সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত এক বছরেই বাড়ল ৪১ শতাংশ: জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২,৭৬৩ কোটি টাকা, এটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ডের মাইলফলক
জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থ সুরক্ষাগার ও ব্যাংকিং হাব সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক এবং দেশের বিভিন্ন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের জমা রাখা মোট অর্থের পরিমাণ বা সামগ্রিক আমানতে এক বিশাল বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত আগের বছরের (২০২৪ সাল) তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (SNB) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশ্ব অর্থনীতির নানামুখী টানাপোড়েনের মধ্যেও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আমানত হিসেবে জমা হওয়া দেশের আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মাঝে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনটির তথ্য ও পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালের পরবর্তী সময়গুলোতে বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়ে ২০২৫ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের চূড়ান্ত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ (CHF)। সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় মুদ্রা সুইস ফ্রাঁকে যদি বর্তমান দেশীয় মুদ্রা বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করা হয়, তবে এই আমানতের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটিই হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট বছর শেষে বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ আমানত। এর আগে, আজ থেকে কয়েক বছর পূর্বে অর্থাৎ ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল, যার পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ। সেই ঐতিহাসিক রেকর্ডের পর এবারই প্রথম আমানতের পরিমাণ আবার এত বড় অঙ্কে পৌঁছাল।
আমানত বৃদ্ধির মূল উৎস: একক গ্রাহক নয়, বরং বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর বিশাল উল্লম্ফন
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের মূল ডাটা বা পরিসংখ্যানের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, সুইস ব্যাংকে টাকা বাড়া মানেই হচ্ছে কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন কালো টাকা বা ব্যক্তিবিশেষের গোপন আমানত বৃদ্ধি পাওয়া। তবে এবারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। সুইস ব্যাংকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির পেছনে মূল কারিগর বা মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশের দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জমা রাখা বৈদেশিক মুদ্রার এক বিশাল ও অভূতপূর্ব উল্লম্ফন।
আরও পড়ুন: কোলের সন্তান নিয়ে প্রেমিকের দরজায় অনশনে প্রবাসীর স্ত্রী, শিবগঞ্জে চাঞ্চল্য
প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি বিভিন্ন তফসিলী ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট জমার পরিমাণ যেখানে ছিল মাত্র ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ সুইস ফ্রাঁ, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২৫ সাল শেষে তা ৪৩ শতাংশের মতো বিশাল প্রবৃদ্ধি নিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটি ২৭ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। গাণিতিক ও শতাংশের হিসাব কষলে দেখা যায়, বর্তমানে সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশের মোট জমার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থই ধারণ করে রেখেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালন, আমদানি-রপ্তানি বিল নিষ্পত্তি এবং বৈদেশিক লেনদেনের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সুইজারল্যান্ডের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ জমা রেখেছে।
কমেছে ব্যক্তিমালিকানাধীন একক গ্রাহকদের আমানত: অফিশিয়াল রিপোর্টের সীমাবদ্ধতা
ব্যাংকগুলোর আমানতে যখন এই বিশাল জোয়ার দেখা গেছে, ঠিক তখনই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তিমালিকানাধীন বা একক গ্রাহকদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি একক ব্যক্তিপর্যায়ের গ্রাহকদের জমার পরিমাণ যেখানে ছিল ১ কোটি ২৬ লাখ সুইস ফ্রাঁ, সেখানে ২০২৫ সালের হিসাব সমাপনীতে তা প্রায় ১০ শতাংশের মতো কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। ব্যক্তিপর্যায়ের এই আমানত কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কড়াকড়ি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর কঠোর তদারকি ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
একটি অত্যন্ত জরুরি ও বিশেষ নোট: সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের এই বার্ষিক প্রতিবেদনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাব বা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়, তা মূলত সম্পূর্ণ বৈধ, অফিশিয়াল এবং প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, আইনি উপায়ে যেসব ব্যাংক ও ব্যক্তি নিজেদের হিসাবের বিবরণী সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করেছে, কেবল তাদের তথ্যই এখানে অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও বাংলাদেশে বহুল আলোচিত-সমালোচিত যে "কালো টাকা" বা অবৈধ উপায়ে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ, তার প্রকৃত পরিমাণ কত বা কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে সুইস ব্যাংকে গোপনে জমা হয়েছে, তা এই অফিশিয়াল বার্ষিক রিপোর্ট থেকে কোনোভাবেই জানার বা পরিমাপ করার সুযোগ নেই। গোপন ও বেনামী অ্যাকাউন্ট বা অফশোর শেল কোম্পানির আড়ালে থাকা পাচারকৃত অর্থের হিসাব এই আইনি পরিসংখ্যানের সম্পূর্ণ বাইরে থেকে যায়।
বৈশ্বিক স্বচ্ছতা কাঠামো: অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (AEOI) ও সুইজারল্যান্ড
বিশ্বজুড়ে কর ফাঁকি দেওয়া, অবৈধ আর্থিক লেনদেন পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার সফলভাবে রোধ করার লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ড সরকার তার দীর্ঘদিনের কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তার নীতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (AEOI) বা "স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় প্রথা"। এটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক, যার মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো তাদের বিদেশী গ্রাহকদের যাবতীয় সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য গোপন না রেখে সরাসরি সেই গ্রাহকের নিজ দেশের সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকে।
এই অত্যন্ত কার্যকর ও আধুনিক ব্যবস্থার আওতায় একজন আন্তর্জাতিক গ্রাহকের নিম্নোক্ত তথ্যসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময় করা হয়:
গ্রাহকের পূর্ণ নাম এবং স্থায়ী ঠিকানা।
গ্রাহকের নিজ দেশের কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN)।
গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে থাকা বার্ষিক মোট ব্যালেন্স বা আমানতের পরিমাণ।
সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে বছরজুড়ে সম্পাদিত আর্থিক লেনদেনের সারসংক্ষেপ।
সুইস ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FTA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল জুড়ে সুইজারল্যান্ড সরকার বিশ্বের মোট ১০১টি দেশের সাথে প্রায় ৩৪ লাখ স্বতন্ত্র আর্থিক অ্যাকাউন্টের তথ্য অত্যন্ত সফলভাবে ও স্বয়ংক্রিয় উপায়ে বিনিময় করেছে। এর ফলে বিশ্বের বহু দেশ তাদের নাগরিকদের কর ফাঁকি দিয়ে সুইস ব্যাংকে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পেয়েছে এবং বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ কেন এখনো পিছিয়ে? ওআইসিডি গ্লোবাল ফোরামের মে ২০২৬-এর চাঞ্চল্যকর আপডেট
সুইজারল্যান্ড বিশ্বব্যাপী ১০১টি দেশের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য বিনিময় করলেও, এই তালিকায় এখনো বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা OECD (ওআইসিডি) গ্লোবাল ফোরাম অন ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন ফর ট্যাক্স পারপাসেস-এর ২০编制 সালের মে মাসের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক আপডেট এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (AEOI) চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর বা দ্বিপাক্ষিক সম্মতি প্রদান করেনি।
আরও পড়ুন: ঢাকার ট্রাফিক জট নিরসনে নতুন এআই প্রযুক্তি: বসছে আধুনিক ক্যামেরা
এই চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার কারণে, বাংলাদেশ সরকার বা দেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আইনি উপায়ে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সরাসরি কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের বাৎসরিক ব্যালেন্স কিংবা লেনদেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পায় না। যদি বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করত, তবে খুব সহজেই সুইস ব্যাংকে গোপনে টাকা রাখা কর ফাঁকিদাতাদের সনাতন তালিকা ও তাদের অর্থের উৎস বের করা সম্ভব হতো। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাগিদ দিয়ে আসলেও আমলাতান্ত্রিক ও নীতিগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এতে কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চিত্র: দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ
সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ ও সম্পদ জমা রাখার সামগ্রিক প্রবণতার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত শক্তিশালী, যা এই অঞ্চলজুড়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত।
নিচে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ২০২৫ সাল শেষের সুইস ব্যাংক আমানতের পরিস্থিতি এবং প্রবৃদ্ধির একটি তুলনামূলক বিবরণী টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| দেশের নাম | ২০২৫ সাল শেষে মোট আমানতের পরিমাণ | আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার (%) | আঞ্চলিক অবস্থান |
| ভারত | প্রায় ৩২০ কোটি সুইস ফ্রাঁ (CHF) | ৮% হ্রাস (কমেছে) | প্রথম (শীর্ষ স্থান) |
| বাংলাদেশ | ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ (CHF) | ৪১% বৃদ্ধি (উল্লম্ফন) | দ্বিতীয় স্থান |
| আফগানিস্তান | নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত বৃদ্ধি | ৪৮.২% বৃদ্ধি (সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি) | প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে |
| শ্রীলঙ্কা | আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে | পজিটিভ প্রবৃদ্ধি | ঊর্ধ্বমুখী |
| মালদ্বীপ | আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে | পজিটিভ প্রবৃদ্ধি | ঊর্ধ্বমুখী |
| পাকিস্তান | সামগ্রিক আমানত হ্রাস পেয়েছে | নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি | নিম্নমুখী |
| নেপাল | সামগ্রিক আমানত হ্রাস পেয়েছে | নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি | নিম্নমুখী |
| ভুটান | সামগ্রিক আমানত হ্রাস পেয়েছে | নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি | নিম্নমুখী |
দক্ষিণ এশিয়ার এই পরিসংখ্যানটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অঞ্চলে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর সুইস আমানত আগের বছরের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দেশগুলোর জমার পরিমাণ ২০২৫ সালে বেশ ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই অঞ্চলের মধ্যে শতাংশের বিচারে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি বা ওলটপালট রেকর্ড করেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান, যাদের আমানত বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। এর ঠিক পরপরই ৪১ শতাংশের বিশাল প্রবৃদ্ধি নিয়ে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।
এই বিপুল আমানত বৃদ্ধির সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব ও ব্যাংকিং বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কর্তৃক সুইস ব্যাংকে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ফ্রাঁ বা ডলারে রূপান্তর করে জমা রাখার এই ঘটনাকে অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন। সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomics) নিয়মানুযায়ী, দেশীয় ব্যাংকগুলো যখন আন্তর্জাতিক কোনো ব্যাংকে (যা সাধারণত নোস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বা করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং নামে পরিচিত) অর্থ জমা রাখে, তখন তা মূলত দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের তারল্য ও সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
১. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা ও এলসি নিষ্পত্তি:
বাংলাদেশের আমদানিকারকরা যখন বিদেশ থেকে পণ্য (যেমন জ্বালানি তেল, সার, শিল্পকারখানার কাঁচামাল) আমদানি করেন, তখন সেই আমদানির ঋণপত্র বা এলসি (LC) এর বিল পরিশোধ করার জন্য দেশীয় ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সাহায্য নিতে হয়। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জমার পরিমাণ ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর হাতে এখন পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বা বাফার রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আমদানির জন্য একটি স্বস্তিদায়ক খবর।
২. ব্যক্তিপর্যায়ের আমানত হ্রাসের মনস্তত্ত্ব:
ব্যক্তিপর্যায়ে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অফিশিয়াল আমানত ১০ শতাংশ কমে যাওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, বৈধ পথে আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ গচ্ছিত রাখার চেয়ে ব্যক্তিরা হয়তো অন্য কোনো দেশে (যেমন দুবাই, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া) প্রোপার্টি বা সেকেন্ড হোমে বিনিয়োগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। অথবা সুইজারল্যান্ডের কড়া আইনি নজরদারির কারণে বৈধ অ্যাকাউন্টধারীরা তাদের অর্থ অন্য কোনো নিরাপদ অ্যাসেটে রূপান্তর করে নিয়েছেন।
৩. রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সম্পর্ক:
যেহেতু এই ডাটাটি ২০২৫ সালের সমাপ্তি বছরের অর্থনৈতিক প্রতিফলন, তাই এটি স্পষ্ট যে তৎকালীন সময়ে দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি সুইজারল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে সম্পদ স্থানান্তরের অনুকূলে ছিল। তবে এই অর্থ যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বা শিল্পায়নে আরও বেশি ব্যবহৃত হতে পারে, সেই দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে।
উপসংহার: দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার পথ
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (SNB) ২০২৫ সালের এই বার্ষিক প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের জন্য একই সাথে গর্ব এবং সতর্কতার এক মিশ্র বার্তা বহন করছে। একদিকে যেমন দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে আমানতের পরিমাণ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে, ওআইসিডি গ্লোবাল ফোরামের ২০编制 সালের মে মাসের আপডেট অনুযায়ী বাংলাদেশ এখনো ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (AEOI) প্রথায় যুক্ত না হতে পারাটা আমাদের আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের ঘাটতি।
দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ কর-বান্ধব, স্বচ্ছ এবং পাচারমুক্ত করতে হলে আন্তর্জাতিক এই তথ্য বিনিময় চুক্তিগুলোতে অবিলম্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবেই অফিশিয়াল রিপোর্টের বাইরে থাকা প্রকৃত আর্থিক চিত্র এবং দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকার সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দিগন্ত বাংলা নিউজের পক্ষ থেকে আমরা আশা করি, দেশের আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকগণ এই পরিসংখ্যানগুলোকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে আগামী দিনে আরও দূরদর্শী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।