হয় চুক্তি, না হয় বোমা: ইরানকে ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি

হয় চুক্তি, না হয় বোমা: ইরানকে ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ: 'হয় চুক্তি, না হয় বোমা', ইরানকে ট্রাম্পের চূড়ান্ত আলটিমেটাম

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আবারও চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে যখন কূটনৈতিক আলোচনার কথা শোনা যাচ্ছিল, ঠিক তখনই নতুন করে ঘি ঢাললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং বিশ্ব বাণিজ্য সচল করার লক্ষ্যে তেহরানের সামনে এক কঠোর শর্ত ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের সাফ কথা—হয় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত নতুন চুক্তিতে সই করতে হবে, নতুবা আগের চেয়েও ভয়াবহ বোমাবর্ষণের মুখোমুখি হতে হবে ইরানকে।

​ট্রাম্পের ১৪ দফা ও এক পাতার চুক্তি

​মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' (Axios) বুধবার (৬ মে) এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের কাছে মাত্র এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক পাঠানো হয়েছে। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও এই চুক্তিতে ১৪টি কঠিন দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ১৪ দফার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক প্রভাব খর্ব করা।

​বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এই খসড়া চুক্তিটিকে দুদেশের পক্ষ থেকেই ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছিল। কূটনৈতিক মহলে আশা জেগেছিল যে, হয়তো এবার কয়েক দশকের বৈরিতার অবসান ঘটবে। কিন্তু বুধবার ট্রাম্পের নতুন আক্রমণাত্মক বক্তব্যে সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে।

আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

নেত্রকোনায় মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার


​ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের গর্জন: 'বোমাবর্ষণ হবে তীব্র'

​বুধবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যালে' (Truth Social) দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইরান যদি প্রস্তাবিত চুক্তিটি মেনে নেয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতো তারাও হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। এতে তাদের ওপর থেকে অনেক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

​তবে এর পরেই তিনি যুদ্ধের হুমকি দিয়ে বলেন, যদি তেহরান এই সমঝোতায় আসতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু হবে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এবারের হামলা আগের তুলনায় ‘আরও বেশি মাত্রা এবং ভয়াবহ তীব্র’ হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে দ্বিধা করবেন না তিনি।

​'অপারেশন এপিক ফিউরি' ও ধোঁয়াশা

​ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন, যদি ইরান আলোচিত শর্তগুলো মেনে নিতে রাজি হয়, তবেই কেবল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। এই সামরিক অপারেশনটি মূলত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সাজানো হয়েছে।

​এদিকে, মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সামরিক পর্যায়টি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি বিশ্বনেতাদের মাঝে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ট্রাম্পের এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, যাতে ইরান দ্রুত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

​হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব

​বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হলো এই হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহে এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনার কারণে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ট্রাম্প চাইছেন খুব দ্রুত এই পথটি সচল করতে, যাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা না আসে। কিন্তু তেহরানের দাবি, তাদের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা না সরানো পর্যন্ত তারা পূর্ণ সহযোগিতায় আসবে না।

আরো পড়ুন: বিশ্বকাপ খেলা দেখলে পাবেন ৬১ লাখ টাকা! অবিশ্বাস্য চাকরির সুযোগ 

বিশ্বকাপ খেলা দেখলে পাবেন ৬১ লাখ টাকা! অবিশ্বাস্য চাকরির সুযোগ

​বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

​ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েল, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন ইরানের ওপর মার্কিন চাপের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। যদি ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী আবারও বোমাবর্ষণ শুরু হয়, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ।


ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতি মূলত 'পেশি শক্তি ও কূটনীতি'র এক মিশেল। তিনি একদিকে আলোচনার টেবিল খোলা রাখছেন, অন্যদিকে সামরিক শক্তির ভয় দেখাচ্ছেন। এই ধরণের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কেবল তেলের বাজার নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই সংকট উদ্বেগের। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

​উপসংহার

​ইরান শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ১৪ দফা চুক্তিতে সই করবে, নাকি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী আবারও যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা। শান্তি ও যুদ্ধের মাঝামাঝি এক সরু সুতোয় ঝুলে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। 'দিগন্ত বাংলা নিউজ' এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতির প্রতিটি আপডেট আপনাদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেবে।

​তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস, রয়টার্স এবং ট্রুথ সোশ্যাল।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন