পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলেই কঠোর শাস্তি: ১ লাখ টাকা জরিমানা ও জেলের বিধান

পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলেই কঠোর শাস্তি: ১ লাখ টাকা জরিমানা ও জেলের বিধান
ছবি: সংগৃহীত
অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: বাঙালি সমাজব্যবস্থা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি হলো প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বশীলতা। প্রবীণ বয়সে নিজের জন্মদাতা পিতা এবং গর্ভধারিণী মাতার উপযুক্ত ভরণপোষণ নিশ্চিত করা প্রতিটি ছেলে-মেয়ের জন্য যেমন একটি পরম ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব, ঠিক তেমনই এটি বর্তমান দেশের প্রচলিত আইনে একটি আবশ্যক আইনি কর্তব্য। কোনো সন্তান যদি নিজের পিতা-মাতার প্রতি এই ন্যূনতম দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন কিংবা তাদের ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে দেশের আইন অনুযায়ী তা একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই আইনি বাধ্যবাধকতা অমান্য করার কারণে যেকোনো দায়িত্বহীন সন্তানকে আইনগতভাবে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থদণ্ড বা জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে এবং ওই নির্ধারিত জরিমানা অনাদায়ে বা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে আদালত তাকে সর্বোচ্চ ৩ মাস পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের কঠোর বিধানে দণ্ডিত করতে পারবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত সুনির্দিষ্ট ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ এর মূল ধারার আইনি সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই আইনের আওতাভুক্ত ‘পিতা’ বলতে মূলত সন্তানের প্রকৃত জন্মদাতা জনক এবং ‘মাতা’ বলতে সন্তানের আপন গর্ভধারিণী জননীকে বোঝানো হয়েছে। আইনগতভাবে কোনো সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার মৌলিক ভরণপোষণের পরিধি ও অর্থ অনেক বেশি বিস্তৃত, যার মধ্যে প্রবীণ পিতা-মাতার জন্য দৈনন্দিন পুষ্টিকর ও নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া বা খাদ্যের ব্যবস্থা করা, পরিধানের জন্য উপযুক্ত ও ঋতুভিত্তিক বস্ত্র বা পোশাকের জোগান দেওয়া, যেকোনো ধরনের শারীরিক অসুস্থতায় উন্নত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা, বসবাসের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসস্থানের সুবন্দোবস্ত করা এবং প্রবীণ বয়সের মানসিক নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য সন্তানদের পক্ষ থেকে নিয়মিত আন্তরিক সঙ্গ বা সময় প্রদান করার মতো মানবিক বিষয়গুলো পুরোপুরি এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: নির্বাচনে অংশ নিতে হলে ইস্তফা দিতে হবে: শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর কড়া বার্তা

দেশের এই সুনির্দিষ্ট পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ এর অতি গুরুত্বপূর্ণ ৩ নম্বর ধারায় অত্যন্ত কঠোরভাবে সুস্পষ্ট আদেশ দিয়ে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি সন্তানকে অবশ্যই তাদের পিতা-মাতার দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় ভরণপোষণ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরিবারে যদি একাধিক সন্তান বা ভাই-বোন থাকে, তবে তারা প্রত্যেকে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর সমঝোতার ভিত্তিতে এই মহান দায়িত্বটি সম্মিলিতভাবে সুচারুভাবে পালন করবে। আইনের এই ধারায় আরও একটি মানবিক বিষয় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সন্তানদের অবশ্যই তাদের পিতা-মাতার স্বাচ্ছন্দ্যময় বসবাসের ব্যবস্থা নিজেদের একই ছাদের নিচে বা একই স্থানে করতে হবে এবং প্রবীণ পিতা-মাতার নিজস্ব ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে কোনো বৃদ্ধনিবাস, ওল্ড এজ হোম বা অন্য কোনো দূরবর্তী স্থানে একা একা থাকতে জোরপূর্বক বাধ্য করা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আইনের সংশ্লিষ্ট উপধারার বিবরণ অনুযায়ী, সন্তানদের প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততার মাঝেও অত্যন্ত নিয়মিতভাবে পিতা-মাতার সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর খোঁজখবর নিতে হবে এবং বয়সজনিত যেকোনো রোগের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা, ওষুধপত্র ও উপযুক্ত পরিচর্যার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কারণে যদি পিতা-মাতা এবং সন্তানরা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বা পৃথক জায়গায় বসবাস করেন, তবে সেক্ষেত্রে সন্তানদের মাস শেষে অর্জিত দৈনিক বা মাসিক মোট আয় থেকে একটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও সম্মানজনক পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে পিতা-মাতার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বা হাতে নিয়মিত পৌঁছানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক আইনের ৪ নম্বর ধারায় পারিবারিক বন্ধনের পরিধি আরও বিস্তৃত করে বলা হয়েছে যে, কোনো পরিবারে যদি পিতার আকস্মিক অনুপস্থিতি বা মৃত্যু ঘটে, তবে সেক্ষেত্রে ওই পিতার অংশে থাকা প্রবীণ দাদা-দাদী এবং মাতার অনুপস্থিতি বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে আপন নানা-নানীর সম্পূর্ণ ভরণপোষণের আইনি দায়িত্ব ও কর্তব্য সরাসরি তাদের নাতি-নাতনিদের ওপর আইনিভাবে বর্তাবে। নাতি-নাতনিদের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব পালন করার পুরো বিষয়টিকেও মূল পিতা-মাতার ভরণপোষণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেশের প্রচলিত আইনে গণ্য করা হবে।

আইনের ৫(১) ধারায় শাস্তির কঠোর বিধান নিশ্চিত করে বলা হয়েছে যে, কোনো সন্তান যদি ৩ বা ৪ নম্বর ধারার কোনো একটি অনুচ্ছেদ বা আইনি বিধান অবহেলাবশত লঙ্ঘন করে, তবে সেই মুহূর্তেই তা দেশের ফৌজদারি আইনে একটি আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই সুনির্দিষ্ট পারিবারিক অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সন্তানকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হবে এবং সেই অর্থদণ্ড অনাদায়ে বা জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থতার দায়ে তাকে সর্বোচ্চ তিন মাস মেয়াদের কারাদণ্ডের শাস্তি ভোগ করতে হবে।

এর পাশাপাশি আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধের সহায়তাকারীদের শাস্তির আওতায় এনে বলা হয়েছে যে, কোনো সন্তানের নিজের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর স্বাভাবিক ভরণপোষণের কাজে কোনো ধরনের বাধা প্রদান করেন কিংবা সন্তানদেরকে তাদের দায়িত্ব পালনে অসহযোগিতা বা প্ররোচনা জোগান, তবে সেই বাধা প্রদানকারী আত্মীয়কেও আইনের চোখে মূল অপরাধের সমান অংশীদার ও সহায়তাকারী হিসেবে গণ্য করে হুবহু একই দণ্ডে দণ্ডিত করার আইনি বিধান রাখা হয়েছে।

আইনটির সামাজিক প্রভাব ও সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব নিয়ে দেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন এক বিশেষ আইনগত মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর আইনি পর্যালোচনায় জানিয়েছেন যে, ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ মূলত বাংলাদেশের আবহমানকালের পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার, রক্তের বন্ধন সুদৃঢ়করণ এবং অসহায় প্রবীণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ও আইন বিভাগের একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন আরও বিশ্লেষণ করে বলেন যে, এই আইনের ৩ ধারায় প্রত্যেক সচ্ছল ও অসচ্ছল সন্তানের জন্য নিজের পিতা-মাতার ভরণপোষণ করাকে শতভাগ বাধ্যতামূলক বা অবলিগেটরি করা হয়েছে। একই সাথে প্রবীণদের নিজেদের অমতের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার বৃদ্ধনিবাসে বা পরিবারের বাইরে নির্বাসনে পাঠানো সম্পূর্ণ আইনিভাবে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশীয় ও সামাজিক পারিবারিক বন্ধনকে রাষ্ট্র এক অনন্য আইনি সুরক্ষা বলয় প্রদান করেছে।

আরও পড়ুন: দুপুরে ভাত খাওয়ার নামে ঘুষ নিলেন ডিএনসির সিপাহি আল-আমিন! দম্ভোক্তি নিয়ে তোলপাড়

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী আরও যোগ করেন যে, আইনের ৫ ধারায় রাখা ১ লাখ টাকা জরিমানার এই কড়া বিধান মূলত বর্তমান সমাজের দায়িত্বহীন, স্বার্থপর ও উদাসীন সন্তানদের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট আইনি বার্তা। আর ৪ ধারার সুদূরপ্রসারী বিধানের মাধ্যমে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর সুরক্ষার দায়িত্ব নাতি-নাতনির কাঁধে অর্পণ করার মাধ্যমে দেশের বর্তমান তিন প্রজন্মের পারিবারিক ও রক্তের বন্ধনকে আইনি কাঠামোর ভেতর এনে আরও বেশি শক্তিশালী ও মজবুত করা হয়েছে।

আইনজীবী খালিদ হোসাইন মামলার দীর্ঘসূত্রতা এড়ানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জানান যে, এই বিশেষ আইনের ৮ নম্বর ধারায় উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আপোষ-মীমাংসা ও ঘরোয়া সমঝোতার একটি চমৎকার আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে যেকোনো জটিল পারিবারিক বিরোধ বা ভুল বোঝাবুঝি আদালতের কাঠগড়ায় যাওয়ার আগেই স্থানীয় সমাজ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করার সুযোগ রয়েছে, যা আমাদের বাঙালি সমাজ ও নিজস্ব গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন দেশের সর্বশেষ আইনি অগ্রগতি সম্পর্কে জানান যে, ২০২৩ সালের নতুন ও আধুনিক সরকারি বিধিমালায় অসহায় প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ ‘ভরণ-পোষণ তহবিল’ এবং উন্নত ‘পরিচর্যাকেন্দ্র’ গঠনের এক চমৎকার আইনি বিধান রাখা হয়েছে, যা বর্তমান যুগের অসহায় ও নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জন্য এক নতুন আশার আলো ও ভরসার স্থল।

সবশেষে তিনি তাঁর আইনি মতামতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে স্পষ্ট করে বলেন যে, রাষ্ট্র এই আইনটি কিন্তু শুধু সন্তানদের ধরে ধরে শাস্তি বা জেলে দেওয়ার জন্য প্রণয়ন করেনি; বরং আধুনিক যুগে নিজেদের ক্যারিয়ারের পেছনে অন্ধ হয়ে ছুটে চলা সন্তানদেরকে তাদের মূল জন্মদাতা পিতা-মাতার প্রতি রক্তের ঋণ ও পবিত্র দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই এই আইনটি তৈরি করা হয়েছে। এই বিশেষ আইনটি সম্পর্কে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে আমাদের পারিবারিক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে এবং সমাজের প্রবীণ মানুষেরা তাদের জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রাপ্য সম্মান, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ভালোবাসা পাবেন।

নিউজের সূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় শাখা।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন