আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
জেনেভা: বর্তমান পৃথিবীর জলবায়ু ও সামগ্রিক আবহাওয়ামণ্ডলে হানা দিয়েছে এক পরম ও অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যা বৈজ্ঞানিক মহলে ‘এল নিনো’ (El Niño) নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। আবহাওয়ার এই চরম ও অস্বাভাবিক খামখেয়ালিপনার কারণে ইতিমধ্যেই সমগ্র ইউরোপ মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে এবং তীব্র দাবদাহ বা হিটওয়েভের কারণে সেখানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি উন্নত রাষ্ট্রে তাপমাত্রার পারদ সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলায় সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই বিশ্ববাসীর জন্য আরও এক চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া গবেষকেরা। জাতিসংঘের আওতাধীন শীর্ষ আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা তথা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, চলমান এই ‘এল নিনো’ খুব শীঘ্রই তার বর্তমান রূপ পরিবর্তন করে আরও তীব্র ও শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক পরিবেশ ও মানব সভ্যতার ওপর এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের স্পষ্ট শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সুখরঞ্জন বালী অপহরণ মামলা: পুলিশের সাবেক এএসপি ফজলুর রহমান গ্রেপ্তার
বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির (AFP) একটি বিশেষ এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত ডব্লিউএমওর প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিশেষ বুলেটিনে সতর্ক করা হয়েছে যে, চলতি ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যবর্তী সময়ে এই এল নিনো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তার শক্তি বৃদ্ধি করবে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে সৃষ্ট এই জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, নজিরবিহীন খরা, আকস্মিক বন্যা সৃষ্টিকারী অতিবৃষ্টি এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। ডব্লিউএমও তাদের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে যে, সুবিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় বা নিরক্ষীয় অঞ্চলে ইতিমধ্যেই এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি শুরু হয়ে গেছে এবং আগামী কয়েকমাসে এটি আরও বেশি ঘনীভূত হবে। এই আসন্ন প্রাকৃতিক সংকট ও সম্ভাব্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এখন থেকেই যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষামূলক পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
ভৌগোলিক ও পরিবেশ বিজ্ঞানের পরিভাষায় এল নিনো হলো মূলত একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও সামুদ্রিক জলবায়ুগত বিশেষ ঘটনা বা চক্র, যার প্রভাবে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার তুলনায় মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়।
সমুদ্রের পানির এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে বিশ্বজুড়ে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক বাতাসের প্রবাহ, মেঘ সৃষ্টির প্রক্রিয়া, বৃষ্টিপাতের নিয়মিত ধরন এবং সামগ্রিক বায়ুচাপের সমীকরণে এক বিশাল ও ক্ষতিকর ওলটপালট বা পরিবর্তন ঘটে।
সাধারণত প্রতি দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর পর পৃথিবীর বুকে এই এল নিনো জলবায়ু চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে এবং একবার এটি সক্রিয় হলে এর স্থায়িত্বকাল বা কার্যকারিতা প্রায় নয় মাস থেকে শুরু করে টানা বারো মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সবশেষ প্রকাশিত ত্রৈমাসিক জলবায়ু পূর্বাভাস ও প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আগামী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এল নিনো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার চূড়ান্ত ও শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাবে।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এল নিনোর তীব্রতাকে মূলত চারটি প্রধান সুনির্দিষ্ট মাত্রায় বা স্তরে ভাগ করে থাকে, যা যথাক্রমে দুর্বল এল নিনো, মাঝারি এল নিনো, শক্তিশালী এল নিনো এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো নামে পরিচিত।
বিজ্ঞানীদের আধুনিক গাণিতিক মডেল ও কৃত্রিম উপগ্রহের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এবারের চলমান এল নিনোটি তার তীব্রতার দিক থেকে সমস্ত রেকর্ড ভেঙে তৃতীয় স্তর অর্থাৎ সরাসরি ‘শক্তিশালী’ বা অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ডব্লিউএমওর বর্তমান সম্মানিত মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো এই মারাত্মক জলবায়ু পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন, এল নিনো যদি তার শক্তি আরও বৃদ্ধি করে তবে বিশ্বের অনেক জনবহুল অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, অনাকাঙ্ক্ষিত ভারী বৃষ্টিপাত এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠে তীব্র তাপপ্রবাহের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবার স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও এক বিরাট হুমকি।
আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অত্যাধুনিক জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের মধ্যে এবার এক নজিরবিহীন ও নিখুঁত মিল পাওয়া গেছে, যার কারণে এই আসন্ন মহা-দুর্যোগের পূর্বাভাসের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাস অনেক বেশি জোরালো হয়েছে।
ডব্লিউএমওর পূর্ববর্তী নথিপত্র ও তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৩ এবং ২০২৪ সালেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল এই এল নিনো এবং এর প্রভাবেই ২০২৪ সালটি ছিল পৃথিবীর নথিভুক্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর।
যদিও এল নিনোর সর্বোচ্চ বিধ্বংসী ও চরম প্রভাব সাধারণত প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়, তবে এর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও বেশ কিছু সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে স্থায়ী হতে পারে।
এই সম্ভাব্য বৈশ্বিক মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং মৌসুমি পূর্বাভাস জোরদার করার কাজ শুরু করেছে।
চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান প্রধান জনবসতিপূর্ণ ও শিল্পোন্নত এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
আরও পড়ুন: নিজস্ব চিপের বাজারে অ্যামাজন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গতি বাড়াতে টেক জায়ান্টের মহাপরিকল্পনা
একই সময়ে উত্তর আমেরিকার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু শুষ্ক এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা থাকলেও, ঠিক বিপরীতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভারতীয় উপমহাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাত বা তীব্র খরার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা আরও স্পষ্ট করেছে যে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর সংখ্যা বা এর নিজস্ব তীব্রতা সরাসরি বাড়ছে— এমন কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তবে, শিল্পায়নের ফলে ক্রমাগত উষ্ণতর হতে থাকা সমুদ্রের পানি এবং দূষিত বায়ুমণ্ডল চরম আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা সরবরাহ করায়, এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাব বর্তমান পৃথিবীতে আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী, তীব্র ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
নিউজের সূত্র: জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ও এএফপি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।