ভেনেজুয়েলায় প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

ভেনেজুয়েলায় প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হেনেছে ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী দুটি প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প।

## ধ্বংসস্তূপে পরিণত ল্যাটিন আমেরিকা: ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানল ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ছাড়ানোর আশঙ্কা ইউএসজিএস-এর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

প্রকৃতির এক চরম ও নির্মম তাণ্ডবের সাক্ষী হলো দক্ষিণ আমেরিকার তেল সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা। ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটিতে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হেনেছে পর পর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী, প্রলয়ংকরী এবং বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রারও অধিক তীব্রতাসম্পন্ন এই জোড়া ভূকম্পনে পুরো দেশজুড়ে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ভূতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এক বিশেষ বৈশ্বিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা প্রাথমিক অনুমান ছাড়িয়ে ১০ হাজার বা তার বেশি হতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি যদি আরও খারাপের দিকে যায়, তবে প্রাণহানি ১ লাখের গণ্ডি পর্যন্তও স্পর্শ করতে পারে বলে এক চরম উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ১১টার দিকে যখন দেশের সিংহভাগ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পর পর এই দুটি শক্তিশালী ভূকম্পন পুরো ভেনেজুয়েলাকে কাঁপিয়ে তোলে। প্রথম ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রা এবং তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই আঘাত হানা দ্বিতীয় ভূকম্পনটির তীব্রতা রেকর্ড করা হয়েছে ওলটপালট করে দেওয়া ৭ দশমিক ৫ মাত্রা। এই জোড়া ধাক্কায় রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বড় বড় শহরের শত শত বহুতল ভবন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

## ছুটির দিনে নিথর জনপদ: ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল দেশের কৌশলগত প্রধান তেল শোধনাগার অঞ্চল

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা (Al Jazeera) এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র অনুযায়ী এবারের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প দুটির মূল কেন্দ্রস্থল বা এপিসেন্টার (Epicenter) ছিল দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই উপকূলীয় অঞ্চলটি ভেনেজুয়েলার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলেই দেশটির বেশ কয়েকটি প্রধান প্রধান খনিজ তেল শোধনাগার (Oil Refinery) এবং জ্বালানি মজুত কেন্দ্র অবস্থিত। ভূমিকম্পের ফলে এই তেল শোধনাগারগুলোতে কোনো বড় ধরণের বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক ধরণের বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে গুরুতর অভিযোগ

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, গত মঙ্গলবার যেদিন এই প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পটি আঘাত হানে, সেদিন ভেনেজুয়েলায় একটি বিশেষ সরকারি ও জাতীয় ছুটি ছিল। জাতীয় ছুটি থাকার কারণে দেশের সিংহভাগ চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ বাইরে না গিয়ে নিজ নিজ পরিবার-পরিজনসহ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। আর ঠিক এই কারণেই বহুতল ভবনগুলো যখন ভেঙে পড়ে, তখন ভবনের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি অন্য সাধারণ দিনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। মাঝরাতের এই আচমকা জোড়া ধাক্কায় মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পায়নি, যার ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মানুষের চাপা পড়ার এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

## ইউএসজিএস-এর ভয়ানক পূর্বাভাস: ১ লাখ ছাড়াতে পারে মৃত্যুর মিছিল, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণই প্রধান কারণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS) তাদের বৈজ্ঞানিক ডেটা ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এক অত্যন্ত ভয়ানক ও সতর্কবার্তা জারি করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা এই জোড়া কম্পনে ক্ষয়ক্ষতির যে ধারা, তাতে সামগ্রিক মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে অনায়াসেই ১ লাখের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারে। তবে ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নিহত বা আহতের কোনো সুনির্দিষ্ট কিংবা অফিশিয়াল পরিসংখ্যান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বর্তমানে উদ্ধারকারী দলগুলো ধসে পড়া ভবনগুলোর নিচে মূলত জীবিত ও মৃত মানুষদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএনের (CNN) মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন প্রান্তিক শহর এবং উপকূলীয় গ্রামগুলোতে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও বহুতল কমার্শিয়াল ভবন সম্পূর্ণ ধসে মাটির সাথে মিশে গেছে। ইউএসজিএস তাদের বিশেষ কারিগরি বিবৃতিতে এর পেছনের মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে, ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ আবাসিক ভবন ও বাড়িঘর আন্তর্জাতিক কোনো ভূমিকম্প সহনশীল আধুনিক প্রযুক্তি (Earthquake-resistant technology) বা বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে তৈরি করা হয়নি। দুর্বল ও অপরিকল্পিত কাঠামোর কারণে এই ৭ মাত্রার চেয়ে শক্তিশালী জোড়া ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে ভবনগুলো সরাসরি ওপর থেকে নিচে ধসে পড়েছে, যা নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান ও মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।

## সুনামি সতর্কতা জারি ও প্রত্যাহার: আফটারশকের তীব্র আতঙ্কে খোলা আকাশের নিচে লাখো মানুষ

মঙ্গলবার রাতের সেই ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের ঠিক পরপরই ক্যারিবীয় সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরণের জলোচ্ছ্বাস বা সুনামি আঘাত হানতে পারে এমন প্রবল আশঙ্কায় তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিএস। তবে উপকূলে পানির উচ্চতা এবং সমুদ্রের তলদেশের টেকটোনিক প্লেটের মুভমেন্ট গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর কয়েক ঘণ্টা পর সেই সুনামির সতর্কতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, যা উপকূলের মানুষদের জন্য সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জামায়াতের মিছিল থেকে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা

সুনামির ভয় কাটলেও ভেনেজুয়েলাবাসীর মন থেকে এখনো কাটেনি মূল আতঙ্কের রেশ। মূল ভূমিকম্পের পর থেকে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন উপত্যকায় অনবরত ছোট ও মাঝারি ধরনের আফটারশক (Aftershocks) বা মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে। এই আফটারশকের কারণে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা ফাটল ধরা ভবনগুলো যেকোনো সময় আবারও ধসে পড়তে পারে এমন চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে, পার্ক, স্টেডিয়াম ও রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। পুরো দেশজুড়ে বর্তমানে এক অবর্ণনীয় হাহাকার ও মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

## একনজরে ভেনেজুয়েলার প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প ও ক্ষয়ক্ষতির আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মূল বিবরণ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক সমীক্ষা খাতসুনির্দিষ্ট বিবরণ ও ভৌগোলিক খতিয়ান
দুর্যোগ কবলিত দেশের নামভেনেজুয়েলা (দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ)।
ভূমিকম্পের সংখ্যা ও সময়কালগত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১১টায়, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ২টি জোড়া ধাক্কা
ভূমিকম্প দুটির সুনির্দিষ্ট মাত্রাপ্রথমটি রিখটার স্কেলে ৭.২ মাত্রা এবং দ্বিতীয়টি ৭.৫ মাত্রা
ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রস্থল (Epicenter)ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান উপকূলীয় তেল শোধনাগার অঞ্চল।
ইউএসজিএস (USGS) এর মৃত্যুর পূর্বাভাসনিহতের সংখ্যা সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ছাড়ানোর আশঙ্কা।
ক্ষয়ক্ষতির মূল মূল কারণঅপরিকল্পিত ও ভূমিকম্প সহনশীল প্রযুক্তি ছাড়া তৈরি করা ভঙ্গুর ভবন কাঠামো।
বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতিসুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও অনবরত শক্তিশালী আফটারশকের আতঙ্ক।

## বিশ্ববাসীর প্রতি সহায়তার আবেদন এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ভূমিকম্পের প্রভাব

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘ (UN) গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং দুর্গত এলাকায় জরুরি রেড ক্রসের উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনিতেই অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত ভেনেজুয়েলার জন্য এই জোড়া ভূমিকম্প এক মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই এবং জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ভেনেজুয়েলার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরে আসতে বহু বছর সময় লেগে যাবে।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাৎক্ষণিক আপডেট, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক্সক্লুসিভ খবরাখবর, জাতিসংঘের মানবিক পলিসি এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি নির্ভরযোগ্য তথ্য সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে রাখতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিউজ সূত্র: সিএনএন এবং আল জাজিরা

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন