বিনোদন ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মুম্বাই (বলিউড): রূপালি পর্দার গ্ল্যামার দুনিয়ায় কত শত বিচিত্র এবং রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে, যা অনেক সময় সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। এমনই এক অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন নেপথ্য কাহিনি এবার প্রকাশ্যে এনেছেন বলিউডের অন্যতম পরিচিত মুখ ও গুণী অভিনেত্রী সাদিয়া সিদ্দিকি। বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের প্রতি তার মনে তখন উথালপাথাল প্রেম, দিনরাত কিং খানের ধ্যানেই মগ্ন থাকতেন তিনি। অথচ নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, ক্যারিয়ারের প্রথম দিকের একটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্রে সেই স্বপ্নের পুরুষেরই আপন বোনের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল তাকে!
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কুন্দন শাহ পরিচালিত বলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কাল্ট ক্লাসিক সিনেমা ‘কভি হ্যাঁ কভি না’ (Kabhi Haan Kabhi Naa)-তে শাহরুখ খানের ছোট বোনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সাদিয়া সিদ্দিকি। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেই ছবির শুটিং সেটের নানা অম্লমধুর অভিজ্ঞতা এবং নিজের মনের গোপন ভালোলাগার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী।
যেভাবে সুযোগ পেয়েছিলেন সাদিয়ার এবং শুরুর দিকের অনীহা
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতীয় টেলিভিশন জগতে নিজের অভিনয়ের দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন সাদিয়া। ১৯৯৩ সালে দূরদর্শনে প্রচারিত অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘হামরাহি’-তে তার চমৎকার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন নির্মাতা কুন্দন শাহ। সেই সুবাদেই ‘কভি হ্যাঁ কভি না’ চলচ্চিত্রে শাহরুখের বোনের চরিত্রের জন্য তাকে সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছি, জার্মানিকেও ছাড় দেব না: হুঁশিয়ারি প্যারাগুয়ে কোচের
তবে শুরুর দিকে এই চরিত্রে অভিনয় করতে বিন্দুমাত্র রাজি ছিলেন না সাদিয়া সিদ্দিকি। কেন তিনি এমন একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করতে চেয়েছিলেন, তার পেছনের আসল কারণগুলো নিচে আলাদা আলাদা লাইনে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:
ভাইবোনের অনুভূতির অভাব: সাদিয়া জানান, সেই সময়ে শাহরুখ খানের প্রতি তার মনে কোনোভাবেই ভাই বা বোনের মতো পবিত্র অনুভূতি আসছিল না, কারণ তিনি তখন কিং খানের প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খাচ্ছিলেন।
ক্যামেরার সামনে ধরা পড়ার ভয়: সাদিয়ার মনে তীব্র ভয় কাজ করছিল যে, শুটিংয়ের সময় শাহরুখের চোখের দিকে তাকালে যদি তার মনের আসল রোমান্টিক অনুভূতিটা ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে যায়, তবে পুরো অভিনয়টাই মাটি হয়ে যাবে।
দর্শকের অবিশ্বাসের আশঙ্কা: পর্দায় ভাইবোনের নিখুঁত রসায়ন যদি তার ভেতরের ভালোলাগার কারণে প্রকাশ না পায়, তবে সাধারণ দর্শকরা সেই চরিত্রটিকে কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন না— এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি।
নায়িকা হওয়ার আকুতি এবং পেশাদারিত্বের জয়
সাক্ষাৎকারে সাদিয়া সিদ্দিকি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, "আমি যখন এই কালজয়ী সিনেমার জন্য নির্বাচিত হই, তখন আমার পুরো সত্ত্বা জুড়ে শুধুই শাহরুখ খান। আমার চোখে তখন ও ছাড়া আর কোনো পুরুষের অস্তিত্ব ছিল না। সেই নব্বইয়ের দশকেও ওকে যেমন মনে-প্রাণে ভালোবাসতাম, আজও ঠিক ওকেই একইভাবে ভালোবেসে যাচ্ছি।"
সিনেমায় বোনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর সাদিয়া পরিচালকের কাছে অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি আবদার করেছিলেন। তিনি সরাসরি কুন্দন শাহকে বলেছিলেন, তাকে যেন বোনের বদলে শাহরুখের নায়িকা বা প্রেমিকার চরিত্রে কাস্ট করা হয়। কিন্তু ছবির চিত্রনাট্য ও চরিত্রের চাহিদার কারণে পরিচালকের পক্ষে সাদিয়ার সেই প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
আরও পড়ুন: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বোচ্চ দুর্নীতি: জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা
অবশেষে মনের ইচ্ছেকে দমন করে কেবল পেশাদারিত্বের (Professionalism) খাতিরেই সাদিয়া সিদ্দিকি সেই চ্যালেঞ্জিং কাজটি করতে রাজী হন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত আবেগ এবং মনের গভীর অনুভূতিকে সম্পূর্ণ আড়াল করে নেন। নিজের সুনিপুণ অভিনয় দক্ষতার জোরে এবং চোখের চাউনিতে নিখুঁত এক স্নেহময়ী বোনের চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন রুপালি পর্দায়, যা আজও সিনেপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে। তবে নিজের মনের এই গোপন ভালোবাসার কথাটি শাহরুখ খানকে কখনো সরাসরি সামনাসামনি মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠেনি সাদিয়ার।
শুটিং সেটে কিং খানের জাদু ও আজীবনের মধুর স্মৃতি
পর্দায় মনের মানুষকে ভাই হিসেবে সম্বোধন করতে হলেও, শুটিং সেটের দিনগুলোতে শাহরুখ খানের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব যত্ন, মায়া ও অমায়িক ব্যবহার পেয়েছিলেন, তা সাদিয়ার জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। বলিউডের এই মেগাস্টারের সাধারণ আচরণ কীভাবে একজন তরুণী অভিনেত্রীর হৃদয় জয় করেছিল, তা নিচে বিস্তারিত পয়েন্ট আকারে দেওয়া হলো:
সহশিল্পীদের প্রতি যত্ন: একেকটি কঠিন শট শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শাহরুখ খান নিজে সাদিয়ার কাছে ছুটে আসতেন এবং অত্যন্ত যত্নসহকারে খোঁজখবর নিতেন।
রোদ থেকে আড়াল করার চেষ্টা: আউটডোর শুটিংয়ের তীব্র গরমে সাদিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাহরুখ বলেছিলেন, "তুমি কড়া রোদের মধ্যে কেন কষ্ট করে বসে আছ? দ্রুত গাড়ির এসি-র ভেতরে গিয়ে বসো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেয়ে নাও।"
অপ্রত্যাশিত আন্তরিকতা: সাদিয়া কখনো কল্পনাও করতে পারেননি যে, একজন বড় তারকা হয়েও শাহরুখ তাকে আলাদাভাবে নোটিশ করবেন কিংবা এতটা আপন করে নেবেন।
স্নেহের আলিঙ্গন: শুটিংয়ের এক পর্যায়ে সাদিয়ার কাজের প্রশংসা করে শাহরুখ খান তাকে স্নেহের পরশে জড়িয়ে ধরেছিলেন (Hug), যা সাদিয়ার ক্যারিয়ারের ডায়েরিতে আজীবন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বাধ্য হয়ে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বোনের চরিত্রে অভিনয় করলেও, কিং খানের সেই অবিশ্বাস্য আন্তরিকতা, ভদ্রতা এবং স্নেহ আজও সাদিয়ার অভিনয় জীবনের অন্যতম মধুর ও শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে রয়েছে। শাহরুখ খান কেন কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে ‘বাদশাহ’ হয়ে রাজত্ব করছেন, তার আসল কারণ যেন সাদিয়ার এই অম্লমধুর স্মৃতির মধ্য দিয়েই আরও একবার প্রমাণিত হলো।
নিউজের সূত্র: মুম্বাই ফিল্ম ক্রনিকল ও সাদিয়া সিদ্দিকির সাম্প্রতিক ভিডিও সাক্ষাৎকার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।