বিদায়ঘণ্টা বাজছে নেতানিয়াহুর: ইসরাইলের সংসদ বিলুপ্তির বিল পাস,

বিদায়ঘণ্টা বাজছে নেতানিয়াহুর: ইসরাইলের সংসদ বিলুপ্তির বিল পাস,

ইসরাইলের পার্লামেন্টে ভূমিকম্প: নেসেট বিলুপ্তির প্রাথমিক বিল পাস, ক্ষমতা হারানোর চূড়ান্ত শঙ্কায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক (দিগন্ত বাংলা নিউজ):

 মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক পরাশক্তি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ঝড় উঠেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী জোট সরকারের অবসান ঘটিয়ে পার্লামেন্ট বা নেসেট (Knesset) বিলুপ্ত করা সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক বিল বিপুল ভোটে পাস হয়েছে। বুধবার (২০ মে) ইসরাইলি পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে ক্ষমতাসীন জোট এবং বিরোধী দল—উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারাই অভূতপূর্ব একাত্মতা প্রদর্শন করেছেন। এই বিল পাসের মাধ্যমে দেশটিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই একটি সাধারণ বা আগাম নির্বাচন (Snap Election) অনুষ্ঠানের পথ পুরোপুরি প্রশস্ত হলো। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি দীর্ঘ সময় ধরে ইসরাইলের ক্ষমতায় থাকা বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের "বিদায়ঘণ্টা" হিসেবে কাজ করতে পারে।

​আমাদের বিশেষ নিউজ পোর্টাল 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'-এর আন্তর্জাতিক ডেস্কের নিয়মিত অনুসদ্ধানে দেখা গেছে, এই বিলটি পাসের সময় খোদ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু পার্লামেন্টে উপস্থিত ছিলেন না। অতি সংবেদনশীল এবং জরুরি একটি নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকের অজুহাতে তিনি এই ঐতিহাসিক ভোটাভুটি এড়িয়ে যান। তবে তার অনুপস্থিতিতেই নেসেটের ভেতরে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এক প্রকার সিলগালা হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

​নেসেটে অভূতপূর্ব ভোটাভুটি ও স্পিকারের ঘোষণা

​বুধবার বিকেলে ইসরাইলের ১২০ আসন বিশিষ্ট পার্লামেন্ট নেসেটে বিলটি উত্থাপন করা হলে তা বিপুল জনসমর্থন পায়। নেসেটের স্পিকার আমির ওহানা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করে জানান, পার্লামেন্ট বিলুপ্তির প্রাথমিক বিলটির পক্ষে রেকর্ড সংখ্যক ১১০ জন আইনপ্রণেতা (MKs) ভোট দিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিলের বিপক্ষে বা এর বিরোধিতা করে কোনো একটি ভোটও পড়েনি।

​ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে শাসক জোটের নিজেদের আনা কোনো বিলুপ্তি বিলের পক্ষে এভাবে সর্বসম্মত ভোট পড়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ইসরাইলি জোট সরকারের কোয়ালিশন হুইপ ওফির কাটজ ভোটাভুটির আগে এক আবেগঘন বক্তৃতায় স্বীকার করেন, "এই জোটের দিন শেষ হয়ে এসেছে।" এই বিল পাসের সাথে সাথেই বিরোধী শিবিরের বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতারা উল্লাসে মেতে ওঠেন এবং একে "ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সরকারের শেষের শুরু" বলে অভিহিত করেন।

আরও পড়ুন:এবার হামলা হলে যুদ্ধ আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাবে: ইরান

এবার হামলা হলে যুদ্ধ আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাবে: ইরান

​কেন এই আকস্মিক বিলুপ্তি? সংকটের মূলে 'হারেদি' বিতর্ক

​দিগন্ত বাংলা নিউজ-এর বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নেতানিয়াহুর এই আকস্মিক পতনের পেছনে বহিরাগত কোনো চাপ ছিল না, বরং তার ঘরের শত্রুরাই এই সংকটের মূল কারণ। ঐতিহাসিক ও ঐতিহাসিকভাবে লিকুদ পার্টির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পরিচিত কট্টরপন্থী আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলো (বিশেষ করে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম) গত সপ্তাহে নেতানিয়াহুর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।

​সংকটের মূল কারণ হলো ইসরাইলি সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন (Military Conscription)। ইসরাইলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য সামরিক পরিষেবা বাধ্যতামূলক হলেও কট্টরপন্থী ইহুদি বা 'হারেদি' (Haredi) সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের (ইয়েশিভা স্টুডেন্ট) এই আইন থেকে দশক ধরে ছাড় দেওয়া হতো। নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি এই ছাড়ের আইনটি বহাল রাখবেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের চাপ এবং বর্তমান যুদ্ধের কারণে কোয়ালিশন সরকার সেই ছাড়ের আইন পাস করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে কট্টরপন্থী শরিক দলগুলোই সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে এই বিলুপ্তি বিল জমা দেয় এবং পাস করায়।

​দিগন্ত বাংলা নিউজ-এর বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

​বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকেই দেশের ভেতরে ও বাইরে তার জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, গাজা ও লেবানন ফ্রন্টের জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইসরাইলি জনগণের একটি বিশাল অংশ তার পদত্যাগের দাবিতে মাসের পর মাস ধরে রাজপথে বিক্ষোভ করছে।

​আগাম নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ও আইনি প্রক্রিয়া

​যদিও এই প্রাথমিক বিলটি ১১০-০ ভোটে পাস হয়েছে, তবে এটি সরাসরি আইনে পরিণত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। ইসরাইলি সংবিধান অনুযায়ী, এই বিলটি এখন নেসেটের হাউস কমিটিতে (House Committee) পাঠানো হবে। সেখানে অধিকতর পর্যালোচনা এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে সব দলের মধ্যে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা হবে। এরপর বিলটিকে চূড়ান্ত আইন হিসেবে পাস করতে আরও তিনটি পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় রিডিংয়ের (Three Readings) মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

​আইন অনুযায়ী, বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার পর অন্তত ৯০ দিন বা তিন মাস সময় দিতে হবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। ইসরাইলের বর্তমান সংবিধান অনুসারে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল চলতি ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর। কিন্তু এই বিলের কারণে নির্বাচন কয়েক সপ্তাহ বা মাস এগিয়ে আসতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, কট্টরপন্থী দলগুলো আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে নির্বাচন চাইছে। তবে ঐকমত্য না হলে তা সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে। কোনো অবস্থাতেই আগস্ট মাসে নির্বাচন সম্ভব নয়, কারণ আইনি ৯০ দিনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

​জরিপে বড় হারের পূর্বাভাস ও নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ

​ইসরাইলের স্থানীয় হিব্রু সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, এই মুহূর্তে যদি ইসরাইলে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার দল লিকুদ পার্টি (Likud Party) শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে। এমনকি তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আসন সংখ্যাও (৬১টি আসন) লাভ করতে পারবে না।

​এর বাইরেও ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু বর্তমানে একাধিক ব্যক্তিগত ও আইনি সংকটে জর্জরিত। তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে চলা দুর্নীতির মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন। ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পর্দার আড়ালে একটি 'প্লে ডিল' বা সমঝোতার চেষ্টা করছেন, যার শর্ত অনুযায়ী নেতানিয়াহুকে রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে অবসর নিতে হতে পারে। পাশাপাশি, সম্প্রতি তিনি প্রোস্টেট ক্যান্সারের সফল চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ২০২৩ সালে তার শরীরে পেসমেকার বসানো হয়েছে। সব মিলিয়ে শারীরিক ও রাজনৈতিক—উভয় দিক থেকেই নেতানিয়াহু এখন চরম দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় রয়েছেন।

​উপসংহার

​পরিশেষে বলা যায়, নেসেট বিলুপ্তির এই সিদ্ধান্ত কেবল ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাবে না, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। কট্টরপন্থী সরকারের পতনের পর যদি কোনো মধ্যপন্থী বা উদারপন্থী দল ইসরাইলের ক্ষমতায় আসে, তবে গাজা ও লেবাননের যুদ্ধবিরতি চুক্তি আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তবে নতুন নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন, যা তাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার শেষ কিছু চাল চালার সুযোগ দেবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই মেগা পলিটিক্যাল ক্রাইসিসের প্রতিটি ব্রেকিং খবরের লাইভ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন