ওয়াশিংটনকে তেহরানের চরম হুঁশিয়ারি: এবার হামলা হলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাবে, ট্রাম্পের 'অপারেশন এপিক ফিউরি' ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক (দিগন্ত বাংলা নিউজ):
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈরী দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এবার এক অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক দিকে মোড় নিয়েছে। ওয়াশিংটন যদি তেহরানের ওপর নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন বা হামলা চালায়, তবে এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা বিশ্বের আরও দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হবে—এমনটাই সরাসরি হুমকি দিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে ছিলেন বলে প্রকাশ করার পর বুধবার (২০ মে) তেহরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর ও নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি আসে।
আমাদের বিশেষ নিউজ পোর্টাল 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'-এর আন্তর্জাতিক ডেস্কে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ স্থগিত করে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইতিমধ্যে ৬ সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। তবে এই দীর্ঘ সময়েও যুদ্ধ অবসানের মূল আলোচনাটি বর্তমানে অনেকাংশে স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অচলাবস্থার মাঝেই ওয়াশিংটনকে দেওয়া তেহরানের এই হুমকি পুরো বিশ্বকে এক গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এক ঘণ্টার দূরত্বে ট্রাম্পের হামলা পরিকল্পনা ও স্থগিতের নেপথ্য
চলতি সপ্তাহের শুরুতেই মার্কিন রাজনৈতিক মহলে এক বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয়, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে তিনি ইরানের ওপর পুনরায় বিমান হামলা বা ভয়াবহ বোমা বর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কূটনীতি এবং আলোচনার টেবিলকে আরেকটু সময় দেওয়ার জন্য তিনি এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করেন।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত বিস্ফোরক এক তথ্য দেন। তিনি বলেন, ‘‘আজ ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত বা কাউন্টডাউন থেকে আমি মাত্র এক ঘণ্টা দূরে ছিলাম।’’ ট্রাম্পের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্য যেকোনো মুহূর্তে একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের আগুনে জ্বলে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার বুকে সাহস থাকলে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করুক: সমাজকল্যাণমন্ত্রী
আইআরজিসি-র নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি ও লক্ষ্যবস্তু সম্প্রসারণের ইঙ্গিত
নতুন করে কোনো হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন মিত্র যেসব দেশ রয়েছে, তাদের ওপর পাল্টা ভয়াবহ আঘাত হানার হুমকি ইরান আগেই দিয়ে রেখেছিল। তবে বুধবার তেহরানের দেওয়া ইঙ্গিতে স্পষ্ট যে, এবার তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আরও দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
বিপ্লবী গার্ড কোরের (IRGC) আনুষ্ঠানিক বিবৃতি
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ বিবৃতিতে দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছে, ‘‘ইরানের পবিত্র ভৌগোলিক সীমানা বা সার্বভৌমত্বের ওপর যদি আবারও কোনো প্রকার মার্কিন বা আন্তর্জাতিক আগ্রাসন চালানো হয়, তাহলে এবার প্রতিশ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধ কেবল এই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে।’’ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ হলো ইরান এবার আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন স্বার্থ এবং হয়তো সরাসরি পশ্চিমা মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে।
ইরানের নতুন প্রস্তাব ও ট্রাম্পের পূর্ব-প্রত্যাখ্যাত শর্তাবলী
দিগন্ত বাংলা নিউজ জানতে পেরেছে যে, চলতি সপ্তাহেই কূটনৈতিক পন্থায় সংকট সমাধানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রস্তাব জমা দিয়েছে ইরান। তবে এই নতুন প্রস্তাবের যেসব বিবরণ ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা গেছে ইরান তাদের আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে যেসব শর্তকে ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল, নতুন প্রস্তাবে মূলত সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। ইরানের দেওয়া প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার কৌশলগত 'হরমুজ প্রণালি'-র ওপর সম্পূর্ণ একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
পূর্ববর্তী সংঘাত ও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায়।
ইরানের ওপর থাকা সমস্ত আন্তর্জাতিক ও মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চিরতরে প্রত্যাহার।
বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে জব্দ করে রাখা ইরানের বিলিয়ন ডলারের তহবিল নিঃশর্তে ছাড় করা।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে সমস্ত মার্কিন সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও পর্দার আড়ালের কূটনীতি
বর্তমান এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক আলোচনার শেষ সুতোটুকু টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে তেহরানে পৌঁছেছেন। গত মাসে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে অনুষ্ঠিত একমাত্র দফার শান্তি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ ছিল পাকিস্তান। বর্তমানে ইসলামাবাদের মাধ্যমেই ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে অতি গোপনীয় বার্তা আদান-প্রদান চলছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও তেলের বাজারের অস্থিরতা
আগামী নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেস নির্বাচন (Midterm Elections) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশ কোণঠাসা ও চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফলে যুদ্ধ থামানোর জন্য এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নিজস্ব দলের ভেতর থেকেই এক বিশাল চাপ তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের জনসমক্ষে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য প্রতিনিয়ত রঙ বদলাচ্ছে। কখনো তিনি নতুন করে ভয়াবহ বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই দাবি করছেন যে শান্তি চুক্তি একদম হাতের নাগালে রয়েছে। তবে মঙ্গলবার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসার কথা বললেও, ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন যে আলোচনা বেশ ভালোভাবেই চলছে এবং খুব দ্রুতই এর একটি স্থায়ী সমাধান হবে। গত মাসে শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেছেন, "আমরা এখন আলোচনার টেবিলে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছি।"
বিশ্ব অর্থনীতি ও ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ওঠানামা
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখন প্রতি ঘণ্টায় এবং প্রতিদিন অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। যদিও সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে প্রতি সপ্তাহে তেলের দাম বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের (Brent Crude) এক মাসের ফিউচার মূল্য প্রায় ২.৭৫ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০৮ ডলারে নেমে আসে। ফুজিৎমি সিকিউরিটিজের প্রখ্যাত বাজার বিশ্লেষক তোশিতাকা তাজাওয়া এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, "প্রতিদিনই ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান এবং বক্তব্য পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা এখন অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, দুই পক্ষ আসলেই কোনো অভিন্ন সমঝোতায় পৌঁছাতে এবং একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি করতে সক্ষম হয় কি না।"
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী যুদ্ধংদেহী অবস্থান পুরো বিশ্বকে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের এই লড়াই যদি শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যিই যুদ্ধের দিকে গড়ায়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার জন্য এক অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি শেষ পর্যন্ত কোনো আলো দেখাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই মেগা সংকটের প্রতি মুহূর্তের লাইভ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'-এর পাতায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।