সুইজারল্যান্ডের মাটিতে আয়োজিত এই দ্বিপক্ষীয় সংলাপে ইরান তার নির্দিষ্ট কিছু মূলনীতি ও রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে দায়ী করেছে তেহরান।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরান কখনোই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে বসতে ইচ্ছুক ছিল না। কেবল আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের বিশেষ অনুরোধ ও শান্তির স্বার্থে পরোক্ষ আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছিল তারা। কিন্তু আলোচনার মাঝপথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আসা নতুন সামরিক হুমকি পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
গালিবাফ বলেন, “আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রতিনিধি দল এবং সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। আলোচনার টেবিলে বসে এ ধরনের হুমকি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” তিনি সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
আরও পড়ুন: ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জামায়াতের মিছিল থেকে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা
চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ ও ভ্যান্সের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
ইরানি স্পিকার জেডি ভ্যান্সকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ১৪ জুন স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী যেকোনো পক্ষকে সামরিক হুমকি দেওয়া বা বলপ্রয়োগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গালিবাফ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা এখানে সমঝোতার টেবিলে বসে আছি, অথচ আপনাদের প্রেসিডেন্ট আমাদের ওপর নতুন করে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। ইরান কোনো ধরনের চাপ বা হুমকির মুখে নতি স্বীকার করে আলোচনা চালিয়ে যাবে না।”
এই প্রতিবাদের পরপরই ইরানি প্রতিনিধি দল তাৎক্ষণিকভাবে বৈঠক সমাপ্ত ঘোষণা করে সভাকক্ষ ত্যাগ করে। মার্কিন পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পুনরায় জরুরি বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তেহরান তা সরাসরি নাকচ করে দেয়।
মধ্যস্থতাকারীদের দৌড়ঝাঁপ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করলেও ইরান তার বন্ধুরাষ্ট্র কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে। কাতার ও পাকিস্তানের বিশেষ দূতরা ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তাদের আবাসে সাক্ষাৎ করেন।
ইরানি স্পিকার মধ্যস্থতাকারীদের সাফ জানিয়ে দেন, “আমরা কেবল আপনাদের সঙ্গে কথা বলব, তবে আমেরিকানদের সঙ্গে আর কোনো ধরনের সংলাপে বসব না।” পরবর্তীতে কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ ৮০ মিনিটের একটি নিবিড় আলোচনা হয়, যার শেষে একটি যৌথ কূটনৈতিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে।
কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো?
গত রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ একটি পোস্টের মাধ্যমে ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি লেবাননের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইরানকে কড়া বার্তা দেন এবং পুনরায় আঘাত হানার হুমকি দেন।
আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রীর মানহানির মামলা: ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ এর সম্পাদক মেহেদী হাসান গ্রেপ্তার
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন ট্রাম্প ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তিনি ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেন, “ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করে, তবে পৃথিবীর বুকে ইরানের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। এছাড়া ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও তিনি নিজের মুখ সামলে কথা বলার জন্য হুমকি দেন।”
ইসলামাবাদ সমঝোতা ও তার ভবিষ্যৎ
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর গত ১৪ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ১৪ দফার শান্তি সমঝোতায় পৌঁছায়। গত ১৮ জুন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ কার্যকর করা হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল:
- লেবানন যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখা।ইরানের ওপর থেকে আমেরিকার
- আরোপিত দীর্ঘদিনের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা।
কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন হুমকির কারণে এই বিশাল কূটনৈতিক অর্জন এখন হুমকির মুখে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের এ ধরনের আচরণ চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ইরান তার অবস্থানে অটল থেকে জানিয়েছে, সম্মান এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা আর কোনো আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা এই অচলাবস্থা কাটাতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।