একসঙ্গে মরার চুক্তি: প্রেমিক যমুনায় ঝাঁপ দিতেই কেটে পড়লেন প্রেমিকা!

একসঙ্গে মরার চুক্তি: প্রেমিক যমুনায় ঝাঁপ দিতেই কেটে পড়লেন প্রেমিকা!
ছবি: সংগৃহীত
 আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে আবেগ এবং প্রতিশ্রুতি এক সাধারণ বিষয়। তবে সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে চরম এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদাহরণও সমাজে কম নয়। কিন্তু প্রেমের টানে একসঙ্গে জীবন বিসর্জন দেওয়ার এক রোমহর্ষক ও অদ্ভুত চুক্তি করতে গিয়ে যে এমন নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তা হয়তো খোদ ভুক্তভোগী যুবকও কখনো কল্পনা করেননি। একসঙ্গে মরার চূড়ান্ত শপথ নিয়ে নদীর ব্রিজে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেমিক-প্রেমিকা। তবে সময় আসতেই প্রকাশ পেল প্রেমিকার প্রতিশ্রুতির আসল রূপ। প্রেমিক যখন একপ্রকার আবেগতাড়িত হয়ে নদীর উত্তাল স্রোতে ঝাঁপ দিলেন, প্রেমিকা তখন কেবল নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর প্রেমিককে তলিয়ে যেতে দেখেও তিনি নদী ও ব্রিজের মায়া ত্যাগ করে অত্যন্ত শান্তভাবে বাড়ির পথ ধরলেন।

​চমকপ্রদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনাটি ঘটেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ (ইলাহাবাদ) এলাকার বিখ্যাত নিউ যমুনা ব্রিজে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই, ২০২৬) ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পর অলৌকিকভাবে ওই যুবক রক্ষা পেয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সাহসী ডুবুরিদের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে যান ওই প্রেমিক।

​যেভাবে শুরু ও বাস্তবায়িত হয়েছিল আত্মহত্যার চুক্তি

​তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বিবরণ থেকে জানা গেছে, প্রয়াগরাজের বাসিন্দা আনু গুপ্তা নামের ওই যুবকের সাথে স্থানীয় এক তরুণীর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক কিছু জটিলতা তৈরি হওয়ার কারণে তারা এক চরম ও স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাদের এই সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি ছিল ‘একসঙ্গে বাঁচতে না পারলে একসঙ্গে মরে প্রমাণ দেব’। এই রোমান্টিক কিন্তু চরম আত্মঘাতী দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা দুজনই আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

আরও পড়ুন: নিজের বোনকে নিয়মিত ধর্ষণের ঘটনায় হত্যা করা হয় মানিককে

​পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলে তারা প্রয়াগরাজের নিউ যমুনা ব্রিজের ওপর এসে মিলিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ব্রিজের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দুজনে বেশ আবেগঘন ভঙ্গিতে শেষবারের মতো কথা বলছিলেন। চারপাশের পথচারীরা তখনো বুঝতে পারেননি যে, এই সাধারণ কথোপকথনের আড়ালে এক ভয়ংকর ট্র্যাজেডির প্রস্তুতি চলছে। কথার একপর্যায়ে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আনু গুপ্তা কোনো কিছু না ভেবেই ব্রিজের রেলিং টপকে যমুনা নদীর গভীর স্রোত লক্ষ্য করে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

​প্রেমিকার চরম উদাসীনতা ও বাড়ি ফিরে যাওয়া

​এই ঘটনার সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিস্ময়কর অংশটি ঘটে আনু গুপ্তা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক পর পরই। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে পাশে থাকা সঙ্গীর আর্তচিৎকার করা কিংবা বাঁচানোর জন্য সাহায্যের আবেদন করার কথা। কিন্তু যমুনা ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওই তরুণী ছিলেন একেবারেই নির্বিকার।

​প্রেমিক চোখের সামনে অতল জলের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে দেখেও তিনি এক বিন্দু বিচলিত হননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ব্রিজের ওপর একা দাঁড়িয়ে থেকে তিনি কিছুক্ষণ নদীর দিকে চেয়ে দেখলেন। যখন বুঝলেন প্রেমিক নদীতে হাবুডুবু খাচ্ছেন, তখন তিনি নিজের ব্যাগটি গুছিয়ে নিলেন এবং সেখান থেকে অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে হেঁটে ব্রিজের সীমা পার হয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। এই অদ্ভুত আচরণ সেখানে উপস্থিত পথচারী ও সাধারণ মানুষকে তীব্রভাবে হতবাক করে।

​পুলিশ ও স্থানীয় ডুবুরিদের অলৌকিক উদ্ধার অভিযান

​আনু গুপ্তা নামের ওই যুবক যখন তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলেন, তখন ব্রিজের ওপর থাকা অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীরা চিৎকার শুরু করেন এবং স্থানীয় থানায় খবর দেন। খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রয়াগরাজ পুলিশের একটি বিশেষ দল ও ঘাটে থাকা স্থানীয় পেশাদার ডুবুরিদের একটি টিম উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

​নদীর গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতা বেশি থাকায় প্রথম দিকে আনু গুপ্তাকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে ডুবুরিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই যমুনার ঘূর্ণিস্রোতের মধ্য থেকে যুবককে জীবিত অবস্থায় টেনে তুলতে সক্ষম হন তারা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় এবং দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ায় যুবকের শরীরে বড় ধরনের কোনো আঘাত লাগেনি। নদী থেকে তোলার পরপরই তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

​পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও মানসিক কাউন্সেলিং

​উদ্ধার পাওয়ার পর আনু গুপ্তাকে প্রয়াগরাজ পুলিশের হেফাজতে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি পুলিশকে পুরো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন এবং জানান যে, তাঁরা দুজন মিলেই এই আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে প্রেমিকা কেন শেষ মুহূর্তে পিছু হটেছেন এবং তাঁকে ওভাবে ফেলে চলে গেছেন, সে বিষয়ে তিনি নিজেই স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ।

​শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ঘোষণার পর পুলিশ আনু গুপ্তাকে তাঁর পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করে। একই সাথে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন এই কঠিন সময়ে যুবকের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয় এবং পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

​পুলিশের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও তদন্ত

​এই অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার আসল রহস্য এবং নেপথ্যের কারণ উদঘাটনে ইতিমধ্যেই গভীর তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকে উধাও হয়ে যাওয়া সেই প্রেমিকাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন: ৪৫ বছর পর জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তার

​পুলিশের তদন্তের মূল ফোকাস এখন নিচের বিষয়গুলোর ওপর রয়েছে:

​প্ররোচনা মামলা: ওই তরুণী কি আনু গুপ্তাকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন নাকি এটি শুধুই দুজনের যৌথ সিদ্ধান্ত ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

​আইনি ধারার প্রয়োগ: ভারতের দণ্ডবিধি অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা এবং অন্যকে এই কাজে সহায়তা বা উৎসাহিত করা একটি গুরুতর অপরাধ। তদন্তে তরুণীর দোষ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

​তরুণীর জবানবন্দি গ্রহণ: কেন তিনি প্রেমিককে নদীতে ফেলে রেখে নির্দ্বিধায় বাড়ি চলে গেলেন, তা জানতে তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছে পুলিশ।

​সমাজবিজ্ঞান ও তরুণ প্রজন্মের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন

​এই ঘটনাটি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ঠুনকো সম্পর্ক ও চরম আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং আধুনিক জীবনের অস্থিরতার কারণে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সহনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। যেকোনো ব্যর্থতায় তারা জীবনের মূল্য না বুঝে চরম পথ বেছে নিচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

​এই ঘটনার মাধ্যমে এটিও প্রমাণিত হয় যে, আবেগের তীব্রতায় মানুষ অনেক সময় এমন মানুষের ওপর ভরসা করে ফেলে, যে আসলে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সঙ্গ দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। জীবন অত্যন্ত মূল্যবান, কোনো আবেগের মোহে পড়ে জীবনকে এভাবে তুচ্ছ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের পারিবারিকভাবে সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার।

​সংবাদ সূত্র: ভারতীয় গণমাধ্যম ও প্রয়াগরাজ পুলিশ কন্ট্রোল রুম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন