ঢাকার যানজট নিরসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগান্তকারী ব্যবহার: রাজধানীর ১২০টি মোড়কে ঢেলে সাজানোর মাস্টারপ্ল্যান, প্রথম ধাপে ৭৬ পয়েন্টে বসছে স্বয়ংক্রিয় এআই ক্যামেরা ও আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা
জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মেগাসিটি ঢাকার দীর্ঘদিনের ও অন্যতম প্রধান অভিশাপ ‘যানজট’ নিরসনে এবার সম্পূর্ণ আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দিকে হাঁটতে শুরু করেছে সরকার। চিরাচরিত এনালগ বা হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের সনাতন পদ্ধতিকে বিদায় জানিয়ে রাজধানীর পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) প্রযুক্তির আওতায় আনার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই মেগা উদ্যোগের প্রথম ধাপে ঢাকার ৭৬টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মোড়ে এআই-ভিত্তিক আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরবর্তীতে এই নেটওয়ার্ককে আরও সম্প্রসারিত করে রাজধানীর মোট ১২০টি প্রধান ইন্টারসেকশন বা মোড়ে এই এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
বিগত সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। "রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন" শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় ডিএমপির পক্ষ থেকে এই আধুনিক কারিগরি পরিকল্পনাটি বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। উচ্চপর্যায়ের এই সভা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের এই যুগান্তকারী পরিকল্পনাটি মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় সিটি করপোরেশন সরাসরি সমন্বয় ও কার্যক্রমে অংশ নেবে। ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং মানবহীন করার লক্ষ্যেই এই স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থায়নের উৎস: কোনো অতিরিক্ত বরাদ্দ ছাড়াই পুলিশের নিজস্ব তহবিলে বাস্তবায়ন
সাধারণত এই ধরনের বড় এবং উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উঠলেই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ কিংবা সরকারের বিশেষ উন্নয়ন তহবিলের (এডিপি) ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই আধুনিক এআই ক্যামেরা ও সিগন্যাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কোনো বিশেষ বরাদ্দ বা বিদেশি কোনো সংস্থার কাছ থেকে বিশেষ কোনো তহবিলের প্রয়োজন হবে না।
আরও পড়ুন: পরীমণি-সাকলায়েন কেলেঙ্কারি: ডিবির সাবেক এডিসির বাধ্যতামূলক অবসরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি
বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকেই এই প্রকল্পের যাবতীয় প্রাথমিক ও পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে। নিজস্ব অর্থায়নে এই ধরনের একটি উচ্চপ্রযুক্তিগত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বনির্ভরতার এক অনন্য নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরীক্ষামূলক ধাপের সাফল্য: বুয়েটের দেশীয় প্রযুক্তি ও এআই-এর ম্যাজিক
হুট করেই পুরো ঢাকার ওপর এই প্রযুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না; বরং এর পেছনে রয়েছে একটি সফল পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রজেক্টের অভিজ্ঞতা। তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বেশ কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই আধুনিক ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। পাইলট প্রজেক্টের আওতাভুক্ত সেই পয়েন্টগুলো ছিল:
জাহাঙ্গীর গেট
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনের সড়ক
বিজয় সরণি মোড়
ফার্মগেট ইন্টারসেকশন
কারওয়ান বাজার মোড়
বাংলামোটর
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের মোড়
এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সবচেয়ে গৌরবময় দিকটি হলো, এতে কোনো বিদেশি প্রযুক্তি ধার করা হয়নি। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল ও মেধা ব্যবহার করে এই সিগন্যাল বাতি এবং এর ভেতরের মূল কন্ট্রোলিং সিস্টেম তৈরি করেছে। এই পাইলট প্রকল্পে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে রয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ এবং এই পুরো বিশাল মেগা কার্যক্রমটি নিখুঁতভাবে সমন্বয় করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
চলতি বছরের ৭ মে থেকে এই পরীক্ষামূলক ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করে ডিএমপি। এই বিশেষ এআই ক্যামেরার মধ্যে এমন এক আধুনিক আলগোরিদম এবং বিশেষায়িত সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে, যা সড়কে চলমান যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেকেন্ডের মধ্যে শনাক্ত করতে পারে। সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হেলমেট না থাকা কিংবা যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের মতো অপরাধগুলো এই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বর প্লেট রিড করে ডাটাবেজে পাঠিয়ে দেয়। এই সিগন্যালগুলো মূলত সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্দেশে পরিচালিত হলেও, ভিআইপি মুভমেন্ট বা জরুরি সেবার (যেমন অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিস) কথা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক ম্যানুয়ালি বা হাতে নিয়ন্ত্রণ করার বিকল্প সুযোগও রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রিজার্ভ চুরি: সাবেক গভর্নর আতিউরসহ ৬৪ জনের বিরুদ্ধে সিআইডির চার্জশিট প্রস্তুত
অতীতের ব্যর্থতার খতিয়ান: ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার কালো ইতিহাস
ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের এই উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যার প্রায় প্রতিটিই শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে। রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার এই ব্যর্থতার ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ এবং নিরাশাজনক। ডিটিসিএ (DTCA) এর ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ঢাকায় প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে, পাকিস্তান আমলে। তবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবে এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিতে সেই প্রাথমিক সিগন্যাল ব্যবস্থাগুলো সম্পূর্ণ অকেজো ও ধ্বংস হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় হাতের ইশারায় ট্রাফিক চলার পর, বিগত কয়েক দশকে বিদেশি অর্থায়নে যেসব বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল এবং যেভাবে সেগুলো ব্যর্থতার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে, তার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| সময়কাল (প্রকল্পের বছর) | অর্থায়নকারী সংস্থা / দেশ | প্রকল্পের বিবরণ ও ইন্টারসেকশন সংখ্যা | বর্তমান অবস্থা ও ব্যর্থতার কারণ |
| ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সাল | বিশ্বব্যাংক (World Bank) | ৬৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি স্থাপন | কোনো সুফল পাওয়া যায়নি এবং ২০০৯ সালের মধ্যে সবগুলো বাতি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। |
| ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল | বিশ্বব্যাংক (World Bank) | আরও ৯১টি নতুন ইন্টারসেকশনে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা | মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়হীনতা ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কখনোই কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। |
| ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল | জাইকা (JICA - জাপান) | ৪টি ব্যস্ততম ইন্টারসেকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিশেষ সিগন্যাল স্থাপন | রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ট্রাফিক পুলিশের ম্যানুয়াল পদ্ধতির প্রতি অতি-নির্ভরশীলতায় কিছুদিন পরই অকার্যকর হয়ে পড়ে। |
অতীতে বিশ্বব্যাংক এবং জাইকার মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার শত শত কোটি টাকার ঋণ ও অনুদানের সিগন্যাল বাতিগুলো শেষ পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় কেবল 'শো-পিস' বা খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। স্বয়ংক্রিয় বাতি জ্বললেও ট্রাফিক পুলিশকে হাতের ইশারায় কিংবা লাঠি উঁচিয়েই গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল—প্রযুক্তির সাথে মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশদের সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব এবং ঢাকার গাড়ির সংখ্যার তুলনায় সিগন্যালের টাইমিং ফিক্সড বা অপরিবর্তনশীল থাকা। কিন্তু এবারের এআই (AI) প্রযুক্তিটি সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ এটি লাইভ ট্রাফিক ডেনসিটি বা রাস্তার গাড়ির চাপ দেখে নিজে নিজেই সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করতে সক্ষম।
কীভাবে কাজ করবে এই নতুন এআই ক্যামেরা ও সিগন্যাল ব্যবস্থা?
নতুন প্রযুক্তির এই এআই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমটি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করবে, যা ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আশা করছেন প্রকৌশলীরা:
১. রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ডেনসিটি অ্যানালাইসিস (Real-time Density Analysis)
ঐতিহ্যবাহী সিগন্যালগুলোতে দেখা যায়, একদিকের রাস্তায় কোনো গাড়ি না থাকলেও বাতি সবুজ হয়ে থাকে, আর অন্যদিকের মাইলের পর মাইল জ্যাম থাকা রাস্তায় বাতি লাল হয়ে থাকে। নতুন এআই ক্যামেরাগুলো প্রতি সেকেন্ডে রাস্তার গাড়ির লাইভ ফুটেজ বিশ্লেষণ করবে। যে রাস্তায় গাড়ির জ্যাম বেশি, সেই রাস্তার সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি সময় সবুজ থাকবে এবং ফাঁকা রাস্তার সিগন্যাল দ্রুত লাল হয়ে যাবে। এর ফলে কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই রাস্তার গাড়ির চাপ প্রাকৃতিকভাবে কমে আসবে।
২. অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (ANPR) ও মামলা
এই এআই ক্যামেরার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অপরাধী শনাক্তকরণ ক্ষমতা। সড়কে কোনো গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করলে বা জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর এসে দাঁড়ালে ক্যামেরাটি তাৎক্ষণিকভাবে সেই গাড়ির নম্বর প্লেটের ছবি তুলে নেবে। বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে গাড়ির মালিকের মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল জরিমানার স্লিপ বা ই-প্রসিকিউশন কেস চলে যাবে। এর ফলে চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার এক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।
৩. সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারের সাথে ইন্টিগ্রেশন
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের একটি যৌথ সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার থাকবে। ৭৬টি মোড়ের (পরবর্তীতে ১২০টি) প্রতিটি ক্যামেরা এই সেন্ট্রাল সার্ভারের সাথে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট রুটে ভিআইপি মুভমেন্ট বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি থাকলে, কমান্ড সেন্টার থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সাময়িকভাবে ওভাররাইড করে ওই গাড়ির জন্য সম্পূর্ণ ‘গ্রিন করিডোর’ তৈরি করে দেওয়া যাবে।
এডসেন্স ফ্রেন্ডলি বিশ্লেষণ: মেগাসিটির যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও এআই-এর গুরুত্ব
একটি আধুনিক ও টেকসই মেগাসিটি গড়ে তোলার জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন গবেষণা ও অর্থনীতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরের যানজটের কারণে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার আর্থিক মূল্য বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা। একই সাথে জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ার কারণে দেশের আমদানিকৃত তেলের একটি বড় অংশ অপচয় হচ্ছে এবং ঢাকার বায়ু দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনীতির সমীকরণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির এই সঠিক ব্যবহার যদি ঢাকার ১২০টি মোড়ে পূর্ণাঙ্গভাবে সফল করা যায়, তবে তা কেবল যানজটই কমাবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে (GDP) এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বুয়েটের তৈরি দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার করায় দেশের আইটি সেক্টর ও স্থানীয় প্রকৌশলীদের এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' রূপান্তরের রোডম্যাপের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সফল বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ: অতীত থেকে শিক্ষা
প্রকল্পটি কাগজে-কলমে অত্যন্ত চমৎকার এবং আশাব্যঞ্জক হলেও মাঠপর্যায়ে এর শতভাগ সাফল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে:
পেশাদারিত্ব ও মানসিকতার পরিবর্তন: ঢাকার ট্রাফিক পুলিশদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলো হাতের ইশারায় গাড়ি চালানো। নতুন এই এআই প্রযুক্তির ওপর আস্থা রেখে তাদের ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় জাইকা বা বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের মতো এটিও অকেজো হয়ে পড়বে।
সড়কের হকার ও অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ: এআই ক্যামেরা তখনই নিখুঁতভাবে কাজ করবে যখন রাস্তা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। সিগন্যাল পয়েন্টের আশেপাশে যদি অবৈধ বাস স্ট্যান্ড বা হকারদের দোকান থাকে, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ট্রাফিকের সঠিক হিসাব মেলাতে পারবে না।
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি দল: ঢাকার ধুলোবালি ও আবহাওয়ার কারণে ক্যামেরা এবং সেন্সরগুলো দ্রুত নষ্ট হতে পারে। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল এবং ডিএমপির আইটি উইংকে সার্বক্ষণিক এই সিস্টেম মনিটরিং ও হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত রাখতে হবে।
উপসংহার: স্মার্ট ট্রাফিকের নতুন আশার আলো
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ে যে ব্যর্থতার বৃত্ত তৈরি হয়েছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নেওয়া এই নতুন এআই প্রজেক্টটি সেই বৃত্ত ভাঙার এক অনন্য হাতিয়ার হতে পারে। পুলিশের নিজস্ব অর্থায়নে এবং বুয়েটের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি যদি ঢাকার রাস্তায় পুরোপুরি সফল হয়, তবে তা হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একটি উদাহরণ। বিশ্বজুড়ে যখন স্মার্ট সিটির ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে, তখন ঢাকাকে একটি আধুনিক বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই রূপান্তর সময়ের দাবি। ঢাকার সাধারণ নাগরিকরা এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন—কবে এই ৭৬ তথা ১২০টি মোড়ের এআই ক্যামেরা চালু হবে আর কবে তারা ঢাকার চিরচেনা জ্যামের নরকযন্ত্রণা থেকে স্থায়ী মুক্তি পাবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।