জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক পানিসম্পদ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বেইজিংয়ের কারিগরি ছোঁয়া: দেশের নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক ঐকমত্য, বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে চীনা পানিসম্পদ মন্ত্রীর বৈঠক
বাংলাদেশের উত্তর জনপদের জীবনরেখা খ্যাত তিস্তাসহ দেশের প্রধান প্রধান নদীগুলোর আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং পানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে এশিয়ার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তি চীনের সাথে এক অনন্য ঐকমত্যে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ (Teesta Mega Plan) বাস্তবায়নে চীন সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় ‘দিয়াওইউতাই’ (Diaoyutai) অতিথি ভবনে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় সফররত বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়েইং (Li Guoying)-এর মধ্যে এই হাইপ্রোফাইল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানিসম্পদ সুরক্ষা, নদী খনন বা ড্রেজিং প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশ যৌথ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।
## তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিংয়ের কারিগরি সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রী
বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে দেশের অর্থনীতি ও কৃষিতে নদীগুলোর গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক বিরূপ প্রভাব এবং প্রতিবেশীদের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের জটিলতার কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। এই ঝুঁকিগুলো চিরতরে দূর করতে এবং দেশের পরিবেশগত সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে যে ব্যাপক আকারে নদী খনন বা মেগা ড্রেজিং কর্মসূচি (Dredging Campaign) চলমান রয়েছে, তার বিস্তারিত রূপরেখা তিনি চীনা মন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন।
আরও পড়ুন: তিন যুগ পর বিশ্বকাপে কি মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা?
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের বিষয়টি টেবিলে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন:
"তিস্তা নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দূর করতে আমাদের একটি সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশাল ও সংবেদনশীল প্রকল্পটিকে শতভাগ সফল করতে আমরা চীন সরকারের উন্নত ও আধুনিক কারিগরি সহায়তা এবং ড্রাফটিং ডিজাইন টেকনোলজি প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশের সামগ্রিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে চীনের এই অংশগ্রহণ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।"
## বেইজিংয়ের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস: বাংলাদেশকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের বড় প্রস্তাব চীনা মন্ত্রীর
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োচিত ও দূরদর্শী প্রস্তাবের জবাবে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়েইং পানিসম্পদ সুরক্ষায় এবং পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন দূরদর্শী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর ড্রেজিং কার্যক্রমে সর্বাত্মক ও কারিগরি সহযোগিতার এক দৃঢ় ও আনুষ্ঠানিক আশ্বাস প্রদান করেন।
চীনা মন্ত্রী লি গুয়েইং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বৈঠকে বলেন যে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পানিসম্পদ উন্নয়নে একটি বিশেষ কৌশলগত সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরও চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের পানি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী দল বাংলাদেশ সফর করে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সম্পূর্ণ বাস্তবভিত্তিক, প্রামাণ্য এবং আধুনিক গবেষণানির্ভর।
লি গুয়েইং আরও বলেন, বিশাল বিশাল নদী শাসন এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীনের কয়েক দশকের দীর্ঘদিনের সফল ও জাদুকরী অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ভাণ্ডার রয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে খুব সহজেই চীনের এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও অভিজ্ঞতাকে নিজেদের নদী শাসনে কাজে লাগাতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে তিনি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের খাত সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চীনে এসে আধুনিক পানি প্রযুক্তির ওপর উচ্চতর ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান।
## বেইজিংয়ের বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক ও মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদল
দুই দেশের মধ্যকার এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি ও নীতি-নির্ধারণী প্রতিনিধিদল অংশ নেন। বৈঠকে উপস্থিত থেকে প্রকল্পের কারিগরি ও প্রচারণামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করেন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন এবং সরাসরি মাঠ পর্যায়ের ড্রেজিং তদারকির দায়িত্বে থাকা পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
এছাড়াও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক সহায়তার রূপরেখা মেলাতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ফাঁদসমূহ তদারকি করতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। একই সাথে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও যুবশক্তির সংযোগ ঘটাতে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং সামগ্রিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
আরও পড়ুন: চীনের এআই অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত ঝুঁকি: স্কট বেসেন্ট
## একনজরে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই ভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-চীন নদী ব্যবস্থাপনা বৈঠকের সারসংক্ষেপ
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই মেগা নদী ব্যবস্থাপনা ও তিস্তা চুক্তির প্রধান প্রধান সিদ্ধান্তসমূহ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| দ্বিপাক্ষিক এজেন্ডা ও প্রধান খাতসমূহ | সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও কৌশলগত কূটনৈতিক খতিয়ান |
| বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় | তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা। |
| বৈঠকের সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময় | বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় ‘দিয়াওইউতাই’ অতিথি ভবন; ২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)। |
| বৈঠকে অংশ নেওয়া মূল প্রধান ব্যক্তিদ্বয় | বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়েইং। |
| বাংলাদেশের প্রধানতম দাবি ও প্রত্যাশা | বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি ও ড্রাফটিং সহায়তা। |
| চীনের পক্ষ থেকে অফিশিয়াল রেসপন্স | পানি সুরক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস ও দ্বিপাক্ষিক গবেষণার ওপর জোর প্রদান। |
| ঘোষিত বিশেষ বিশেষ সুযোগ | বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের চীনে গিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের অফার। |
| দ্বিপাক্ষিক ঐতিহাসিক চুক্তি | ২০০৫ সালের সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং বিগত বছরের চীনা বিশেষজ্ঞ দলের সফরের ফলোআপ। |
## উত্তর জনপদের ভাগ্য বদলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের কারিগরি সহায়তায় যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশের উত্তর জনপদ তথা রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে। প্রতি বছর তিস্তার ভাঙনে যে হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়, তা রোধ করা সম্ভব হবে। একই সাথে নদী খননের ফলে বর্ষাকালে পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং শুষ্ক মৌসুমে বিশাল জলাধারে ধরে রাখা পানি দিয়ে কৃষিকাজে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। চীনের এই প্রযুক্তির সরাসরি স্থানান্তর (Technology Transfer) বাংলাদেশের পরিবেশগত সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের পানিসম্পদ রক্ষা, আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের সফল কূটনৈতিক মিশন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাঠ পর্যায়ের সর্বশেষ আপডেট এবং সরকারের শীর্ষ মহলের প্রতিটি নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।