চীনের সঙ্গে আরও গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়তে চায় বাংলাদেশ

চীনের সঙ্গে আরও গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়তে চায় বাংলাদেশ

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ সম্মেলনে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনের বিশেষ আহ্বান।

বেইজিংয়ের মাটিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি: চীনের সঙ্গে আরও শক্তিশালী ও গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রত্যয়, ১৫ দিনে মিলবে নতুন ব্যবসার লাইসেন্স

দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি বাংলাদেশ এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন এক নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে রেখে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে তাদের বৈশ্বিক ভ্যালুচেইন (Value Chain) ব্যাপক আকারে সম্প্রসারণ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে চীনের বিশ্বমানের প্রযুক্তি, আধুনিক অবকাঠামো এবং বিপুল পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মধ্যে আরও গভীর ও টেকসই শিল্প অংশীদারিত্ব (Industrial Partnership) গড়ে তোলার ব্যাপারে বাংলাদেশের তীব্র আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সরকারপ্রধান।

আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ (Bangladesh Investment Forum) শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের মেগা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী চীনা ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারকদের উদ্দেশ্যে এই যুগান্তকারী বার্তা প্রদান করেন। বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে) এই সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সম্মেলনে উপস্থিত চীনের শীর্ষস্থানীয় বড় বড় করপোরেট জায়ান্ট এবং বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিদের সামনে বাংলাদেশ সরকারপ্রধান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক ব্যবসার জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, লাভজনক এবং ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত উর্বর ভূমি।

## বেইজিংয়ে প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলার ঘোষণা: চীনা ব্যবসায়ীদের দোরগোড়ায় মিলবে দাপ্তরিক সেবা

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) তথা BIDA-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোগে আয়োজিত এই হাইপ্রোফাইল অর্থনৈতিক সম্মেলনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা, ভৌগোলিক সুবিধা এবং সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন কর মওকুফসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চীনা ব্যবসায়ীদের সামনে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বিশেষ তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন বিডার বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বেইজিংয়ের এই সম্মেলনে চীনের বিখ্যাত ও স্বনামধন্য অন্তত ১২৫ জন শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী অংশ নেন, যারা বাংলাদেশে বড় ধরণের নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

সম্মেলনে চীনা ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় চমক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, চীনা বিনিয়োগকারীদের দাপ্তরিক সুযোগ-সুবিধা আরও সহজ করতে এবং কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি সেবা পৌঁছে দিতে খুব দ্রুতই চীনের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম বিশেষায়িত ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ (Investment Office) স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। এর ফলে চীনের মূল ভূখণ্ডে বসেই ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের যাবতীয় লাইসেন্স ও আইনি ছাড়পত্র সহজে সংগ্রহ করতে পারবেন, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে এক অনন্য গতি প্রদান করবে।

## আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূরীকরণে ১৮০ দিনের কঠোর মহাপরিকল্পনা: ১৫ দিনেই মিলবে লাইসেন্স

প্রধানমন্ত্রী তাঁর সুদীর্ঘ ও দূরদর্শী ভাষণে আন্তর্জাতিক পুঁজি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে দেশের প্রশাসনিক সংস্কারের একটি বড় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতে যে ধরণের আমলাতান্ত্রিক জড়তা বা ফাইল আটকে থাকার সংস্কৃতি ছিল, তা চিরতরে দূর করতে তাঁর সরকার ইতিমধ্যে একটি অত্যন্ত কঠোর ও জবাবদিহিমূলক ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা (180-Day Action Plan) মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক পুঁজি সংক্রান্ত যাবতীয় সরকারি কার্যপ্রণালি সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো এবং সরকারি সেবাসমূহকে শতভাগ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসা।

সরকারপ্রধান এই সংস্কারের একটি বড় সুফল হিসেবে ঘোষণা করেন:

"আমরা আমাদের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে এতটাই আধুনিক এবং সহজ করেছি যে, এখন থেকে বাংলাদেশে কোনো নতুন ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে চাইলে তার প্রাথমিক লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক অনুমোদন সর্বোচ্চ মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে। আমরা বিশ্ববাজারের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং চীনের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বস্ত শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রতিটি নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"

## আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় ইকোনমিক জোনের বিশাল কর্মযজ্ঞ

বাংলাদেশের শিল্প খাতের ভৌগোলিক বিকাশের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে আগত চীনা ব্যবসায়ীদের জানান, কেবল নীতিগত সুবিধাই নয়, চীনা শিল্পকারখানার জন্য বাংলাদেশে বিশেষায়িত জমি ও জোনের ব্যবস্থাও সম্পন্ন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি করা হচ্ছে বিশাল ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ (Chinese Economic and Industrial Zone), যা মূলত চীনা প্রযুক্তির বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টের প্রধান হাব হিসেবে কাজ করবে। এর পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলায় গড়ে তোলা হচ্ছে আরও একটি বৃহৎ ও কৌশলগত দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে গুরুতর অভিযোগ

প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাংলাদেশের বিশাল সস্তা ও দক্ষ যুবশক্তির সমন্বয়ে চীনা কোম্পানিগুলো অত্যন্ত কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন করে তা বিশ্ববাজারে রপ্তানি করতে সক্ষম হবে। বেইজিংয়ে এই বিশেষ কার্যালয় চালু হওয়ার পর চীনা বিনিয়োগকারীদের সাথে বাংলাদেশের জয়েন্ট ভেঞ্চার (Joint Venture) ব্যবসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

## একনজরে বেইজিংয়ের ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ সম্মেলনের মূল মূল এজেন্ডা ও খতিয়ান

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই মেগা অর্থনৈতিক সম্মেলনের প্রধান প্রধান সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক রূপরেখা একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

সম্মেলনের প্রধান প্রধান খাত ও এজেন্ডা সমূহসুনির্দিষ্ট বিবরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগত খতিয়ান
সম্মেলনের অফিশিয়াল নাম‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ (আয়োজক: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- বিডা)।
স্থান ও সুনির্দিষ্ট সময়কালবেইজিংয়ের বিখ্যাত দিয়াওইউতাই হোটেল; ২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)।
অংশগ্রহণকারী চীনা প্রতিনিধিচীনের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী ১২৫ জন মেগা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি।
প্রধানমন্ত্রীর মূল বার্তা ও আহ্বানবাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত; চীনা কোম্পানিগুলোকে ভ্যালুচেইন সম্প্রসারণের আহ্বান।
নতুন ঘোষিত বিশেষ সুবিধাআমলাতান্ত্রিক জড়তা দূর করে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে নতুন ব্যবসার লাইসেন্স অনুমোদন।
প্রশাসনিক বড় সংস্কারআন্তর্জাতিক পুঁজি ও সরকারি সেবা সহজ করতে ১৮০ দিনের কঠোর কর্মপরিকল্পনা
ভৌগোলিক প্রধান প্রধান প্রকল্পচট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ চীনা শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল।

## এশীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ গুরুত্ব

বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক কূটনীতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থবিজ্ঞানীরা। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং এই শিল্প অংশীদারিত্বের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল এবং আইটি খাতে চীনের আধুনিক প্রযুক্তির সরাসরি স্থানান্তর (Technology Transfer) ঘটবে। প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে স্পষ্ট করেন যে, নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগবান্ধব নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে, যা বিদেশি পুঁজির শতভাগ নিরাপত্তা দেবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক মিশন, বিদেশি বিনিয়োগের সর্বশেষ আপডেট এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিটি প্রফেশনাল ও নির্ভরযোগ্য খবরাখবর সবার আগে শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিউজ সূত্র: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন