বিনোদন ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকাই সিনেমার সোনালী অধ্যায়ের কালজয়ী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা।জীবনের সাফল্যের মূলমন্ত্র আব্বার কাছ থেকেই পাওয়া: বাবা দিবসে স্মৃতিকাতর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা
একটি সন্তানের সুন্দরভাবে পৃথিবীতে বেড়ে ওঠার পেছনে মাতা ও পিতা—দুজনের ভূমিকাই একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। সমাজ ও পরিবারে মায়ের পাশাপাশি একজন বাবাও যে সন্তানের প্রতি কতটা যত্নশীল, দায়িত্ববান এবং বটবৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী হতে পারেন, মূলত সেই শাশ্বত বোধটিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাবা দিবস পালন করা শুরু হয়। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে বিশ্বজুড়ে এই বিশেষ দিবসটি উদযাপন করা হয়। এবারের আন্তর্জাতিক বাবা দিবসে নিজের স্বর্গীয় পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও চিরন্তন স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। নিজের জীবন গঠনে বাবার অবদান এবং শৈশব-কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনগুলোর ডালি মেলে ধরেছেন তিনি।
## ‘আব্বা আমার জীবনজুড়ে জড়িয়ে আছেন, কেবল একটি বিশেষ দিনেই তাঁকে মনে পড়ে না’
নিজের জীবনের সাথে বাবার আত্মিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করতে গিয়ে ববিতা তাঁর একান্ত অনুভূতি ব্যক্ত করে জানান, শুধু বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে ‘বাবা দিবস’ এলেই যে তাঁর আব্বাকে আলাদা করে মনে পড়ে—বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং তাঁর জীবনের প্রতিটি চড়াই-উতরাই, প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতি মুহূর্তের নিঃশ্বাসে জড়িয়ে আছেন তাঁর পরম পূজনীয় আব্বা।
আরও পড়ুন: স্পেন ও উরুগুয়েকে আটকে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব জমাল কেপ ভার্দে
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ববিতা বলেন:
"ফুটবল ও সিনেমার দুনিয়ার সবাই আমাকে বলেন, আমি নাকি আমার আব্বার আদর্শ ও সুশৃঙ্খল জীবনধারা অনুসরণ করেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছি। কিন্তু আমার নিজের কাছে নিজেরই প্রশ্ন জাগে—আমি কি আদৌ আমার গুণী আব্বার সেই মহান আদর্শের শতভাগ নিজের জীবনে প্রতিফলিত করতে পেরেছি? আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমার বিয়ের মাত্র ৪ মাস পরেই আমার আব্বা এ এস এম নিজাম উদ্দিন আতাউব এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেন। মাথার ওপর থেকে হঠাৎ এই বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া সরে যাওয়ায় সে সময় আমি মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। তবে বাবার রেখে যাওয়া শিক্ষা আজও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।"
ববিতা আরও জানান, তাঁদের ভাইবোনদের জীবনকে নিয়মতান্ত্রিক ফ্রেমে বাঁধার পেছনে তাঁর বাবার কঠোর শাসন ও ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। ববিতার আব্বা সব সময় কঠোরভাবে নিয়ম করে দিয়েছিলেন যে, তাঁদের ছয় ভাইবোনকে যেকোনো মূল্যে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অবশ্যই বাসায় ফিরতে হবে। ববিতার বর্তমান জীবনের যে পরিপাটি স্বভাব, ঘর-দুয়ার গুছিয়ে রাখার মানসিকতা এবং নিয়মানুবর্তিতা—তার শতভাগই তিনি তাঁর আব্বার কঠোর শৃঙ্খলা থেকে আয়ত্ত করেছেন।
## পানের আড্ডায় আবদার এবং অভিনয়ের প্রথম হাতেখড়ি
শৈশবের সোনালী দিনগুলোর মধুর স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে কিংবদন্তি এই অভিনেত্রী বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, তাঁর আব্বা যখন সারাদিনের অফিস ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতেন, তখন সমস্ত ভাইবোনদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত।
ববিতা সেই মিষ্টি স্মৃতির বিবরণ দিয়ে বলেন:
"আব্বা অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর আমরা ভাইবোনেরা মিলে বেশ আগ্রহ নিয়ে আব্বাকে সুন্দর করে পান বানিয়ে খাওয়াতাম। আব্বা খুব আয়েস করে সেই পান চিবাতেন। আর ঠিক সেই সুযোগে আমি আব্বার ক্লান্ত পা টিপে দিতে দিতে আমার যত রাজ্যের গোপন আবদার ও বায়না তাঁর কাছে পেশ করতাম। আব্বাও কখনো আমাকে নিরাশ করেননি, পরম মায়ায় আমার সমস্ত আবদার পূরণ করতেন।"
ববিতা আরও এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করে বলেন, তাঁর অভিনয়ে আসার মূল অনুপ্রেরণা লুকিয়ে ছিল তাঁর বাবার গল্পের ঝুলিতেই। তাঁর আব্বা নিজে প্রচুর সিনেমা দেখতেন। সিনেমা দেখে এসে তিনি ববিতাসহ অন্য ভাইবোনদের সেইসব চলচ্চিত্রের গল্প অত্যন্ত চমৎকার অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে শোনাতেন। শুধু গল্প বলাই নয়, গল্পের বিভিন্ন চরিত্রানুযায়ী ববিতাকে অভিনয় করে দেখানোর জন্য উৎসাহিত করতেন। মূলত বাবার সেই পারিবারিক নাটকের মঞ্চ থেকেই ববিতার অবচেতন মনে অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে যখন তিনি বড় পর্দায় পুরোদস্তুর নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখনও তাঁর আব্বা তাঁকে ছায়ার মতো আগলে রেখে প্রতিনিয়ত কাজের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গেছেন।
## সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ এবং বাবার ইংরেজি চিঠির সেই অধ্যায়
ববিতার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রাপ্তি ছিল বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে ‘অনঙ্গবৌ’ চরিত্রে অভিনয় করা। এই কালজয়ী চলচ্চিত্রে তাঁর সুযোগ পাওয়ার পেছনেও পর্দার আড়ালের মূল কাণ্ডারি ছিলেন তাঁর বাবা।
আরও পড়ুন:পরীমণির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক: বাধ্যতামূলক অবসরে সাবেক ডিবি এডিসি সাকলায়েন
চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সেই সোনালী অধ্যায়ের কথা মনে করে ববিতা বলেন, "আমি যখন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় কাজ করার প্রস্তাব পাই, তখন কলকাতার সাথে সমস্ত যোগাযোগ রক্ষা করতেন আমার আব্বা। সত্যজিৎ রায়ের সাথে সিনেমার চিত্রনাট্য, শুটিংয়ের শিডিউলসহ যাবতীয় বিষয়ে আব্বাই নিয়মিত অত্যন্ত নিখুঁত ইংরেজিতে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতেন। পরবর্তীতে যখন শুটিং শুরু হয়, তখন সত্যজিৎ রায়ের মায়াবী ব্যক্তিত্বের সাথে আমার আব্বার অত্যন্ত চমৎকার ও গভীর এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।" ববিতার ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষা শেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। মেয়ের এই আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা তিনি যখন প্রথম শ্রেণিতে পড়েন, তখনই ভালো মানের একটি ইংরেজি ডিকশনারি (অভিধান) উপহার দিয়েছিলেন, যা ববিতার শিক্ষা জীবনের এক অমূল্য সম্পদ।
## বাগেরহাটের সেই অন্ধকার রাত এবং হারিকেন হাতে চতুর বুদ্ধি
শৈশবের আরও একটি মজার ও চতুর ঘটনার কথা উল্লেখ করে ববিতা হাসিমুখে জানান, তখন তাঁরা সবাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাগেরহাটে বসবাস করতেন। একবার পরিবারের সবাই ববিতাকে বাসায় রেখে মামার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ববিতা তো কোনোভাবেই একা থাকবেন না, তাঁরও মামার বাড়ি যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা। তখন আব্বাকে রাজি করানোর জন্য তিনি এক দারুণ বুদ্ধি খাটালেন।
