অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: দেশের বহুল আলোচিত ও স্পর্শকাতর আইনি ইতিহাসের অন্যতম এক রহস্যময় অন্তর্ধান ও অপহরণের ঘটনার দীর্ঘ এক যুগ পর অবশেষে এক বড় ধরনের আইনি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির ও প্রখ্যাত ওয়ায়েজ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে এসে আদালত চত্বর থেকে আকস্মিক নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালীকে জোরপূর্বক অপহরণের চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক সহকারী পুলিশ学 সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ দমনে নিয়োজিত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ ও চৌকস দল অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সাথে অভিযান পরিচালনা করে তাকে নিজেদের হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২ জুলাই ২০২৬) গভীর রাতে রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরে অবস্থিত ফজলুর রহমানের নিজস্ব আবাসিক বাসভবন ঘেরাও করে এই গ্রেপ্তার অভিযানটি সফলভাবে পরিচালনা করা হয়।
আরও পড়ুন: এফডিসিতে শিল্পী সমিতির ভোটগ্রহণ শুরু: প্রথম ভোট দিলেন ডা. এজাজুল ইসলাম
আজ শুক্রবার (৩ জুলাই ২০২৬) বেলা পৌনে ১২টা শূন্য মিনিটের দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমের সামনে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। ডিবি পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান যে, বিগত ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংলগ্ন উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে সুখরঞ্জন বালীকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে অপহরণ করার যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, সেই মামলার নিবিড় তদন্তের ধারাবাহিকতায় সাবেক এএসপি ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের আঁধারে ঢাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তারের পর ইতিমধ্যেই ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ও পরবর্তী বিচার বিভাগীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
১. সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এই অপহরণের শিকার হওয়া সুখরঞ্জন বালী মূলত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুরের একজন স্থায়ী ও সাধারণ বাসিন্দা ছিলেন।
২. বিগত ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যখন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া চলছিল, ঠিক তখন সাঈদীর আইনজীবীদের পক্ষে সাফাই বা ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে নিজের জবানবন্দি দিতে তিনি পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন।
৩. ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রবেশের ঠিক আগমুহূর্তে সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের সামনে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তাকে একটি মাইক্রোবাসে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সে সময় সাঈদীর আইনজীবীরা তীব্র ও প্রকাশ্য অভিযোগ তুলেছিলেন।
আরও পড়ুন: হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির ১০ বছর: এক দশকের ক্ষত ও রক্তাক্ত স্মৃতির উপাখ্যান
৪. এই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ না পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে একটি কারাগারে সুখরঞ্জন বালীর সন্ধান মেলে, যা সে সময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাঝে তীব্র আলোড়ন এবং ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
৫. উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে হত্যা, সুপরিকল্পিত গণহত্যা, অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বরোচিত হামলাসহ একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার সম্পন্ন হয়েছিল।
৬. দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বিগত ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অপরাধসমূহ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করেছিলেন।
৭. পরবর্তীতে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আসামির আবেদনের প্রেক্ষিতে সেই রায় আংশিক পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
৮. এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস ভোগ করার পর ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট দেশের অন্যতম প্রধান চিকিৎসালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিউজের সূত্র: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মিডিয়া সেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।