শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: রাজসাক্ষী হতে চান সাবেক ডিআইজি জলিল

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: রাজসাক্ষী হতে চান সাবেক ডিআইজি জলিল

শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড: রাজসাক্ষী হয়ে সত্য প্রকাশের ইচ্ছা সাবেক ডিআইজি জলিল মণ্ডলের

নিজস্ব প্রতিবেদক, দিগন্ত বাংলা নিউজ

​২০১৩ সালের ৫ মে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম এক রক্তক্ষয়ী ও বিতর্কিত অধ্যায়। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের বিশাল সমাবেশকে ঘিরে সেই রাতে যা ঘটেছিল, তা নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে নানা বিতর্ক ও আইনি লড়াই। সেই সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এখন এক নতুন মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মামলার অন্যতম প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডল এবার এই মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

​আজ বুধবার (৬ মে, ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শুনানিকালে জলিল মণ্ডলের আইনজীবী মো. আলী হায়দার আদালতের কাছে এই চাঞ্চল্যকর প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময় আগের সেই রাতের গোপন রহস্য উন্মোচিত হওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

​ট্রাইব্যুনালের শুনানি ও জামিন আবেদন

​বুধবার ট্রাইব্যুনালে ডিআইজি জলিল মণ্ডলের জামিন আবেদনের ওপর দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে তাঁর আইনজীবী আলী হায়দার আসামির শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে মানবিক কারণে জামিন প্রার্থনা করেন। তিনি জানান, জলিল মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত এবং তাঁর হার্টে সাতটি ব্লক রয়েছে। এই অবস্থায় জেলহাজতে তাঁর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে দাবি করা হয়।

​তবে ট্রাইব্যুনাল জামিনের এই কারণটিকে পর্যাপ্ত মনে করেননি। আদালত মন্তব্য করেন যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা আরও জটিল শারীরিক সমস্যা নিয়েও দায়িত্ব পালন করেন, তাই হার্টে ব্লক থাকা জামিন পাওয়ার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল জলিল মণ্ডলের জামিন আবেদনটি খারিজ করে দেন।

আরও পড়ুন : হয় চুক্তি, না হয় বোমা: ইরানকে ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ার

হয় চুক্তি, না হয় বোমা: ইরানকে ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ার

​রাজসাক্ষী হওয়ার প্রস্তাব ও আইনজীবীর বক্তব্য

​জামিন না পেয়ে এক পর্যায়ে আইনজীবী আলী হায়দার আদালতের কাছে তাঁর মক্কেলের পক্ষে এক বড় প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “আমার মক্কেল পাসপোর্ট জমা দিতে প্রস্তুত। তিনি এই মামলার বিচারকাজে আদালতকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে চান এবং প্রয়োজনে রাজসাক্ষী হতেও রাজি আছেন।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালে মামলা হওয়ার পর থেকে জলিল মণ্ডল পালানোর চেষ্টা করেননি বরং নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

​উল্লেখ্য যে, ট্রাইব্যুনাল জলিল মণ্ডলের রাজসাক্ষী হওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত দেননি। তবে শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে আইনজীবী আলী হায়দার পুনরায় নিশ্চিত করেন যে, আদালত অনুমতি দিলে তাঁর মক্কেল এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনাবলী প্রকাশ করতে রাজসাক্ষী হতে আগ্রহী।

​হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা ও প্রসিকিউশনের তথ্য

​২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর মতিঝিল ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সংঘাত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, এখন পর্যন্ত প্রাথমিক তদন্তে ৫৮ জনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। প্রসিকিউশন এই ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

​শাপলা চত্বরের সেই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ এবং নিরপরাধ মানুষদের হত্যার অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার জের ধরে গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়।


আরও পড়ুন: মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে ইরানের মিসাইল হামলা: রণক্ষেত্র হরমুজে

মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে ইরানের মিসাইল হামলা: রণক্ষেত্র হরমুজে


​মামলার হাই-প্রোফাইল আসামিরা

​এই মামলাটি বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আসামিদের তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক (টুকু), এবং আলোচিত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহীদুল হক। এ ছাড়াও মেজ জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।

​আবদুল জলিল মণ্ডল সেই সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার এবং র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে অভিযানের নেপথ্যের পরিকল্পনা এবং নির্দেশদাতাদের সম্পর্কে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবদুল জলিল মণ্ডলের রাজসাক্ষী হওয়ার আগ্রহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার পদ্ধতিতে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। সাধারণত ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী তাকেই বলা হয়, যে নিজে অপরাধের সাথে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে এবং অন্য বড় অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে আদালতকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।

​এর সম্ভাব্য প্রভাব:

১. নির্দেশদাতাদের শনাক্তকরণ: যদি আদালত তাঁকে রাজসাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে শাপলা চত্বরের সেই রাতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শীর্ষ পর্যায় থেকে কী ধরনের নির্দেশ এসেছিল, তা সরাসরি রেকর্ডভুক্ত হবে।

২. বিচারের স্বচ্ছতা: এটি একটি দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ইস্যু। রাজসাক্ষীর তথ্য বিচারের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে পারে।

৩. রাজনৈতিক প্রভাব: যেহেতু সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আসামি, তাই জলিল মণ্ডলের জবানবন্দি পুরো মামলাটিকে শক্তিশালী বা দুর্বল করার ক্ষমতা রাখে।

​উপসংহার

​গত ৩০ মার্চ সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই আব্দুল জলিল মণ্ডল পুলিশি হেফাজতে আছেন। পাবনার বাসিন্দা এই পুলিশ কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বলয়ে ছিলেন। এখন তিনি রাজসাক্ষী হয়ে সেই রাতের ‘অন্ধকার’ অধ্যায় উন্মোচন করবেন কি না, তা নির্ভর করছে ট্রাইব্যুনালের অনুমতির ওপর। 'দিগন্ত বাংলা নিউজ' এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার প্রতিটি খবর পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সত্য উদঘাটিত হোক এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

​তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শুনানি এবং ডিবি সূত্র।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন