ঢাকা: দেশের নাট্যপাড়ায় পারিশ্রমিক ও বকেয়া টাকা নিয়ে অভিনয়শিল্পীদের ক্ষোভ বা অসন্তোষের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার এক নাট্যপরিচালকের বিরুদ্ধে পারিশ্রমিক পরিশোধে চরম অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রতা এবং চূড়ান্ত অপেশাদার আচরণের বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’খ্যাত শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রী পারসা ইভানা। শুধু মৌখিক অভিযোগই নয়, নিজের দাবির সপক্ষে সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রমাণও হাজির করেছেন তিনি।
গত রবিবার (২৮ জুন, ২০২৬) পারসা ইভানা তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে অভিযুক্ত পরিচালকের মুখোশ উন্মোচন করেন। একই সাথে পরিচালক ফারহাদ আহমেদ ইশানের সাথে বিগত কয়েক মাসের হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর স্ক্রিনশটও জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন তিনি। ইভানার এই পোস্টের পর বিনোদন অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
‘ফ্রড অ্যালার্ট’ পোস্টে পারসা ইভানার তীব্র ক্ষোভ
সোশ্যাল মিডিয়ায় পারসা ইভানা তাঁর সেই বিশেষ পোস্টটির শিরোনাম দিয়েছেন ‘ফ্রড অ্যালার্ট’ বা প্রতারণার সতর্কবার্তা। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি নাট্যপাড়ার সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: মনে মনে শাহরুখের প্রেমিকা, অথচ পর্দায় অভিনয় করতে হয়েছিল কিং খানের বোনের চরিত্রে!
পারসা ইভানা তাঁর ফেসবুক পোস্টে যে সমস্ত গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন, তা নিচে আলাদা আলাদা লাইনে পয়েন্ট আকারে সাজানো হলো:
ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা: ইভানা স্পষ্ট করে বলেন যে, তিনি সম্পূর্ণ নিজের বাস্তব ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ‘ফারহাদ আহমেদ ইশান’ নামক ওই পরিচালকের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
যোগাযোগ ও পেশাদারিত্বের অভাব: অভিযুক্ত পরিচালকের সাথে কাজ করতে গিয়ে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা, পেশাদার আচরণ এবং সঠিক সময়ে পারিশ্রমিক প্রদানের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে।
সাত মাসের দীর্ঘ অপেক্ষা: দীর্ঘ সাতটি মাস ধরে নিজের ন্যায্য ও প্রাপ্য পারিশ্রমিকের টাকার জন্য অপেক্ষা করছেন ইভানা, কিন্তু পরিচালকের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
পুরো টিমের বকেয়া পাওনা: শুধু পারসা ইভানা একাই নন, ওই নাটকের প্রোডাকশন টিমের অন্যান্য কুশলী ও সদস্যরাও এখনও পর্যন্ত তাদের খাটাখাটনির এক আনা পয়সাও বুঝে পাননি।
শিল্পীর নৈতিক দায়িত্ব: পরিচালক ইভানাকে আংশিক টাকা দিলেও কিছু টাকা আটকে রেখেছেন। ইভানা নিজের বকেয়া টাকা ছেড়ে দিতে রাজি হলেও, পুরো টিমের সাধারণ মানুষগুলো টাকা না পাওয়ায় একজন মূল শিল্পী হিসেবে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি সরব হয়েছেন।
দিনমজুর প্রোডাকশন বয়দের পাশে দাঁড়ালেন ইভানা
পর্দায় গ্ল্যামার ছড়ানো এই অভিনেত্রী তাঁর নিজের চেয়েও সেটের সাধারণ ও খেটে খাওয়া কর্মীদের অধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছেন, যা নেটিজেনদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। প্রোডাকশন টিমের দরিদ্র সদস্যদের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে ইভানা তাঁর পোস্টে বেশ কিছু আবেগঘন ও যৌক্তিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন:
দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ: আমার নিজের বকেয়া টাকা না পেলেও হয়তো ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু যারা দিন এনে দিন খায়, সেই খেটে খাওয়া সাধারণ প্রোডাকশন বয়দের পেটে লাথি মারার অধিকার কার আছে?
নতুনদের স্বপ্নভঙ্গ: যে তরুণ ছেলেটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শুরু করেছে এবং একটা ভালো ভবিষ্যতের আশায় দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে, তার প্রাপ্য পারিশ্রমিকটুকু কেন আটকে রাখা হবে?
পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন: এতগুলো সাধারণ মানুষের হকের টাকা নিয়ে কেন এমন একটি নোংরা ও অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হলো, তার জবাবদিহিতা কে করবে?
ইন্ডাস্ট্রির সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান
নাট্যাঙ্গনের বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিবেশ এবং কাজের চুক্তি নিয়ে পারসা ইভানা সব স্তরের সহকর্মী, নতুন অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের উদ্দেশ্যে বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন:
সচেতনতার প্রয়োজন: আমি চাই, আমাদের শোবিজ ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকে এই বিষয়টি গভীরভাবে দেখুক এবং এই ধরনের প্রতারক পরিচালকদের সম্পর্কে আগাম সচেতন হোক।
যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া: যে কোনো নতুন প্রজেক্ট বা নাটকের কাজ শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পূর্বের রেকর্ড সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া উচিত।
লিখিত চুক্তির বাধ্যবাধকতা: কাজের শুরুতেই সমস্ত প্রকার আর্থিক লেনদেন ও পেশাদার শর্তাবলি মুখে মুখে না রেখে আইনিভাবে লিখিত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
অধিকার রক্ষা: প্রত্যেক কর্মীকে নিজের মৌলিক ও আইনি অধিকার সম্পর্কে সর্বদা সচেতন এবং সোচ্চার থাকতে হবে।
পারসা ইভানা একটি পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত নাট্যপাড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, "আমরা নিশ্চয়ই এমন একটি সুন্দর ইন্ডাস্ট্রি গড়ার স্বপ্ন দেখি, যেখানে সততা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং কঠোর পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে। কোনো প্রকার অসততা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মতো নোংরা অভ্যাসের স্থান সেখানে থাকা উচিত নয়।"
হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশটে জালিয়াতির আদ্যোপান্ত
অভিনেত্রীর শেয়ার করা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশটগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বকেয়া টাকার সমস্যাটি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে পরিচালকের একের পর এক অজুহাত ও টালবাহানার ইতিহাস:
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পিকআপ ভর্তি বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস
ডিসেম্বরের তাগাদা: গত বছরের (২০২৫ সালের) ডিসেম্বর মাসেই পারসা ইভানা প্রথম ওই পরিচালকের কাছে নিজের প্রাপ্য পারিশ্রমিক পরিশোধের জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
জানুয়ারির অজুহাত: এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে টাকা চাইলে পরিচালক ইশান নিজের নানা ব্যক্তিগত ও আর্থিক সংকটের কথা ইভানাকে জানান এবং খুব দ্রুত টাকা পরিশোধের মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেন।
মে মাসের টালবাহানা: দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত মে মাসেও যখন ইভানা টাকার তাগিদ দেন, তখন পরিচালক তাঁর বাবা-মায়ের অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আবেগীয় কার্ড খেলার চেষ্টা করেন।
গিল্ডের ভয় ও সময় নেওয়া: ইভানা যখন নিরুপায় হয়ে ডিরেক্টরস গিল্ড বা অভিনয়শিল্পী সংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার কথা বলেন, তখন পরিচালক ভয় পেয়ে আরও এক সপ্তাহের সুনির্দিষ্ট সময় চেয়ে নেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই এক সপ্তাহ পেরিয়ে আরও অনেক দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও পারসা ইভানা কিংবা তাঁর টিমের কোনো সদস্য আজ অবধি বকেয়া টাকা বুঝে পাননি। বাধ্য হয়েই এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। এই বিষয়ে অভিযুক্ত পরিচালক ফারহাদ আহমেদ ইশানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা স্পষ্টীকরণ পাওয়া যায়নি।
নিউজের সূত্র: পারসা ইভানার অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যান্ডেল ও বিনোদন প্রতিবেদক স্কোয়াড।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।