বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে আচমকা আঘাত হেনেছে একটি মিনি টর্নেডো বা জলস্তম্ভ থেকে সৃষ্ট আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়। শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেল পৌনে তিনটার দিকে সৈকতের অন্যতম ব্যস্ততম পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত ‘সুগন্ধা পয়েন্টে’ এই ঘটনা ঘটে। মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের এই আকস্মিক তাণ্ডবে পুরো সুগন্ধা সৈকতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঝড়ের তীব্র গতিতে সৈকতের পর্যটক সেবায় নিয়োজিত কিটকট (কাঠের তৈরি ছাতা ও শোবার চেয়ার) ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক ঘূর্ণিবাতাসের ছোবলে অর্ধশতাধিক ছাতা ও চেয়ার ভেঙে গেছে, বাতাসে উড়ে গেছে হালকা অনেক সামগ্রী। তবে দ্রুত সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ায় কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
জলভাগ থেকে স্থলভাগে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিবাতাস
প্রত্যক্ষদর্শী ও সৈকতে দায়িত্বরত কর্মীরা জানান, দুপুরের পর থেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিকেল পৌনে তিনটার দিকে হঠাৎ সাগরের বুক থেকে একটি বিশাল আকারের ঘূর্ণিবাতাস বা টর্নেডো তৈরি হতে দেখা যায়। ঘূর্ণায়মান এই বাতাসটি অতি দ্রুত সমুদ্রের পানি ছুঁয়ে বালুচরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বালুচরে এসে পৌঁছানো মাত্রই এটি প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে।
আরও পড়ুন: একসঙ্গে মরার চুক্তি: প্রেমিক যমুনায় ঝাঁপ দিতেই কেটে পড়লেন প্রেমিকা!
বালুচরে আঘাত হানার পর বাতাসের তীব্র গতিতে সৈকতের বালি চারদিকে উড়তে শুরু করে। পুরো এলাকা ধূলিময় হয়ে ওঠে এবং মানুষের চোখের দৃষ্টি সীমানা সাময়িকভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের স্থায়িত্বে এটি সৈকতের একটি নির্দিষ্ট অংশকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
আতঙ্কে পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান
টর্নেডো যখন সুগন্ধা পয়েন্টে আছড়ে পড়ে, তখন সেখানে হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক উপস্থিত ছিলেন। সাগরের মৃদু ঢেউ উপভোগ করার মুহূর্তে হঠাৎ এমন বিকট শব্দ ও ঘূর্ণিবাতাস দেখে পর্যটকদের মাঝে তীব্র ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সৈকতে থাকা সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুরা চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে সৈকতের পাশের মার্কেট এবং পাকা স্থাপনাগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেন। পুরো সৈকত জুড়ে মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
কক্সবাজার কিটকট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ঘটনার পরপরই ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সংগ্রহ করা হয়েছে। সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রলয়ংকরী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
বিধ্বস্ত কাঠের চেয়ার (কিটকট): সর্বমোট ৫২টি কাঠের বসার চেয়ার বা কিটকট ভেঙে পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।
বিধ্বস্ত ছাতা: রোদের হাত থেকে পর্যটকদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত ৬১টি বড় ছাতা বাতাসের তীব্র বেগে ভেঙে উড়ে গেছে।
হালকা সামগ্রী: এছাড়া হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন হালকা সামগ্রী, খেলনা এবং পর্যটকদের চশমা বা স্যান্ডেল ঝড়ের তোড়ে হারিয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এমনিতেই পর্যটন মৌসুমে এই চেয়ার-ছাতাগুলোর ওপর ভিত্তি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। হঠাৎ এমন দুর্যোগে তাদের যে আর্থিক ক্ষতি হলো, তা কাটিয়ে উঠতে বেশ বেগ পেতে হবে।
আরও পড়ুন: ফুটবল বিশ্বকাপের মহোৎসব: ফাইনালের মহারণে মুখামুখি স্পেন ও আর্জেন্টিনা
টর্নেডোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
আবহাওয়াবিদদের মতে, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে স্থলভাগ ও জলভাগের তাপমাত্রার আকস্মিক তারতম্যের কারণে এমন মিনি টর্নেডো বা 'ওয়াটার স্পাউট' (Water Spout) সৃষ্টি হতে পারে। সমুদ্রের গরম বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে গেলে এবং চারপাশের ঠান্ডা বাতাস সেখানে ঘূর্ণাকারে ছুটে আসলে এই ধরনের ঘূর্ণিবাতাসের সৃষ্টি হয়। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলভাগে প্রায়শই এমন জলস্তম্ভ বা ছোট টর্নেডো তৈরি হলেও সেগুলো সাধারণত উপকূলে পৌঁছানোর আগেই সাগরে মিলিয়ে যায়। তবে এবারের টর্নেডোটি সরাসরি সুগন্ধা পয়েন্টের স্থলভাগে আঘাত করায় তা মানুষের নজরে এসেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।
প্রশাসনের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার পরপরই সৈকতে নিয়োজিত ট্যুরিস্ট পুলিশ, লাইফ গার্ড এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের বিচ কর্মীরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। আতঙ্কিত পর্যটকদের শান্ত করতে এবং সমুদ্রের পানিতে নেমে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে লাইফ গার্ড কর্মীরা মাইকিং করেন।
ঝড় থেমে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর পরিস্থিতি পুনরায় স্বাভাবিক হতে শুরু করে। আতঙ্ক কেটে গেলে বিকেলের দিকে পর্যটকেরা আবারও সৈকতে নামতে শুরু করেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৈকতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংবাদ সূত্র: স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।