিতে গিয়েছিলেন, তখন দেখেন তার অবশিষ্ট স্বপ্নের সবটুকুই পানির নিচে। এই মানসিক আঘাত তিনি আর সহ্য করতে পারেননি।


​পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া

নিহত কৃষকের ভাতিজা তৌহিদ কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, “চাচা অনেক আশা নিয়ে এবারের আবাদ করেছিলেন। দেড় লাখ টাকা ঋণ ছিল তার মাথায়। যখন দেখলেন সব ধান পানির নিচে, তখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জমির আইলে দাঁড়িয়েই তিনি বুকে হাত দিয়ে বসে পড়েন। আমরা উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সন্ধ্যায় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।” আক্তার হোসেনের এমন মৃত্যুতে আলীনগর গ্রামসহ পুরো দেওঘর ইউনিয়নে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের পরিকল্পনায় পুনর্গঠিত হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের বাংলাদেশ: নয়াপল্টনে ফখরুলের হুঙ্কার।

তারেক রহমানের পরিকল্পনায় পুনর্গঠিত হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের বাংলাদেশ: নয়াপল্টনে ফখরুলের হুঙ্কার।


​হাওরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা

অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলার হাওরগুলোতে এখন কেবলই পানির গর্জন আর কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। কালনি নদী ও সংলগ্ন হাওরগুলোর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান এখন পানির নিচে। স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, "আক্তার ভাই একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাওয়া দেখে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। এই ধানই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।"


​কৃষি বিভাগের ভাষ্য ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আজ রবিবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, নতুন করে আরও ২ হাজার হেক্টর জমির ধান প্লাবিত হয়েছে। ফলে মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়।

​অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ সরকার বলেন, "কৃষক আক্তার হোসেনের মৃত্যুর সংবাদটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পরিচয় নিশ্চিত করেছি। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে সরেজমিনে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য পাঠানো হবে। এছাড়া দুর্যোগকালীন বিশেষ অনুদান প্রদানের বিষয়ে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সাথে কথা বলছি।"


​প্রশাসনের কাছে সাহায্যের দাবি

হাওরের সাধারণ কৃষকরা এখন সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা। তারা বলছেন, আক্তার হোসেনের মতো এমন ট্র্যাজেডি যেন আর কারো পরিবারে না ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে এবং নিহত কৃষকের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসনের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।


​উপসংহার

বোরো ধান হাওরের মানুষের কাছে কেবল একটি ফসল নয়, এটি তাদের সারা বছরের জীবন। আক্তার হোসেনের মৃত্যু কেবল একটি মৃত্যু নয়, এটি আমাদের কৃষি ও কৃষকের অসহায়ত্বের এক চরম দলিল। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষে আর কত কৃষককে এমন জীবন দিতে হবে, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অষ্টগ্রামের বাতাসে।

​তথ্যসূত্র: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি অফিস এবং ভুক্তভোগী পরিবার।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন