ইসলামী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: মানব সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মানুষের সবচেয়ে বড়, প্রকাশ্য এবং আজন্ম শত্রু হলো ইবলিস শয়তান। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বিশ্বজগতের সমস্ত মানুষের হেদায়েতের জন্য এবং শয়তানের বহুমুখী গোমরাহী বা পথভ্রষ্ট করার সুক্ষ্ম ধরণগুলো স্পষ্টভাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার এই চিরশত্রুর প্রকাশ্য শত্রুতা, ধোঁকা ও কুপ্ররোচনার বেড়াজাল সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক হতে পারে এবং নিজেদের ঈমান-আমল রক্ষা করতে পারে। সমস্ত প্রশংসা ও গুণগান কেবল সেই মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি মানবজাতিকে কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। আমি পরম নিষ্ঠার সাথে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক অদ্বিতীয় আল্লাহ ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কোনো সত্য উপাস্য বা ইলাহ নেই, তাঁর মহান ক্ষমতা, আধিপত্য ও মহানুভবতায় অংশীদার হওয়ার মতো কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত প্রিয় বান্দা ও চূড়ান্ত রাসুল; যিনি পৃথিবীর বুকে আগত আল্লাহর সমস্ত আম্বিয়া ও রাসুলগণের একমাত্র নেতা। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর, তাঁর পবিত্র পরিবার-পরিজন, তাঁর যোগ্য সঙ্গী-সাথী বা সাহাবায়ে কেরাম—যারা মানবজাতির পথপ্রদর্শক এবং অত্যন্ত পরহেযগার ছিলেন—তাদের সকলের ওপর কেয়ামতের শেষ দিন পর্যন্ত অবিরাম রহমত, বরকত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
পবিত্র কুরআনের অকাট্য ঘোষণা অনুযায়ী, নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের জীবনের একমাত্র প্রকাশ্য ও মারাত্মক ক্ষতিকর শত্রু। মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সাবধান করে দিয়ে সূরা ফাতিরে ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের চরম শত্রু, অতএব তোমরা তাকে সর্বদা শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ শয়তানের প্রধানতম কাজই হলো মানুষের মন বা অন্তরের ভেতরে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে কুপ্ররোচনা দেওয়া, যাতে মানুষ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে পড়ে আল্লাহর সুমহান অবাধ্যতা ও পাপে লিপ্ত হয়। তাই মুমিনদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো, তোমরা কখনোই শয়তানকে নিজেদের বন্ধু বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে না। শয়তানের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও নৈকট্য থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখা। এই উদ্দেশ্যে সে মানুষকে ধর্মীয় জ্ঞান বা ইলম অর্জন করতে এবং যেকোনো নেক আমল বা ভালো কাজ করতে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। এমনকি কোনো মানুষ যদি ভালো কাজ করতেও যায়, তবে তার মনের ভেতর থেকে খাঁটি ইখলাস বা লোকদেখানো ভাব (রিয়া) তৈরি করে তা নষ্ট করতে চায়। এই সমস্ত নানামুখী মানসিক ও শয়তানি চক্রান্ত থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র সর্বোত্তম উপায় হলো সর্বাবস্থায় পরম পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। আর এজন্যই ইসলামে যেকোনো ভালো কাজ বা কুরআন তিলাওয়াতের শুরুতে ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ (অর্থ: বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো প্ররোচনা বা কুউসকানি তোমাকে প্ররোচিত করতে চায়, তবে তুমি তৎক্ষণাৎ আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো।’
আরও পড়ুন: শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো: বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার মারাত্মক সতর্কতা জাতিসংঘের
শয়তানের অন্যতম প্রধান ও ভয়ংকর কৌশল হলো সে মানুষের চোখের সামনে যাবতীয় মিথ্যা, অন্যায়, জুলুম এবং বাতিল কাজকে অত্যন্ত চমৎকার, সুশোভিত ও আকর্ষণীয় স্টাইলে ফুটিয়ে তোলে, যেন মানুষ পাপের পথকে আনন্দের মনে করে।
পবিত্র কুরআনের সূরা হিজরে শয়তানের সেই আদি উক্তিটি চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে সে আল্লাহর সামনে দম্ভোক্তি করে বলেছিল, ‘আমি অবশ্যই পৃথিবীর বুকে তাদের সামনে সমস্ত পাপ কাজকে সুশোভিত ও চাকচিক্যময় করব এবং আমি তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।’
অন্য একটি আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা শয়তানের এই জঘন্য চক্রান্তের গোমর ফাঁস করে দিয়ে বলেন, ‘আসলে শয়তান তাদের মন্দ আমলগুলো ও গুনাহের কাজগুলোকে তাদের সামনে অত্যন্ত সুশোভিত করে দেখিয়েছে এবং এভাবেই সে তাদেরকে আল্লাহর সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।’
শয়তান মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলা করে এবং সে মানুষের মনে দুনিয়ায় চিরকাল বেঁচে থাকার এবং ভোগবিলাস করার আকাঙ্ক্ষাকে অনেক দীর্ঘায়িত করে তোলে এবং তাদেরকে অবাস্তব ও কাল্পনিক মিথ্যা আশার সাগরে ডুবিয়ে রাখে।
মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে ধ্বংস করতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘শয়তান সর্বদাই তোমাদেরকে দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে কৃপণতা ও অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়; আর বিপরীতে আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া, ক্ষমা ও অনুগ্রহের সুসংবাদ দেন।’
শয়তানের কুৎসিত উক্তি উদ্ধৃত করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন, (শয়তান বলেছিল) ‘আমি অবশ্যই মানবজাতিকে সঠিক পথ থেকে গোমরাহ করব, তাদেরকে বড় বড় মিথ্যা আশা দেব, তাদেরকে বিভিন্ন কুসংস্কারের আদেশ করব যার ফলে তারা পশুর কান ফাড়বে এবং তাদেরকে নির্দেশ দেব যার ফলে তারা আল্লাহর তৈরি প্রাকৃতিক সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।’
এই ধোঁকা থেকে বাঁচতে মানুষের উচিত জীবনের প্রতি মুহূর্তে শয়তানের সুক্ষ্ম কুপ্ররোচনা ও অদৃশ্য চক্রান্ত সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকা, কারণ শয়তান মানুষকে সব দিক থেকে আক্রমণ করার শপথ নিয়েছে।
কুরআনের বিবরণ অনুযায়ী শয়তান আল্লাহর সামনে অহংকার করে বলেছিল, ‘আমি অবশ্যই মানুষের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে তাদের হৃদয়ে আসব; আর আপনি তাদের অধিকাংশকেই আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ পাবেন না।’
শয়তানের এই চণ্ডাল অহংকারের জবাবে মহান আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেছিলেন, এখান থেকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও বিতাড়িত অবস্থায় তুই বের হয়ে যা! মানুষের মধ্য থেকে যারা তোর অন্ধ অনুসরণ করবে, আমি অবশ্যই তোদের সবাইকে দিয়ে জাহান্নামের ভয়ংকর আগুন পূর্ণ করব।’
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আমাদের সকলের উচিত মহান আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে প্রার্থনা করা, তিনি যেন শয়তানের সমস্ত চক্রান্ত, জাদুটোনা ও কুপ্ররোচনা থেকে আমাদের ঈমান ও আমলকে হেফাজত করেন।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের সঠিক ও সুন্দর দিশা বা তৌফিক দান করেন, আমাদের কলুষিত আত্মাকে পুরোপুরি শোধন ও পবিত্র করেন এবং আমাদের নিজেদের মন্দ আমলের অশুভ পরিণতি থেকে আমাদের রক্ষা করেন।
আরও পড়ুন: আত্মশুদ্ধির অমূল্য বাণী: যে উক্তিগুলো মানুষের অন্তরকে কাঁপায় এবং আত্মাকে জাগিয়ে তোলে
পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার যারা খাঁটি ও একনিষ্ঠ বান্দা, তাদের ওপর তোমার কোনো প্রকার আধিপত্য বা জোর খাটবে না; আর মানুষের কর্মবিধায়ক ও অভিভাবক হিসেবে তোমার প্রতিপালক বা রবই একমাত্র যথেষ্ট।’
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো উসকানি বা মন্দ চিন্তা তোমাকে তাড়িত করে, তবে সাথে সাথে আল্লাহর আশ্রয় নাও; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’
মুত্তাকীদের গুণাবলী বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহকে ভয় করে তথা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, যখন শয়তানের কোনো দল বা কুপ্ররোচনা তাদের মনে সামান্য স্পর্শ করে, তখন তারা তৎক্ষণাৎ আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সাথে সাথেই তাদের আত্মিক চোখ খুলে যায়।’
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের জন্য এই পবিত্র মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে অশেষ বরকত ও কল্যাণ দান করুন এবং এর প্রতিটি মহামূল্যবান আয়াত এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ জিকিরের মাধ্যমে আমাদের বাস্তব জীবনকে আলোকিত ও উপকৃত করার তৌফিক দিন; নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত মহান, পরম দাতা, অধিপতি ও পরম দয়ালু।
নিউজের সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও আল-কুরআন রিসার্চ সেন্টার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।