মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের মিসাইল হামলা: রণক্ষেত্র হরমুজ

মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের মিসাইল হামলা: রণক্ষেত্র হরমুজ

হরমুজ প্রণালিতে চরম উত্তেজনা: মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দুই পরাশক্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বিশ্ব রাজনীতির অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হরমুজ প্রণালিতে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং সাম্প্রতিক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার (৪ মে) ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করায় এবং সতর্কতা উপেক্ষা করায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে নতুন করে যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

​ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

​ইরানি আধাসরকারি বার্তাসংস্থা 'ফার্স নিউজ'-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানের জাস্ক দ্বীপের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। ইরান আগে থেকেই সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছিল যে, তাদের অনুমতি ব্যতীত বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করলে তার ফল ভালো হবে না। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

​তৎক্ষণাৎ ইরানের জাস্ক উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ফার্স নিউজ দাবি করেছে, হামলার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত তার গতিপথ পরিবর্তন করে এবং এলাকা ত্যাগ করে। তবে এই হামলায় জাহাজটির কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

​যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা দাবি ও অস্বীকার

​ইরানের পক্ষ থেকে হামলার দাবি করা হলেও ওয়াশিংটন থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'এক্ষিওস' (Axios)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধজাহাজে হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং তাদের সব জাহাজ বর্তমানে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। তবে পেন্টাগন থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো দীর্ঘ বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

​প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা ও ইরানের আলটিমেটাম

​এই উত্তেজনার কিছুক্ষণ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেছিলেন, সেখানে যেসব জাহাজ আটকা পড়ে আছে বা যাদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাদের নিরাপত্তা দিয়ে বের করে নিয়ে আসবে মার্কিন নৌবাহিনী।

​ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে জানায়, তাদের জলসীমার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে কেউ যদি প্রবেশ করে, তবে সরাসরি হামলা চালানো হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণা এবং ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত সরাসরি সংঘাতের একটি পূর্বাভাস।

​ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও ইসলামাবাদের ব্যর্থ আলোচনা

​ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতিটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। শান্তি আলোচনার আশা জাগলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র একদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। একই সাথে আরব সাগর থেকে বেশ কিছু ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা ইরানকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

আরও পড়ুন: মরা ছাগলের মাংস বিক্রি: গাজীপুরে ২ যুবকের জেল

মরা ছাগলের মাংস বিক্রি: গাজীপুরে ২ যুবকের জেল


​শান্তি ফেরানোর লক্ষে গত ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চললেও সীমানা নির্ধারণ এবং নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো দেশই তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। ফলে ইসলামাবাদের সেই আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়, যার ফলাফল হিসেবে আজকের এই সামরিক সংঘাতের উপক্রম।

​হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব

​হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এখানে যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হওয়া মানেই বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে আগুন লেগে যাওয়া। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। যদি এই সংঘাত বড় কোনো যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামাতে পারে।

​আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

​ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া। রাশিয়ার পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, চীন বলেছে যে কোনো ধরণের সামরিক সংঘাত এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। তবে ইরান তাদের অবস্থানে অনড় থেকে জানিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, কিন্তু সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পিছু হটবে না।

​বিশ্লেষণ: যুদ্ধের ময়দান না কি মনস্তাত্ত্বিক লড়াই?

​সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই হামলাটি হতে পারে একটি 'ওয়ার্নিং শট' বা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। তারা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব খর্ব করা অসম্ভব। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই মুহূর্তে চাপের মুখে রয়েছে, বিশেষ করে নৌ-অবরোধের কার্যকারিতা প্রমাণ করা তাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার

​হরমুজ প্রণালিতে আজকের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক হয়ে দাঁড়াবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। দুই পরাশক্তির এই রেষারেষিতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ এবং বিশ্ব অর্থনীতি। আমরা আশা করি, বড় কোনো রক্তক্ষয় এড়াতে দুই দেশই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, শান্তির পথ এখন অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ।

তথ্যসূত্র: ফার্স নিউজ, এক্সিওস রিপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

প্রতিবেদক: এমআর-২

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন