শাহজাদপুরে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে গুরুতর অভিযোগ

শাহজাদপুরে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে গুরুতর অভিযোগ

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রাইভেট পড়াকে কেন্দ্র করে এক খুদে শিক্ষার্থী ও তার পরিবারকে মানসিক হয়রানির অভিযোগে রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: শিক্ষা ক্ষেত্রে এক চরম অরাজকতা, অনৈতিক বাণিজ্য এবং গুরুশিষ্যের পবিত্র সম্পর্ক কলঙ্কিত করার মতো এক চাঞ্চল্যকর চিত্র ফুটে উঠেছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার এক নামী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এবং জনবহুল এলাকায় অবস্থিত ‘রংধনু মডেল স্কুল’-এর প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম শাহীনের বিরুদ্ধে উঠেছে তীব্র বাণিজ্যিক মানসিকতা, অবুঝ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে মানসিক হেনস্থা এবং অভিভাবকদের সাথে মুঠোফোনে চরম আপত্তিকর ও অশালীন আচরণের গুরুতর অভিযোগ। বিদ্যালয়ের নির্ধারিত বা প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব সিন্ডিকেটের শিক্ষকের বাইরে অন্য কোনো যোগ্য শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট বা কোচিং পড়লে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, ক্লাসে অপমানিত হতে হচ্ছে এবং পরিশেষে তাদের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে বলে এক লিখিত অভিযোগে জানা গেছে। এই মর্মে ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর মা ও সচেতন অভিভাবক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি সুনির্দিষ্ট এবং আইনি প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন, যা সমগ্র শাহজাদপুর উপজেলা জুড়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে।

ঘটনার আদ্যোপান্ত ও ভুক্তভোগী পরিবারের করুণ আকুতি লিখিত অভিযোগের বিবরণী, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে জানা যায়, শাহজাদপুর উপজেলার অন্তর্গত গাড়াদহ ডাকঘরের অধীনস্থ হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ হাফিজুর রহমান এবং মোছাঃ মুনজিলা পারভীন দম্পতির সন্তান রংধনু মডেল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির একজন নিয়মিত, বিনয়ী ও মেধাবী ছাত্র ছিল। বিদ্যালয়ে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুটি তার পড়াশোনার মান আরও উন্নত করার লক্ষ্যে এবং বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা কাটানোর সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চাপিয়ে দেওয়া নির্ধারিত শিক্ষকের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দে মোঃ আব্দুল হানিফ নামের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে প্রাইভেট পড়া শুরু করে।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ ১৪ মাস পর আগামী ২৮ জুন দেশজুড়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন

​অভিযোগ রয়েছে, এই স্বাধীন সিদ্ধান্তটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম শাহীন। ওই অবুঝ শিশু শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করছে—এই খবরটি জানার পর থেকেই প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হন এবং ক্লাসের ভেতরে ও বাইরে তার প্রতি বৈরী ও চরম বিরূপ আচরণ শুরু করেন। ভুক্তভোগী মা মুনজিলা পারভীন তার লিখিত অভিযোগে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রধান শিক্ষকের তৈরি করা বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের আওতাভুক্ত শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে তার মাত্র আট-নয় বছর বয়সী কোমলমতি সন্তানকে ক্লাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো, পড়াশোনার বিষয়ে নানা মানসিক নির্যাতন চালানো হতো এবং তাকে এক প্রকার একঘরে করে রাখার অপচেষ্টা করা হতো। একজন তৃতীয় শ্রেণির অবুঝ ও সংবেদনশীল শিশুকে নিয়মতান্ত্রিক এবং আনন্দময় পরিবেশে পড়াশোনা করার মৌলিক অধিকার দেওয়ার পরিবর্তে তার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর এমন এক নেতিবাচক ও অমানবিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা কোনো সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থায় কল্পনা করা যায় না।

মোবাইল ফোনে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার ও অনৈতিক চাপপ্রয়োগের বিতর্ক অভিযোগের সবচেয়ে ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর দিকটি হলো, শুধু ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর ওপরেই মানসিক নির্যাতন চালিয়ে ক্ষান্ত হননি এই প্রধান শিক্ষক। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম শাহীন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা মুনজিলা পারভীনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে অত্যন্ত আপত্তিকর, নীতিবহির্ভূত, অশোভন ও রুক্ষ ভাষায় কথাবার্তা বলেন। ফোনে তিনি এক প্রকার হুমকি দিয়ে সাফ জানিয়ে দেন যে, যদি ওই শিক্ষার্থীকে অন্য কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ানো অবিলম্বে বন্ধ না করা হয় এবং প্রধান শিক্ষকের নির্দেশিত শিক্ষকের অধীনে কোচিংয়ে না পাঠানো হয়, তবে তার এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বা টিকে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব করে তোলা হবে। একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তির কাছ থেকে একজন সম্মানিত নারী অভিভাবককে এমন অশালীন ভাষায় শাসানো, মানসিকভাবে হেনস্থা করা এবং নিজের সন্তানকে নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছেই জুয়াড়ির মতো পড়তে বাধ্য করার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি শাহজাদপুরের সচেতন সমাজ, সুশীল সমাজ ও সাধারণ অভিভাবকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট ও সাধারণ অভিভাবকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ অনুসন্ধানে আরও জানা যায় যে, এই চরম অন্যায়মূলক ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষার্থীর মাঝেই সীমাবদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভুক্তভোগী মা মুনজিলা পারভীন পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের অন্যান্য সহপাঠীদের অভিভাবক এবং স্থানীয় সচেতন মহলের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলে জানতে পেরেছেন যে, রংধনু মডেল স্কুলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ‘কোচিং সিন্ডিকেট’ বা ‘অবৈধ প্রাইভেট বাণিজ্য’ চক্র অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সক্রিয় রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব পছন্দনীয় এবং নির্ধারিত পকেটস্থ শিক্ষকদের কাছে চড়া মূল্যে প্রাইভেট না পড়লে বহু শিক্ষার্থীকেই ক্লাসে চরম অবমূল্যায়ন করা, পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেওয়া, পরীক্ষার খাতায় নম্বর কেটে নেওয়া এবং নানাবিধ মনগড়া অজুহাতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করার এক অলিখিত কুৎসিত নিয়ম বা সংস্কৃতি প্রথা হিসেবে চালু রয়েছে।

