নাটোরে ফরম পূরণের টাকা গায়েব: প্রবেশপত্র না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থী

নাটোরে ফরম পূরণের টাকা গায়েব: প্রবেশপত্র না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থী
ছবি: সংগৃহীত
অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

নাটোর: উত্তরবঙ্গের অন্যতম শান্ত জেলা নাটোরের লালপুর উপজেলায় অবস্থিত আব্দুলপুর সরকারি কলেজের আটজন নিয়মিত শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে এসেছে চরম এক অন্ধকার ও অনিশ্চয়তা। চলমান উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি (HSC) পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে তারা পরীক্ষার হলে বসার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন। কলেজেরই একজন অসাধু ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের জন্য নির্ধারিত বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যক্তিগতভাবে হাতিয়ে নেওয়ার এক গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ওই কর্মচারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নগদ টাকা বুঝে নিয়েও তা যথাসময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে জমা দেননি বলে ভুক্তভোগীরা নিশ্চিত করেছেন। তবে এই চরম বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর বিষয়টির পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ প্রশাসনের দাবি, ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করা এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কলেজের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা ফেল করেছিলেন, যার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী তাদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এই ন্যক্কারজনক ও হৃদয়বিদারক জালিয়াতির ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থী এবং তাদের অসহায় অভিভাবকেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তারা এই ঘটনার পেছনে মূল হোতা ও অভিযুক্ত কর্মচারীর দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনি শাস্তির দাবি জানিয়ে কলেজ চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, চলমান এইচএসসি পরীক্ষার অনলাইন ফরম পূরণের সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা আব্দুলপুর সরকারি কলেজের অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকারের কাছে তাদের নির্ধারিত ফি বাবদ নগদ টাকা জমা দিয়েছিলেন। টাকা নেওয়ার পর ওই অফিস সহকারী শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে তাদের অনলাইনের সমস্ত ফরম পূরণ অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে তারা প্রবেশপত্র পেয়ে যাবেন। কিন্তু মূল পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা যখন জানতে পারে যে শিক্ষা বোর্ডের মূল সার্ভারে তাদের কোনো ফি জমা পড়েনি, তখন তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। রাজকীয় অবহেলার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত বোর্ড থেকে কোনো ডিজিটাল প্রবেশপত্র বা অ্যাডমিট কার্ড পাননি, যার ফলে জীবনের সবচেয়ে বড় এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে পরীক্ষার ঠিক আগের দিন থেকেই অভিযুক্ত অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকার সম্পূর্ণ বিনা নোটিশে কলেজে আসা বন্ধ করে দেন এবং তার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে হযরত শাহ আজমত উল্লাহ ইয়ামেনী (রহঃ) মাজারের বাৎসরিক ওরশ শরীফ শুরু

১. এই চরম প্রতারণার শিকার হওয়া প্রথম ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সূচি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসজল চোখে সাংবাদিকদের জানান যে, অনলাইনের মাধ্যমে নিজে নিজে ফরম পূরণ করার সময় সার্ভারে কিছু কারিগরি জটিলতা দেখা দিয়েছিল। এই সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি নিরুপায় হয়ে কলেজের অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন। সে সময় অমিত কুমার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে ফরম পূরণ করে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সূচির কাছ থেকে নগদ ৩ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেন। টাকা নেওয়ার পর থেকে তিনি দিনের পর দিন প্রবেশপত্র দেওয়ার নাম করে শুধু সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। অবশেষে পরীক্ষার মূল দিন যত ঘনিয়ে আসে, অমিত কুমারের অনৈতিক চালাকি তত স্পষ্ট হতে শুরু করে। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সকাল থেকে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় এবং তিনি আর কলেজে উপস্থিত হননি। পরবর্তীতে কলেজের মূল প্রশাসনিক শাখা থেকে সূচি জানতে পারেন যে তার নামে কোনো ফরমই পূরণ করা হয়নি এবং শিক্ষা বোর্ডে কোনো টাকাই পৌঁছায়নি।

২. নিজের শিক্ষা জীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়া শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সূচি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, “কলেজের একজন সামান্য বেতনভুক্ত কর্মচারীর এমন জঘন্য ও পরিকল্পিত প্রতারণার শিকার হয়ে আমার মূল্যবান জীবন থেকে একটি সম্পূর্ণ বছর সম্পূর্ণ অযথা নষ্ট হয়ে গেল। আমার এই অপূরণীয় ক্ষতির জন্য আমি প্রশাসনের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করছি।”

৩. এই একই ধরনের সুনির্দিষ্ট ও ভয়ংকর প্রতারণার শিকার হয়েছেন কলেজের আরও সাতজন নিয়মিত ছাত্র। তাদের স্বপ্নও এভাবে মাঝপথে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই অভাগা শিক্ষার্থীরা হলেন যথাক্রমে সবুজ আহম্মেদ, শিমুল শেখ, আকিবুল ইসলাম, শিমুল হোসেন, শাওন আলী, সাব্বির আহমেদ এবং তানভির হোসেন।

৪. সূচির বাবা ইমামুল হক অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, “কলেজের একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর এমন চরম অবহেলা এবং প্রকাশ্য চুরির কারণে আমার মেয়ের উচ্চশিক্ষা তথা ভবিষ্যতের পথ আজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হলো। আমরা এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং দোষী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”

আরও পড়ুন: পরীক্ষার হলের বাইরে পিতা-মাতার নীরব প্রার্থনা: সন্তানের স্বপ্ন পূরণে এক পরম আকুতি

৫. এই ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনায় নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে এবং ন্যায়বিচারের আশায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে আব্দুলপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। সেই লিখিত অভিযোগে তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অনলাইনে ফরম পূরণের সময় নানা রকম ভুয়া সমস্যার কথা বলে অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকার তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে সরকারি ফির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি টাকা নেওয়ার বিপরীতে শিক্ষার্থীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মানি রসিদ বা টোকেন প্রদান করেননি এবং শেষ পর্যন্ত কোনো ফরমও পূরণ করেননি।

৬. এই পুরো বিষয়টি নিয়ে আব্দুলপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মামুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের এই দুঃখজনক বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানার পরপরই আমি ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি যোগাযোগ স্থাপন করেছিলাম। তবে শিক্ষা বোর্ডের কঠোর আইনি বিধিমালা ও সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার কারণে শেষ মুহূর্তে এই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো বিশেষ সুযোগ দেওয়া বোর্ডে সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

৭. তবে অধ্যক্ষ মামুদুর রহমান বক্তব্যের শেষাংশে একটি ভিন্ন তথ্য যোগ করে আরও জানান যে, টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন মূলত কলেজের নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর তুলতে পারেননি। যার কারণে সামগ্রিক একাডেমিক নিয়ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে কলেজ কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই তাদের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বৈধ অনুমতি বা ক্লিয়ারেন্স প্রদান করেনি।

নিউজের সূত্র: নাটোর জেলা প্রতিনিধি ও স্থানীয় কলেজ প্রশাসন শাখা।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন