সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঝালকাঠি প্রতিনিধি: দক্ষিণাঞ্চলের সড়কগুলোতে আবারও এক ভয়াবহ ও সরণাতঙ্ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার পূর্ব রায়পুর বটতলা সংলগ্ন এলাকায় একটি যাত্রীবাহী লোকাল বাস মহাসড়ক থেকে ছিটকে গভীর খাদে পড়ে গেছে। এই আকস্মিক ও মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় বাসে থাকা অন্তত ১০ জন যাত্রী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। একই সাথে দুর্ঘটনার তীব্রতার কারণে উল্টে যাওয়া বাসের নিচে একজন যাত্রী দীর্ঘক্ষণ ধরে অবরুদ্ধ ও অলৌকিকভাবে আটকে রয়েছেন বলে জানা গেছে, যার বর্তমান শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং সংকটাপন্ন।
আরও পড়ুন: সরকারি ব্যানার ও বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ: পরিপত্র জারি
আজ রবিবার (৫ জুলাই) সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ঝালকাঠি-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের নলছিটি অংশের পূর্ব রায়পুর এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।
দুর্ঘটনার কারণ ও ঘটনার বিবরণ
নলছিটি থানা পুলিশ এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাসের বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, আজ সকালে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা থেকে যাত্রী বোঝাই করে 'নাহিদ সুপার পরিবহন' নামের একটি যাত্রীবাহী বাস বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বাসটি যখন নলছিটি উপজেলার পূর্ব রায়পুর বটতলা এলাকা অতিক্রম করছিল, ঠিক তখন বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি দ্রুতগামী বড় বাস ওই বাসটিকে ওভারটেক বা অতিক্রম করার চেষ্টা করে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দুই বাসের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় হুট করেই একটি লোকাল থ্রি-হুইলার (তিন চাকার যান) চলে আসে। থ্রি-হুইলারে থাকা যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে এবং বড় ধরণের মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে নাহিদ সুপার পরিবহনের চালক অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গাড়িটি বাম দিকে ঘুরিয়ে নেন। কিন্তু অতি গতি থাকার কারণে চালক বাসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি। ফলে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল বাসটি সড়ক থেকে ছিটকে রাস্তার পাশের গভীর খাদে ও ডোবার পানির মধ্যে উল্টে পড়ে যায়।
পানির নিচে মানুষের হাত: বাসের নিচে আটকে থাকার আশঙ্কা
দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই আশেপাশের স্থানীয় বাসিন্দা এবং বাজারের ব্যবসায়ীরা উদ্ধার কাজের জন্য দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা বাসের জানালা ও দরজা ভেঙে আহত যাত্রীদের একে একে উদ্ধার করতে শুরু করেন। তবে উদ্ধারকাজের একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে পান। উল্টে যাওয়া বাসটির ভারী বডির নিচে এবং খাদের কাদার পানির মধ্যে একটি মানুষের হাত নড়াচড়া করতে দেখা যায়।
এতে উপস্থিত সবার মনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয় এবং ধারণা করা হচ্ছে যে, অন্তত একজন পুরুষ বা নারী যাত্রী বাসের নিচে মাটির সাথে চাপা পড়ে আটকা পড়েছেন। পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার কারণে তাঁর শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ওই আটকে পড়া হতভাগ্য ব্যক্তির নাম, পরিচয় বা পরিচয়পত্র নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের যৌথ উদ্ধার অভিযান
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই নলছিটি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দক্ষ এবং আধুনিক উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। একই সাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং উদ্ধারকাজে গতি আনতে নলছিটি থানা পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম সেখানে উপস্থিত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা স্থানীয়দের সহায়তায় বাসের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য রেসকিউ টুলস ও ক্রেনের সাহায্যে বাসটি তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: জুলাই আন্দোলন অবমাননার অভিযোগ: শাওন ও মাহিসহ তিন অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় জিডি
দুর্ঘটনার কারণে সড়কে কৌতূহলী জনতার ভিড় জমে যাওয়ায় মহাসড়কে সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হয়, যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করা নলছিটি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ শাহিন হাওলাদার দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
"আমরা খবর পাওয়ামাত্রই ফায়ার সার্ভিসকে সাথে নিয়ে দ্রুত স্পটে চলে আসি। আমাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হলো বাসের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিকে অক্ষত অবস্থায় দ্রুত উদ্ধার করা। আহতদের উদ্ধার করে ইতিমধ্যেই স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হওয়ার পর আমরা হতাহতের সঠিক সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ বিস্তারিতভাবে গণমাধ্যমকে জানাতে পারব।"
দক্ষিণাঞ্চলের সড়কে চালকদের অসচেতনতা ও সংস্কারের দাবি
ঝালকাঠির এই দুর্ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, দেশের আঞ্চলিক সড়কগুলোতে থ্রি-হুইলার এবং বেপরোয়া ওভারটেকিং কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঝালকাঠি-বরিশাল মহাসড়কের এই নির্দিষ্ট অংশটিতে প্রায়শই দূরপাল্লার বাসগুলো প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালায়, যার শিকার হতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। তাছাড়া মহাসড়কে তিন চাকার অবৈধ যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো অবাধে চলছে, যা আজকের দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এলাকাবাসী এই সড়কে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও ওভারটেকিং বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: নলছিটি থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।