আরও পড়ুন: ইলিয়াস আলী গুমের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জিয়াউল: ট্রাইব্যুনালে বডিগার্ডের জবানবন্দি

​স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা লোকলজ্জা, সামাজিকভাবে হেনস্থার ভয় এবং মূলত সন্তানদের শিক্ষাজীবনের অপূরণীয় ক্ষতির কথা চিন্তা করে এতদিন মুখ খুলতে সাহস পাননি। তবে, এই লোহা-গরম করা সাহসী অভিযোগের পর অনেকেই এখন ভেতরে ভেতরে তীব্রভাবে ফুঁসে উঠছেন এবং এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অবসান চাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করার চেয়ে শিক্ষকদের নিজস্ব ব্যাংক ব্যালেন্স ভারী করার এবং অনৈতিক কোচিংয়ের মাধ্যমে রমরমা বাণিজ্য করার প্রবণতা এই স্কুলে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে।

কোमलমতি শিক্ষার্থীর তীব্র মানসিক বিপর্যয় ও বাধ্য হয়ে বিদ্যালয় পরিবর্তন প্রধান শিক্ষকের ধারাবাহিক ও অমানবিক মানসিক নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং ক্লাসের প্রতিদিনের ভীতিপ্রদ পরিবেশের কারণে তৃতীয় শ্রেণির ওই কোমলমতি শিশুটি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একপর্যায়ে শিশুটি গভীর ভীতি ও আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে না পারা এবং তীব্র মানসিক ট্রমার কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শুনলেই আঁতকে উঠত এবং বিদ্যালয়ে যেতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। সন্তানের এমন করুণ, আশঙ্কাজনক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে মা মুনজিলা পারভীন এবং তার পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশায় ভোগেন।

​অবশেষে সন্তানের অমূল্য মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, জীবন বাঁচানো এবং একটি নিরাপদ শিক্ষার্থীবান্ধব ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা চরম ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে বাধ্য হয়ে ওই তথাকথিত রংধনু মডেল স্কুল থেকে শিশুটিকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেন এবং উপজেলার অন্য একটি মানসম্মত ও মানবিক পরিবেশসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিństানে ভর্তি করান। একটি স্বনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয় থেকে এভাবে নোংরা অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে একজন নিয়মিত শিক্ষার্থীর আকস্মিকভাবে চলে যাওয়ার ঘটনা বর্তমান আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মুখে এক বড় ধরনের চপেটাঘাত এবং কলঙ্ক বলে মনে করছেন স্থানীয় বিজ্ঞ শিক্ষাবিদেরা।

সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি ও প্রশাসনের পদক্ষেপ উপায়ান্তর না পেয়ে এবং এই অন্যায়ের বিচার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার তাগিদে ভুক্তভোগী মা মোছাঃ মুনজিলা পারভীন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি তার লিখিত আবেদনে অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষাকে যারা পবিত্র পেশা না ভেবে কেবলই বাণিজ্যিক পিলখানা বানিয়েছে এবং অবুঝ শিশুদের ওপর যারা মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক অত্যাচার চালাচ্ছে, তাদের এই সমাজ ও প্রতিষ্ঠান থেকে অবিলম্বে বয়কট করা প্রয়োজন। তিনি এই অনৈতিক কোচিং বাণিজ্যের মূল হোতা ও রিংলিডার প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম শাহীনের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের জরুরি ও সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

​শাহজাদপুরের স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং অভিভাবক ফোরাম মনে করেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কোচিং বাণিজ্য বন্ধের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর জাতীয় নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি বেসরকারি বা মডেল স্কুল প্রকাশ্যে এমন বেআইনি সিন্ডিকেট তৈরি করে অবুঝ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করতে পারে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। যদি এই তদন্তে অভিযোগের সামান্যতম সত্যতাও প্রমাণিত হয়, তবে দ্রুত উক্ত অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে শাহজাদপুরসহ দেশের আর কোনো অঞ্চলের কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মন ও শিক্ষাজীবন নিয়ে এমন নিষ্ঠুর ও ন্যাক্কারজনক ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়। সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি—শিক্ষা হোক বাণিজ্যমুক্ত, নিরাপদ ও আনন্দময়।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন