পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনে আইএইএ-কে অনুমতি দেবে না ইরান, ট্রাম্পের পাল্টা দাবি

পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনে আইএইএ-কে অনুমতি দেবে না ইরান, ট্রাম্পের পাল্টা দাবি

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

## ওয়াশিংটন বনাম তেহরানের নতুন স্নায়ুযুদ্ধ: ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনে আইএইএ-কে অনুমতি দেবে না ইরান, ট্রাম্পের দাবি ‘পরিদর্শন হবেই এবং তা হবে পূর্ণাঙ্গ’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বৈশ্বিক পরমাণু কূটনীতিতে এক নতুন ও তীব্র উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। এবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের জন্য নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত ও স্পর্শকাতর পরমাণু স্থাপনাগুলো উন্মুক্ত করার বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ইরান। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি'র (Rafael Grossi) সাথে এই সংক্রান্ত কোনো ধরণের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তেহরান। একই সাথে পরিদর্শকদের পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার খবরটিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে পারস্য উপসাগরের এই দেশটি।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) ইরানের রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক বিশেষ কূটনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে এই কঠোর ও অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী প্রধান মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই (Esmaeil Baghaei)। তবে ইরানের এই কঠোর ও নেতিবাচক বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিস্ফোরক দাবি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা হোয়াইট হাউস প্রশাসন। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রানিং মেট তথা ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স দাবি করেছেন যে, ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচির আওতায় থাকা বিতর্কিত ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করতে ভেতরে ভেতরে শতভাগ সম্মত হয়েছে। দুই দেশের এই মুখোমুখি ও সাংঘর্ষিক অবস্থান বিশ্বমঞ্চে এক নতুন কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।

## জে. ডি. ভ্যান্সের দাবি বনাম ইরানের ইসমাইল বাঘাইয়ের সাফ অস্বীকৃতি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের গভীর বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ইরানি মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির সাথে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যের ন্যূনতম কোনো মিল বা সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স (J. D. Vance) সুইজারল্যান্ড সফরকালে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

গত মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জে. ডি. ভ্যান্স বলেছিলেন:

আরও পড়ুন: সৌদি আরবে এক বছরেই ১০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা

"জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের প্রতি ইরানের আমন্ত্রণ ও সম্মতি জ্ঞাপন বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের জন্য এবং সমগ্র মার্কিন জনগণের জন্য একটি বিরাট ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। এটি মূলত ইরানি ভূখণ্ডে অবৈধ পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির চিরতরে সমাপ্তি ঘটানোর এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম বড় ধরণের বড় পদক্ষেপ।"

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের এই হাইপ্রোফাইল বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে পাল্টা এক কঠোর বিবৃতি প্রদান করেন। তিনি মার্কিন দাবিকে সম্পূর্ণ উসকানিমূলক এবং মিথ্যা প্রচারণা বলে অভিহিত করেন। বাঘাই অত্যন্ত কড়া ভাষায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সাথে ইরানের সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কোনো স্থাপনা পরিদর্শন নিয়ে কোনো এজেন্ডা বা সমঝোতা হয়নি এবং ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে এমন কোনো একপেশে পরিদর্শনের অনুমতি আইএইএ-কে কখনোই দেবে না।

## 'তারা ভুল বলছে এবং তারা নিজেরাও তা জানে'—পেনসিলভানিয়ায় গর্জে উঠলেন ট্রাম্প

তেহরানের এই অনড় ও অস্বীকৃতিমূলক বক্তব্যের পর চুপ করে বসে থাকেনি ওয়াশিংটন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার মাথায় সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এই বিতর্কে প্রবেশ করেন এবং নিজের আগের দাবিতেই অনড় থাকার জোরালো প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় আয়োজিত এক বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন, ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখকে ফাঁকি দিতে বাইরে এই ধরণের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলছে। ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচির আওতায় থাকা সবকটি স্পর্শকাতর স্থাপনা আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করতে ইতিমধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় সম্মত হয়েছে। তবে ঠিক কবে বা কোন তারিখে আইএইএ-র এই বিশেষ প্রতিনিধি দল ইরানি পরমাণু কেন্দ্রে প্রবেশ করবে, সে বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা ডেটলাইন দিতে রাজি হননি। এই প্রসঙ্গে কিছুটা হালকা চালে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, এ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ‘তাড়াহুড়ার কোনো কিছু নেই’।

 আরও পড়ুন:ট্রাম্পের মুখোমুখি নেতানিয়াহু: ওয়াশিংটন-তেল আবিব চরম সংঘাতের পথে

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বলেন:

"ইরানি কর্মকর্তারা বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে ও মিডিয়ায় যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা সম্পূর্ণ ভুল। তারা স্পষ্টভাবেই ভুল বলছেন এবং তারা নিজেরাও খুব ভালো করে জানেন যে তারা ভুল বলছেন ও মিথ্যা দাবি করছেন। তারা আমাদের আন্তর্জাতিক চ্যানেলের ভেতরে ভেতরে এবং কূটনৈতিক ব্যাক-চ্যানেলে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে পরিদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আমাদের কাছে এর পক্ষে দাপ্তরিক শতভাগ লিখিত নিশ্চয়তা (Guarantee) রয়েছে। আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলছি, আইএইএ-র পরিদর্শন ইরানি মাটিতে অবশ্যই হবে এবং তা হবে অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত।"

## ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু চুল্লির নেপথ্য বিতর্ক

এর আগে হোয়াইট হাউসের এক বিশেষ বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিশেষ কারিগরি পরিদর্শকরা ইরানের সেন্ট্রিফিউজ ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংশ্লিষ্ট ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিদর্শন করবেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ইরানের যে কয়েকটি পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র বা স্থাপনা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জানা প্রয়োজন।

তবে ইরান শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরণের একতরফা দাবিকে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী বলে নাকচ করে আসছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং সামরিক কমান্ডারদের মতে, ওয়াশিংটন মূলত পরিদর্শনের নাম করে ইরানের গোপন সামরিক ঘাঁটি ও পরমাণু সক্ষমতার প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলোর ওপর বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে চায়। ফলে আইএইএ-র মতো একটি নিরপেক্ষ সংস্থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ ইরানের।

## একনজরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু পরিদর্শন বিতর্ক ও চলমান কূটনৈতিক স্থিতি

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই হাইভোল্টেজ পরমাণু পরিদর্শনের দ্বন্দ্বের বিবরণ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

দেশের নাম ও আন্তর্জাতিক সংস্থাপ্রধান নেতার নাম ও রাজনৈতিক পদবীপরমাণু পরিদর্শন ইস্যুতে অফিশিয়াল অবস্থান ও দাবি
ইরান (তেহরান প্রশাসন)

ইসমাইল বাঘাই


(পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র)

* আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সাথে কোনো আলোচনা হয়নি।


* ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনে আইএইএ-কে অনুমতি দেওয়া হবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (হোয়াইট হাউস)

ডোনাল্ড ট্রাম্প


(মার্কিন প্রেসিডেন্ট)

* ইরান পরমাণু কেন্দ্র উন্মুক্ত করতে ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ সম্মত হয়েছে।


* মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর পক্ষে শতভাগ লিখিত নিশ্চয়তা আছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (প্রশাসন)

জে. ডি. ভ্যান্স


(মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট)

* ইরানের এই আমন্ত্রণ মার্কিন জনগণের জন্য একটি বড় মাইলফলক।


* এটি ইরানে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটানোর প্রথম পদক্ষেপ।

জাতিসংঘের উইং (IAEA)

রাফায়েল গ্রোসি


(মহাপরিচালক, আইএইএ)

* ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পরমাণু চুল্লি পরিদর্শনের অপেক্ষায়।

## আন্তর্জাতিক মহলের শঙ্কা: কোন দিকে মোড় নেবে এই পরমাণু বিরোধ?

বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর চোখ এখন নিবিড়ভাবে নিবদ্ধ রয়েছে এই স্পর্শকাতর ইস্যুটির ওপর। আইএইএ-র পরিদর্শন ইস্যু নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত কোনো মধ্যস্থতা বা চুক্তির মাধ্যমে কোনো সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, নাকি এই বিরোধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়। ট্রাম্পের 'পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন' এর অনড় দাবির মুখে ইরান যদি সত্যিই তাদের পরমাণু কেন্দ্রগুলোর দরজা বন্ধ করে রাখে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো ইরানের ওপর পুনরায় অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর পরমাণু কূটনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খবরের গভীর ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিউজ সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি



 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন