গাজীপুরে মরা ছাগলের মাংস বিক্রির দায়ে ২ যুবকের জেল
নিজস্ব প্রতিবেদক, দিগন্ত বাংলা নিউজ
গাজীপুর: মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে এক জঘন্য ও অমানবিক কারসাজির ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরে। মৃত পশুর মাংস বাজারে বিক্রির অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গাজীপুর সদর উপজেলায় মৃত ছাগলের মাংস বিক্রির অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। রবিবার (৩ মে) দুপুরে সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের রুদ্রপুর এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও বিস্তারিত বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রুদ্রপুর এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের একটি পোষা ছাগল ঘাস খাওয়ার সময় পথিমধ্যে একটি কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সাধারণত কোনো পশু অসুস্থ হয়ে বা কামড়ে মারা গেলে সেটি মাটিতে পুঁতে ফেলার নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। মৃত ছাগলটিকে একটি নির্জন জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়।
পরবর্তীতে রুদ্রপুর পশ্চিমপাড়া এলাকার মোবারক ইসলামের ছেলে রাজিব হায়দার (২৩), হাবিবের ছেলে শাওন (১৮) এবং আল আমিন নামের এক কিশোর ঐ মৃত ছাগলটি দেখতে পায়। তারা মানবিকতা ও স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে লাভের আশায় জঙ্গল থেকে মৃত পশুটি উদ্ধার করে। এরপর তারা সুকৌশলে সেটির চামড়া ছাড়িয়ে মাংস ভাগ করে এলাকায় বিক্রির প্রস্তুতি নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল এই মাংস তাজা হিসেবে স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে কিছু টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
জনতার সচেতনতা ও আটক
ঐ যুবকদের মাংস কাটার দৃশ্য এবং তাদের সন্দেহজনক গতিবিধি স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসে। রক্তহীন ও মৃত পশুর মাংসের ধরন দেখে মানুষের মনে প্রবল সন্দেহ তৈরি হয়। গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে ঐ তিনজনকে হাতে-নাতে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা স্বীকার করে যে, ছাগলটি মরা ছিল এবং তারা এটি বিক্রির উদ্দেশ্যেই প্রস্তুত করেছিল।
আরও পড়ুন: শাকিব বুবলীর আমেরিকা মিশন: অপু বিশ্বাসের বিতর্কিত ভূমিকা ?
জনতার তৎপরতায় বড় ধরণের কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির আগেই পুরো বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে এলাকাবাসী ঐ তিনজনকে আটক করে জয়দেবপুর থানা পুলিশে খবর দেন।
পুলিশ ও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই জয়দেবপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল ওহাবের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ অভিযুক্তদের হেফাজতে নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করে।
সংবাদ পেয়ে দ্রুত রুদ্রপুর এলাকায় উপস্থিত হন গাজীপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঈন খান এলিস। তিনি সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহীন মিয়াসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায় ও শাস্তি
আদালতে অভিযুক্তরা তাদের অপরাধ স্বীকার করলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঈন খান এলিস রাজিব হায়দার ও শাওনকে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে আটককৃতদের মধ্যে আল আমিনের বয়স কম হওয়ায় মানবিক কারণে এবং ভবিষ্যতের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযান শেষে জব্দকৃত বিষাক্ত ও দূষিত মাংস জননিরাপত্তার স্বার্থে নিরাপদ স্থানে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছে স্থানীয় জনগণ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহীন মিয়া এই ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "মরা পশুর মাংস খাওয়া মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া পশুর শরীরে জলাতঙ্কসহ নানা ধরণের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ থাকতে পারে। এই মাংস খেলে মানুষ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অসাধু ব্যবসায়ীদের এই ধরণের কাজ কেবল অপরাধই নয়, বরং এটি একটি অমানবিক কর্মকাণ্ড।"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।