তিনি বলেন:
"সেদিন এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। চারদিক ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। সন্ধ্যাবেলা আব্বা যখন অফিস থেকে ফিরছিলেন, তখন আমি একা একটি হারিকেন জ্বালিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে আব্বাকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য চলে যাই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছোট্ট মেয়েকে হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আব্বা একদিকে যেমন অবাক হন, অন্যদিকে ভীষণ খুশি হন। আব্বা আবেগাপ্লুত হয়ে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন—‘কী চাও মা আমার?’ আমি তখন সুযোগ বুঝে ঝটপট বলে উঠলাম—আমাকে ফেলে যাওয়া যাবে না, আমাকেও আপনাদের সাথে মামার বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। আব্বা হেসে ফেললেন এবং আমার সেই চতুর বুদ্ধির আবদার লুফে নিয়ে আমাকেও সাথে নেওয়ার অনুমতি দিলেন।"
## একনজরে ববিতার স্মৃতিতে বাবা ও তাঁর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পাঠকদের সুবিধার্থে ঢাকাই সিনেমার এই মহাতারকার বাবার স্মৃতিবিজড়িত জীবনের মূল অংশগুলো নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বাবার স্মৃতি ও জীবনের প্রভাবসমূহ | কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতার জবানবন্দি ও বাস্তব খতিয়ান |
| বাবার নাম | এ এস এম নিজাম উদ্দিন আতাউব। |
| জীবনের মূল শিক্ষা | কঠোর সময়ানুবর্তিতা (সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ঘরে ফেরা) ও পরিপাটি থাকা। |
| অভিনয়ের অনুপ্রেরণা | বাবার মুখে সিনেমার গল্প শোনা এবং শৈশবে ঘরে অভিনয়ের চর্চা করা। |
| ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অবদান | নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সাথে ইংরেজিতে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র আদান-প্রদান। |
| শৈশবের স্মরণীয় স্মৃতি | বাগেরহাটে অন্ধকার রাতে হারিকেন হাতে বাবাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প। |
| জীবনের শেষ ইচ্ছা | মৃত্যুর পর বনানী কবরস্থানে যেন বাবার কবরের ওপরেই তাঁকে দাফন করা হয়। |
## মৃত্যুর পর বাবার বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার শেষ ইচ্ছা
স্মৃতিচারণের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ববিতা অত্যন্ত আবেগতাড়িত কণ্ঠে তাঁর জীবনের এক চূড়ান্ত ও শেষ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বাবা তাঁর জীবনের একমাত্র আদর্শ, পথপ্রদর্শক এবং চেতনার বাতিঘর। বাবার প্রতি এই অসীম ভালোবাসা ও আত্মিক টানের কারণে তিনি চান, এই নশ্বর পৃথিবীর কর্মময় জীবন শেষে তিনি যখন চিরদিনের জন্য চোখ বুজবেন, তখন যেন তাঁকে ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাঁর পরম পূজনীয় বাবার কবরের ভেতরেই সমাহিত করা হয়। বাবার বুকেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চান।
ববিতার এই অকপট ও আবেগঘন স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে, সময় বা দূরত্বের ব্যবধানে বাবারা কখনো হারিয়ে যান না, বরং সন্তানের হৃদয়ের মণিকোঠায় সারাজীবন বেঁচে থাকেন এক অদৃশ্য অভিভাবক হয়ে। বিনোদন জগতের এমন প্রতিটি হৃদয়স্পর্শী এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন, তারকাদের অন্দরমহলের না বলা গল্প এবং সমসাময়িক খবরের চুলচেরা বিশ্লেষণ সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।